টাইম ট্রাভেল কি আদৌ সম্ভব? (পর্ব-১)

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি:

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে স্থান ও কালের বক্রতা মামুলি ঘটনা। গ্যালাক্সির চারপাশে দ্রুত যেতে কিংবা সময় পরিভ্রমণে এগুলো ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক সত্য। কাজেই টাইম ট্রাভেল বা সময় পরিভ্রমণ করার সম্ভাবনা কতটুকু?

স্থান ও কালকে যে বাকানো বা বিকৃত করা সম্ভব সে ধারণাটা অতিসাম্প্রতিক কালের। দুই হাজারের বেশি সময় ধরে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির স্বত:সিদ্ধান্তগুলোকে শেখানে হয়েছে, তারা হয়তো মনে করতে পারবে এসব স্বত:সিদ্ধের একটি পরিণতি হলো ত্রিভুজের কোণগুলো যোগ করলে ১৮০ ডিগ্রি হয়।

কিন্তু গত শতকে মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, জ্যামিতির অন্য ধরনের রুপ থাকা সম্ভব, যেখানে ত্রিভুজের কোণগুলো যোগ করলে ১৮০ ডিগ্রি হওয়ার প্রয়োজন হবে না। যেমন পৃথিবীপৃষ্ঠের কথাই ধরা যাক। ভূপৃষ্ঠে একটি সরলরেখার ওপর সবচেয়ে কাছের কোন কিছুকে বলা হয় বৃহৎ বৃত্ত। দুটি বিন্দুর মধ্যেই এটিই হলো সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। কাজেই এটিই বিমানের চলার পথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এবার মনে করুন, ভূপৃষ্টের ওপর ত্রিভূজটি বিষুবরোখায় গঠিত হয়েছে, ০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের রেখাটি লন্ডনের ওপর দিয়ে এবং ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ রেখাটি বাংলাদেশের পূর্বদিক দিয়ে চলে গেছে। এই দুই দ্রাঘিমা রেখা বিষুবরেখা সমকোণ বা ৯০ ডিগ্রিতে মিলিত হবে। আবার দ্রাঘিমা রেখা দুটি পরস্পরের সঙ্গে উত্তর মেরুতে ৯০ ডিগ্রি বা সমকোণে মিলিত হবে। কাজেই এখানে তিন মনকোণের ত্রিভুজ পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে এই ত্রিভুজের কোণগুলো যোগ করে ২৭০ ডিগ্রি পাওয়া যাচ্ছে। যা একটি সমতল পৃষ্ঠের একটি ত্রিভুজের ১৮০ ডিগ্রির চেয়ে অবশ্যই বেশি।

যাইহোক সাধারণ আপেক্ষিকতা ছিল অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। মহাবিশ্ব সম্পর্কে এটি আমাদের চিন্তাভাবনার পদ্ধতি পাল্টে দিয়েছে। এটি শুধু বক্রস্থানেরই তত্ত্ব নয়, বরং বক্র বা বিকৃত স্থানের তত্ত্ব। আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে বুঝতে পারলেন স্থান ও কাল পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তার আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব জন্ম নেওয়ার সময় তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। এরপর স্থান ও কালকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত করেছিলেন। কোন একটি ঘটনার স্থানকে চারটি সংখ্যা দিয়ে বর্ণনা করা যায়। এরমধ্যে তিনটি সংখ্যা ঘটনাটির অবস্থান বর্ণনা কর। সেগুলো অক্সফোর্ড সার্কাসের উত্তর ও পূর্বদিকে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ওপরে হতে পারে। বড় পরিসরে তারা গ্যালাকটিক অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ এবং ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দুরত্ব হতে পারে।

এর মধ্যে চতুর্থ সংখ্যাটি হলো ঘটনার সময় বা কাল। কাজেই স্থান ও কালকে একসঙ্গে চার মাত্রিক অস্তিত্ব হিসেবে ভাবা যেতে পারে। যাকে স্থান কাল হিসেবে ডাকা হয়। স্থান কালের প্রতিটি বিন্দুকে চারটি সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। যা স্থানে ও সময়ে তার অবস্থান নির্দেশ করে। স্থান ও কালকে এভাবে স্থান কালে একত্র করা কিছুটা তুচ্ছ হয়ে উঠতে পারে, যদি তাদের কেউ কোন অনন্যোপায় বিজড়িত করা হয়। অর্থাৎ সেখানে যদি প্রতিটি ঘটনার সময় ও অবস্থান সংজ্ঞায়িত করা কোন অনন্যোাপায় থাকত। তবে সুইস পেটেন্ট অফিসে ক্লার্ক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ১৯০৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন দেখালেন যে সময় ও অবস্থানে যেখানে একটি ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ ভাবছে, তা নির্ভর করে সেকীভাবে চলাফেরা করছে তার ওপর। এর অর্থ হলো সময় ও স্থান অবিচ্ছেদ্য ভাবে পরস্পরের সঙ্গে সুক্ত। সে সময়গুলো বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের ঘটনার সঙ্গে বরাদ্দ থাকবে। পর্যবেক্ষকেরা যদি পরস্পরের সাপেক্ষে স্থান পরিবর্তন না করে তাহলে সেগুলো খাপ খাবে। কিন্তু তাদের আপেক্ষিক গতি দ্রতবেগের হলে সেগুলো আর খাপ খাবে না। কাজেই প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কোন পর্যবেক্ষকের সময় পেছন দিকে যাওয়ার জন্য আরেক পর্যবেক্ষকের সময়ের সাপেক্ষে কোন ব্যক্তিকে কত দ্রুত যাওয়ার দরকার।

কাজেই সময় পরিভ্রমণের জন্য আমাদের প্রয়োজন একটি স্পেসশিপ বা নভোযান যেটি আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে চলতে পারবে। দুভার্গ্যক্রমে ওই একই গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন কোন স্পেশিপকে আলার কাছাকাছি বেগে নিয়ে যেতে রকেটের শক্তি ক্রমেই অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের গবেষণাপত্র দেখে মনে হয়েছিল তা অতীতকালে সময় পরিভ্রমণকে বাতিল করে দিয়েছে। এটি আরও আভাস দেয়, অন্য নক্ষত্রগুলোতে স্পেস ট্রাভেল খুবই ধীরগতির আর বিরক্তিকর কাজে হযে দাড়াবে। আমাদের কাছ থেকে সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রে ঘুরে আসতে কেউ যদি আলোর চেয়ে বেশি বেগে না চলতে পারে তাহলে তার অন্তত আট বছর লাগবে। আর আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ঘুরে আসতে সময় লাগবে ৫০ হাজার বছরর নভোযানটি আলোর বেগের খুবই কাছাকাছি কেন্দ্রে ঘুরে আসতে মাত্র কয়েক বছর লেগেছে। কিন্তু যদি ফিরে এসে দেখেন যাদের আপনি চিনতেন তারা সবাই কয়েক হাজার বছর আগেই মারা গেছে এবং বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে তাহলে তাতে আর কোন সান্ত¦না দেওয়া ছাড়া আর কিছু থাকবে না। বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জন্য এটা মোটেও ভালো নয়। তাই এই জটিলতার থেকে লেখকদের উপায় খুজে বের করতেই হবে।

চলবে…

কৃতজ্ঞতা-

বই : বড় প্রশ্ন ছোট উত্তর।মূল : স্টিফেন হকিং।ভাষান্তর : আবুল বাসার