আবুবকর

সুচির বিরুদ্ধে কথা বলা কে এই আবুবকর?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কে এই আবুবকর? এমন প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো- রোহিঙ্গা গণহত্যার দায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাকারী। যেখানে নেতৃত্বস্থানীয় মুসলিম দেশগুলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনগত কোন পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে কম আলোচিত একটি দেশের এমন ভুমিকা স্বভাবিক ভাবে বিবেককে নাড়া দিয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক আবুবকর সর্ম্পকে বিস্তারি।

ব্রিটেনে আইন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে গত শতকের শেষ দিকে গাম্বিয়া ফিরে আইন পেশায় যোগ দেন আবুবকর। ২০০০ সালে একটি ঘটনা আবুবকরের চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ওই বছর ১৪ জন শিক্ষার্থীকে রাজপথে হত্যা করে সরকারি বাহিনী।

এরপরই আবুবকর মানবাধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০০৩ সালে জাতিসংঘে যোগ দিয়ে তানজানিয়ায় রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে কৌঁসুলি হিসেবে অংশ নেন। বলা হয়ে থাকে, আবুবকরের কৌশলী ও দৃঢ় ভূমিকার কারণে সাবেক সেনাপ্রধান আউগুস্টিন বিজিমুনিগোর ৩০ বছরের কারাদণ্ড হয়।

গত তিন বছরে অনেকটাই বদলে গেছে গাম্বিয়া। ২২ বছরের শাসনামলে গাম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহইয়া জামেহ বিরোধীমত দমন করে এক ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। হত্যা, গুম, আটক করে নির্যাতন নিত্যকার ঘটনা ছিল গাম্বিয়াবাসীর জীবনে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে আদম ব্যারো প্রেসিডেন্ট ইয়াহইয়া জামেহকে পরাজিত করেন। এরপরই গাম্বিয়ার পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। পরবর্তীতে নতুন সরকার ট্রুথ কমিশন গঠন করলে ইয়াহইয়ার আমলের অনেক কুকীর্তি বেরিয়ে আসে। ইয়াহইয়ার দুঃশাসনই গাম্বিয়াকে মানবতার পক্ষে লড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে আবুবকর জানান।

আর রুয়ান্ডা গণহত্যা বিচারের অভিজ্ঞতা আবুবকরকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করতে সাহস জুগিয়েছে। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ছিল এটা। সবাই যখন নীরবে মিয়ানমারের গণহত্যা অবলোকন করছিল কিন্তু গণহত্যা বন্ধে তেমন জোরালো ভূমিকা রাখছিল না, তখনই এগিয়ে এল গাম্বিয়া। জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশন অনুসারেই একটি দেশ আরেকটি দেশের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ করতে পারে। এর আগেও বসনিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উত্থাপন করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ১৯৯৩ সালে। ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই মামলার সুরাহা করা হয়নি। কিন্তু ৭০০০ কিলোমিটার দূরের দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্তের জন্য মামলা করেছে। এতে করে মিয়ানমারকে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আদেশ দিতে পারেন আদালত। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো রায় হলে নিরাপত্তা পরিষদে গিয়ে আটতে যেতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদে চীন ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে না।

আবুবকর

এখানে লক্ষণীয়, যেসব দেশ মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের জন্য নিরন্তর লড়াই করছে, এদের কেউই মিয়ানমারে বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসেনি। মুসলিম পরিচিতিকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যবহারকারী সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান বরাবর নিন্দা জানানো ও বিবৃতি দানের মধ্যেই সীমিত ছিল। তুরস্ক অবশ্য ত্রাণ পাঠিয়েছে। এখানে দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমারের মিত্র মুসলিম বিশ্বেরও মিত্র। মিয়ানমারের সঙ্গে চীন, রাশিয়া, আমেরিকা, ভারতের আঞ্চলিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। এসব দেশকে চটিয়ে এককভাবে কেউই মিয়ানমারের বিপক্ষে যেতে চায়নি। এ অবস্থায় গাম্বিয়া ওআইসিতে প্রস্তাব উত্থাপন করলে কেউ এর বিরোধিতা করতে পারেনি। এখানেই গাম্বিয়া অন্যদের থেকে এগিয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত মামলার ফলাফল যা-ই হোক, আবুবকরকে সময় মনে রাখবে। গাম্বিয়াকে সবাই মনে রাখবে। নির্যাতিতের পক্ষে, নিপীড়িতের সঙ্গে দাঁড়ানোর সুযোগ সময় করে দেয়। কিন্তু সেই সুযোগ সবাই গ্রহণ করতে পারে না। যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যান, ইতিহাসের পাতায় তাঁদেরই নাম লেখা হয়। গাম্বিয়ার মামলার পেছনে নানা কারণ খুঁজে বের করা যাবে। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও সংযোগ থাকতে পারে। কেউ হয়তো গাম্বিয়াকে উসকাতেও পারে। কারও দ্বারা প্রভাবিত হলেও গাম্বিয়াকে, আবুবকরকে মানবতার পক্ষের বলেই ইতিহাস স্মরণ করবে। ইতিহাস তাঁদের মনে রাখবে এই কারণে যে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা না থাকার পরও ‘তোমাদের দাবি আমাদের দাবি’ বলে রোহিঙ্গাদের রক্ষায় আবুবকর নামের এক আইনজীবী তাঁর দেশ গাম্বিয়াকে নিয়ে এগিয়ে এসেছিল।