সোলায়মানি হত্যায় আমেরিকার পতনের সুর!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের বিখ্যাত জেনারেল কাশেম সোলায়মানিকে নিরন্তর হত্যার চেষ্টা করেছে প্রধানত তিনটি দেশ-আমেরিকা, ইসরায়েল ও সৌদি আরব। এর বাইরে আইএস এবং আল কায়েদা ছিল তাঁর প্রধান শত্রু। কাশেম সোলায়মানির পরিকল্পনা ও বুদ্ধিমত্তার কারণেই এই সম্মিলিত শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা প্রায় দুই যুগ ধরে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছে কাশেম সোলায়মানিকে হত্যা করতে। কিন্তু বিষ্ময়করভাবে প্রতিবার বেঁচে যান কাশেম সোলায়মানি। উইক্লিক্স ফাঁস করেছে যে সাংবাদিক জামাল খাশোগির মত নৃশংসভাবে কাশেম সোলায়মানিকে হত্যা করতে চেয়েছিল সৌদি আরব! প্রতিবারই কাশেম সোলায়মানিকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলেও এইবার সফল হয়েছে আমেরিকা। কাশেম সোলায়মানি ফিরছিলেন লেবানন থেকে ইরাকে।

বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নামার পর উঠেছিলেন গাড়িতে আর ঠিক সেই সময় আমেরিকা হেলিকপ্টার থেকে গাড়িতে হামলা করে। যত বড় বীর হন না কেন এইরকম চোরাগোপ্তা হামলায় নিশ্চিৎ মৃত্যু। তবে ইরাকি জনতার বাগদাদে মার্কিন দুতাবাস আক্রমণ নিয়ে ইরানের সাথে আমেরিকার যেখানে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করেছিল ঠিক সেই সময়ে কাশেম সোলায়মানির ইরাক সফর কোনদিক দিয়েই নিরাপদ ছিল না। অকুতোভয় কাশেম সোলায়মানি তাঁর জীবনের কোন তোয়াক্কা না করেই দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন বলেই আজকে আমেরিকা তাকে হত্যা করতে পারল। এরকম একটা সুযোগ ও সময়ের অপেক্ষায় ছিল আমেরিকা।

পশ্চিমা মিডিয়া কাশেম সোলায়মানির নাম দিয়েছিল শ্যাডো কমান্ডার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি তাঁর নাম দিয়েছিলেন জীবন্ত শহীদ! কারণ তিনি মৃত্যুকে পরোয়া করতেন না। বিশ্ব মিডিয়ায় তাঁর যে ছবিগুলো প্রকাশ পেয়েছিল এর মধ্যে তাঁকে দেখা গেছে ইরানের একটা বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান হয়েও ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস বিরোধী যুদ্ধে কোন প্রোটেকশন ছাড়াই তিনি যুদ্ধ ক্ষেত্রের সম্মুখ সারিতে সাধারণ সৈনিক বা জওয়ানদের সাথে উপস্থিত।

পশ্চিমা মিডিয়া যত অপপ্রচারই চালাক না কেন আইএস পতনে আমেরিকার উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা ছিল না। ইরাক ও সিরিয়া থেকে আইএস এর খেলাফত পতনে মূল ভূমিকা কাশেম সোলায়মানির। এই কাশেম সোলায়মানি রাশিয়ার পুতিনকে আইএস বিরোধী যুদ্ধে মাঠে নামতে রাজি করিয়েছিলেন এবং ইরাক ও সিরিয়ার তরুণদের নিয়ে আইএস বিরোধী যুদ্ধের জন্য আলাদা আলাদা বাহিনী গঠন করেছিলেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে গিয়েছিল।

কাশেম সোলায়মানি এক গরীব পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর সাদ্দাম যখন ইরান আক্রমণ করে তিনি সেই সময় ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী আইআরজিসিতে যোগ দেন এবং অসাধারণ মেধা ও কৃতিত্বের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন এবং একটা ডিভিশনের কমান্ডার নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ইরানের একটা বিশেষ বাহিনী কুদস ফোর্স গঠিত হলে তিনি সেই ফোর্সের প্রধান নিযুক্ত হন। এই ফোর্সের কাজ হল ইরানের বাইরে ইরানের শত্রুদের নিষ্ক্রিয় ও ধ্বংস করা। তাই ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লেবানন ও হালের ইয়েমেনে হল এই বাহিনীর মূল কাজ। সেই সূত্রে এইসব দেশ কাশেম সোলায়মানি ঘন ঘন সফর করতেন। এইসব দেশের ক্ষেত্রে ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি মূলত কাশেম সোলায়মানি নির্ধারণ করতেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বর্তমান বিস্তৃত প্রভাব বৃদ্ধিতে মূল সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন কাশেম সোলায়মানি।

ইরাকের মাটিতে ইরানের সেনা কমাণ্ডারকে বিমান বন্দরে সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যা করে ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের পাশাপাশি আমেরিকা আন্তর্জাতিক সমস্ত নিয়ম কানুনকে আরেকবার বৃদ্ধাঙ্গুল দেখালো। আমেরিকা যে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আমেরিকা নিজেই আবার প্রমাণ করল। এর মাধ্যমে আমেরিকা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল বিশ্বের কেউ কোথাও নিরাপদ নয়। প্রক্সি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এর মাধ্যমে আমেরিকা ইরানের সাথে প্রক্সি যুদ্ধের পরিবর্তে খোলাখুলি যুদ্ধে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত করল। নিঃসন্দেহে আমেরিকা কাশেম সোলায়মানিকে হত্যা করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের জলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঘি ঢেলে দিলো। এই আগুনে আমেরিকা নিজে পুড়বে অন্যকেও পুড়াবে। মরবে আবারও লাখ লাখ মানুষ! ইরান এখন কি ধরণের প্রতিশোধ নেয় তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি যেখানে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা অঙ্গীকার করেছেন সেখানে ইরান যে চুপ করে বসে থাকবে না তা বলাই বাহুল্য। ইরান এতদিনে শুধুমাত্র একজন কাশেম সোলায়মানি তৈরি করেনি।

ইরানের এরকম শত শত কাশেম সোলায়মানি আছে যারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তৎপর। কাশেম সোলায়মানি নিজ ক্যারিশম্যায় ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেনে তাঁর লাখ লাখ অনুসারী সৃষ্টি করেছেন যারা আমেরিকার আধিপত্যবাদের ঘোর বিরোধী। সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন নামে সামরিক সংগঠন যারা নিজ নিজ দেশের সরকারেরও অংশ ও এরা শুধু আইএস বা আল কায়েদা বিরোধী নয় এবং একই সাথে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত।
সূত্র : ইন্টারনেট।