কবি : একাধিক ব্যর্থ মানুষের গল্প

বুক রিভিউ,ঢাকা

হুমায়ুন আহমেদ-এর ‘কবি’ উপন্যাসের রিভিউ লিখার সাধ্য সত্যি আমার নেই। তবে অনুভুতির তরজমা তো করতেই পারি। এই উপন্যাস একাধিক ব্যর্থ মানুষদের উপাখ্যান।লেখক সু কৌশলে সমাজের সামগ্রীক মানুষের তথ্যচিত্র জাহির করেছেন এ উপন্যাসে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন, যুদ্ধ করতে করতে হেরে যাওয়া মানুষের অবয়ব কেমন হয়। মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন নিয়ে জীবন কতটা জগাখিচুর হয়ে উঠে একজন ব্যর্থ প্রেমিকের।

বলে রাখা ভালো, অন্যসব উপন্যাসের মত এ উপন্যাসে একটি দুএকটি চরিত্রকে লেখক গুরুত্ব দেননি। গুরুত্ব দিয়েছেন প্রত্যেকটি চরিত্রকে।

এবার তবে শুরু করার আগে একটু সম্মোক জ্ঞান দিয়ে নেই। তবে উপন্যাসটি সর্ম্পকে বুঝতে সুবিধা হবে। ধরা যাক- সিলেটের মীরাবাজারের পুরানো শ্যাওলা ধরা দালানের একটা ঘর। মধ্যরাত্রি। পাঁচ-ছ’ বছর বয়েসী একটি শিশু বাবা-মা’র পাশে ঘুমুচ্ছে। বাইরে উথাল পাথাল জোছনা। সেই জোছনা বাড়ির ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে ঢুকেছে, পড়েছে শিশুটির মশারির ছাদে। মনে হচ্ছে আলোর ফুল ফুটে আছে। হঠাৎ শিশুটির ঘুম ভেঙে গেল। সে বিস্ময় এবং ভয় নিয়ে তাকিয়ে রইল জোছনার ফুরের দিকে। এক সময় বাবাকে ডেকে তুলে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এটা কি? শিশুর বাবা ফুলের রহস্য ব্যাখ্যা করলেন-“ভেন্টিলেটারের ফুলের নকশাকাটা। জোচনা ভেন্টিলেটার দিয়ে ঢুকেছে বলেই ফুল হয়ে মশারির ছাদে পড়েছে। ভয়ের কিচ্ছু নেই। শিশুর ভয় তারপরেও যায় না। তখন বাবা বললেন, হাত দিয়ে ফুলটা ধর, ভয় কেটে যাবে। শিশুটি সেই ফুল হাত দিয়ে ধরতে গেল। যতবারই ধরতে যায় ততবারই ফুল হাত গলে বের হয়ে যায়। কবি-জোছনার ফুল ধরার গল্প। মহান বোধকে স্পর্শ করার আকাংক্ষার গল্প। জীবনকে দেখা এবং না দেখার গল্প।

এবার আসা যাক মুল আলোচনায়- রশীদ সাহেব মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না , ডিগ্রীধারি বেকার দুই ছেলে সহ এক পরিবারে রোজগার চালু রাখতে বুড়ো বয়সে ছাত্র পড়াতে হচ্ছে। স্ত্রী কেন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তা জেনেও জানতে পারেন নি হোসেন সাহেব। মায়ের পরপুরুষের হাত ধরে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি সাজ্জাদ।দিনে দিনে বেড়ে উঠেছে antisocial psychopath হিসেবে। কবি হয়ে ওঠার স্বপ্নেবিভোর সাজ্জাদের ঠাই হয় মাদকাসক্তদের চিকিৎসা কেন্দ্রে। সাজ্জাদের দুই বন্ধু মজিদ আর আতাহার। মজিদের কাছে কবিতা আরাধনার বস্তু।সুবর্ন পত্রিকার সম্পাদকের মতে সত্যি সত্যি কবি হয়ে উঠছিল মজিদ। জাহেদার নিষ্কলুষ প্রেমও তার আরাধ্য। শেষে কবিত্ব বিসর্জন দিয়ে সংসারী হয় মজিদ। এদিকে লেখার হাত যেমনই, হোক কবিতার জন্য প্রায় সবকিছুই বিসর্জন দেয় আতাহার।কবিতা আর নীতু এই দুইজন বাদে বাকি সবই জীবন থেকে বাদ গেছে তার।

উপন্যাসের শেষ অংশে এসে তারাশঙকরের নিতাই কে কোট করছেন লেখক “জীবন এত ছোট কেনে”। মানুষের জীবনের অপ্রাপ্তি নিয়ে উপন্যাস সম্ভবত অনেক লেখা হয়েছে। তারাশংকরের “কবি”র পর হুমায়ুন আহমেদের “কবি” যেন এক সিক্যুয়েল।হয়তো অন্য কোন লেখকের লেখায় আবারও “কবি” লেখা হবে। যতবার লেখা হবে ততবারই হয়তো আমি এমনটাই মুগ্ধ হয়ে পড়ব।