ধন্যবাদ অধিনায়ক

খেলাধুলা ডেস্ক

সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে আগের দুই ওয়ানডেতে তেমন দর্শক দেখা যায়নি। আজ তৃতীয় ওয়ানডেতে দৃশ্যটা কিছুটা হলেও পাল্টেছে। বেশ ভালোসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি। প্রচুর ব্যানার। এর মধ্যে বেশির ভাগ ব্যানারেই একটি নাম—মাশরাফি! জয়ের পর এ নামটিই মাথায় করে রাখলেন তামিম-লিটনরা। অধিনায়ক মাশরাফির বিদায়ী ম্যাচ বলে কথা। জিম্বাবুয়েকে ১২৩ রানে হারিয়ে তাঁর শেষটা যেমন রাঙিয়েছেন ক্রিকেটারেরা তেমনি মাশরাফিকে কাঁধে তুলে মাঠও ঘুরেছেন তাঁরা। খেলা শেষে ক্রিকেটারেরা সবাই পড়েছিলেন একই ২ নম্বর জার্সি—যেখানে বুকের ওপর বড় করে লেখা ‘ধন্যবাদ অধিনায়ক।’

অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফির শেষ ম্যাচটি ছুটির দিনে। এ দুটি উপলক্ষ মিলিয়ে গ্যালারিতে দর্শক সমাগম হবে এবং তাদের ব্যানার-ফেস্টুনে যে মাশরাফির প্রাধান্য থাকবে সেটি অনুমিতই ছিল। আর ছিল জয়? না, শেষ বলটা হওয়ার আগে ক্রিকেটে জয় কখনো অনুমিত হয় না। তবে কথাটা অবশ্য পুরোপুরি ঠিকও বলা যায় না। বৃষ্টিবিঘ্নিত এ ম্যাচে আগে ব্যাট করে ৪৩ ওভারে ৩ উইকেটে ৩২২ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। বৃষ্টি আইনে এ লক্ষ্যটাই জিম্বাবুয়ের জন্য বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ ওভারে ৩৪২। এই পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ২৭.৫ ওভারে জিম্বাবুয়ের ইনিংস ৬ উইকেটে ১৬৪ রানে পরিণত হলে ম্যাচের আর কী থাকে!

যেটুকু বাকি থাকে তা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা আর অধিনায়ক মাশরাফির বিদায়ী ম্যাচকে যতটুকু সম্ভব রাঙানো। ব্যাটিংয়ে তামিম ইকবাল-লিটন দাসের পর বোলিংয়ে ‘যৌথ প্রযোজনা’য় সে কাজটিই করেছেন বোলাররা। তাতে তৃতীয় ওয়ানডেতে ১২৩ রানের জয়ে জিম্বাবুয়েকে ৩-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই করল বাংলাদেশ। আর অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি তাঁর শেষ ম্যাচে দেখা পেলেন ৫০তম জয়ের। ৩৭.৩ ওভারে ২১৩ রানেই অলআউট জিম্বাবুয়ে।

জিম্বাবুয়ে ওপেনার কামুনহুকামুয়েকে উইকেটের পেছনে লিটনের ক্যাচ বানিয়ে শুরুটা করেছিলেন মাশরাফিই। এরপর উইকেট পড়েছে নিয়মিত বিরতিতে। সিকান্দার রাজা যা একটু লড়াই করেছেন ৬১ রানের ইনিংস দিয়ে। এ ছাড়া কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারেনি। গোটা ম্যাচে কখনোই মনে হয়নি দ্বিতীয় ওয়ানডের মতো শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই এ ম্যাচেও উপহার দিতে পারে জিম্বাবুয়ে। বরং জিম্বাবুয়ে দ্রুত উইকেট হারানোয় বাংলাদেশ অধিনায়কের বিদায়ী ম্যাচের দৈর্ঘ্য যেন আরও কমেছে!

মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ৪১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংসের পতন ত্বরান্বিত করেছেন। ৩৮ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন তাইজুল ইসলাম। ১টি করে উইকেট আফিফ, মোস্তাফিজ ও মেহেদী হাসান মিরাজের। জয়ের পর মাশরাফিকে ক্রেস্ট উপহার দেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান। আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন কিছু ক্রিকেটার।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিভীষিকাময় ২০১৪ সালের শেষদিকে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে। এর আগে টানা হারতে থাকা টাইগাররা তার স্পর্শে অনেকটাই বদলে যায়। একেরপর এক সাফল্যে বিশ্ব দরবারে নিজেদের অন্যভাবে চেনায় লাল সবুজের প্রতিনিধিরা।

তবে টানা প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ওয়ানডে সংস্করণে নেতৃত্ব দেয়া মাশরাফীর ঝুলিতে আছে আরো অনেক অর্জন। তার নেতৃত্বেই পাকিস্তানকে প্রথমবার হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। আছে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের সুখস্মৃতি।

৩৬ বছর বয়সী এই ডানহাতি পেসারের অধীনে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ও চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। তার হাত ধরেই এসেছে এসেছে বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা। তবে ২০১৯ বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর থেকেই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষ ম্যাচেই নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক।

একনজরে দেখে নেয়া যাক অধিনায়ক মাশরাফীর বিভিন্ন পরিসংখ্যান:

এ পর্যন্ত ৮৭টি ম্যাচে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। এর মাঝে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন ৪৯ বার, হার ৩৬ ম্যাচে। সাফল্যের হার ৫৬.৩২%।

২০১৪ সাল থেকে নড়াইল এক্সপ্রেসের অধীনে ১৫টি ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। এর মাঝে ১০টি সিরিজই জিতেছে টাইগাররা। চারটি হার ও একটি সিরিজ ড্র করেছে বাংলাদেশ।

মাশরাফীর সময়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলেছে তিনটি। এর মাঝে গত বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রি-দেশীয় সিরিজের শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। এর আগে বহুজাতিক কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতেনি টাইগাররা। ২০১৮ এশিয়া কাপে তার অধীনেই রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ।

ব্যাট হাতে ক্যাপ্টেন মাশরাফী নেমেছেন ৫৮ ইনিংসে। ১১.৭৯ গড় ও ৯০.৫৯ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৫৭৮ রান। এ সময়ে তার সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ৪৪ রানের।

নড়াইল এক্সপ্রেসের মূল কাজ ছিল বোলিং। দলপতি হিসেবে ৮৭ ইনিংসে ১০১ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। প্রতি উইকেটের পিছে খরচ করেছেন প্রায় ৩৬ রান। ইকোনমি রেট আধুনিক যুগের ক্রিকেট হিসেবে চমৎকার (৫.১২)। সেরা বোলিং ফিগার ছিল ২৯ রান দিয়ে ৪ উইকেট।

অধিনায়ক হিসেবে শেষ ম্যাচ হলেও ক্যারিয়ারের ইতির ঘোষণা দেননি ম্যাশ। খেলে যেতে চান দলের এক সাধারণ সদস্য হয়ে। অগণিত টাইগার ফ্যানের প্রত্যাশা, আরো বেশি দিন তাকে দেখবেন জাতীয় দলের জার্সিতে। চিত্রা পাড়ের ছেলেটি কলার উঁচু করে দৌড়ে এসে বল ছুঁড়বে, শিকার করবে উইকেট, এমন মুহূর্ত আরো অনেকদিন দেখতে চায় তার ভক্তকূল।