সালজ়বার্গ, অস্ট্রিয়া।

মিউজিকের শহরে একদিন

দীপান্বিতা মুখোপাধ্যায় ঘোষ, কলকাতা

সামনে একদম সোজা খাড়া রাস্তা। মাথা তুলে তাকালে ওপারে কিছুই আন্দাজ করা যায় না।তবুও দুরুদুরু বুকে জামাইয়ের দিকে তাকালাম। তার অবস্থা আরও খারাপ।এরউপর গলায় ভারী ক্যামেরা।আপদ-বিপদের কথা ভূলে পা বাড়ালাম সামনে। অনেকা এ্যাভারেস্ট বিজয়ের মত সুখ অনুভূত হতে লাগলো।

সালজ়বার্গের সবচেয়ে উঁচুতে এই হোয়েনসাল‌জ়বার্গ ফোর্ট্রেস। ইউরোপের অন্যতম বড় ক্যাসলগুলির মধ্যে একটি। এখান থেকে আল্পসের চুড়াও নাগালের মধ্যে মনে হয়। গোটা শহর দেখা যায়। শহরে আধুনিক আর প্রাচীন দুই মেজাজের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সালজ় নদী। দুর্গের দুর্গমতা উপভোগ করে নীচে নামার সময়ে দেখা গেল, লিফটে করে সটান উপরে চলে আসার আলাদা রাস্তা রয়েছে। প্রচণ্ড আফসোস হতে হতেও মনে হল, যে পথটা পেরিয়ে দুর্গদ্বারে পৌঁছেছি, সেটাও তো কম উপভোগ্য নয়।

অস্ট্রিয়া এমনিতেই রূপসী। তার মধ্যে সালজ়বার্গ সেরা। আল্পসের উত্তরের সীমানা ঘেঁষা এই শহর বাঙালির কাছে ‘সাউন্ড অব মিউজ়িক’-এর নস্ট্যালজিয়া বয়ে আনে। এখানে এলে বোঝা যাবে রবার্ট ওয়াইজ় কেন তাঁর মিউজ়িক্যাল শুট করেছিলেন। ‘সাউন্ড অব মিউজ়িক’ টুরও আছে। যে সব জায়গায় শুটিং হয়েছিল, সেই লোকেশন আর প্রপস দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

সালজ়বার্গের অন্যতম আকর্ষণ মোৎজ়ার্ট। এখানেই শিল্পীর জন্ম-কর্ম। ওল্ড টাউন সেন্টারে মোৎজ়ার্টের বাড়ি-মিউজ়িয়াম ও আছে। তবে শিল্পী শুধু স্ট্যাচু আর মিউজ়িয়ামেই আটকে নেই। বিপণন কোন জায়গায় যেতে পারে তা মোৎজ়ার্টের নামের বিভিন্ন মার্চেন্ডাইজ় বিক্রির হিড়িক দেখলে বোঝা যাবে। মৃত্যুর তিনশো বছর পরেও তিনি প্রাসঙ্গিক এবং জীবন্ত।

বেড়াতে গিয়ে যদি আলসেমি করতে ইচ্ছে করে, তা হলে সালজ়বার্গ তার আদর্শ জায়গা। ওল্ড টাউনে থাকলে তো হয়েই গেল। বারান্দায় বসেই নিসর্গ উপভোগ করা যাবে। আমরা ছিলাম নিউ টাউনে। ছোট শহর যেহেতু, তাই ট্রান্সপোর্টের প্রয়োজন আমাদের পড়েনি। চাইলে আপনি সাইকেল ভাড়া করে নিতে পারেন। নিউ টাউন থেকে বেরিয়ে নদীর ধার ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজ পেরিয়ে দিব্যি রোমানিয়ান-গথিক আর্কিটেকচারের রাজ্যে ঢুকে পড়া যায়।

কয়েক পা হাঁটলে সিটি স্কোয়্যার। চার ধারে অসাধারণ স্থাপত্য নির্মাণ। তার মাঝখান দিয়ে সরু সরু রাস্তা। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অজস্র দোকানপাট, রেস্তরাঁ, কাফে। একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়লেই হল। দূরে আল্পসের ঝলক, পাহাড়ের ধাপে সালজ় দুর্গ, স্কোয়্যারের মাঝে বা গলির মুখে কোনও মিউজ়িশিয়ান নিজ সৃষ্টিতে মগ্ন… নিসর্গ, সঙ্গীত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে।

অস্ট্রিয়ায় ইউরোর মাধ্যমেই কেনাবেচা হয়, সুতরাং জিনিসপত্র একটু দামি ঠেকতে পারে। শপিং মলও আছে। কিন্তু গেটরাইডগ্যাসের পাথুরে রাস্তায় হাঁটলে ইতিহাসের যে গন্ধ পাওয়া যায়, তার আকর্ষণ ছাড়া মুশকিল। হাল ফ্যাশনের পোশাক তো পাবেনই। চাইলে জুলি অ্যান্ড্রুজ়ের মতো এ দেশের ট্র্যাডিশনাল পোশাকও পরতে পারেন। এখান থেকে উলের টুপি, মাফলার কিনতে পারেন। আপনার বন্ধুরা ঈর্ষা করবেনই।

সুভেনিরের জন্য টি-শার্ট, কফি মাগ, বাড়ি সাজানোর টুকিটাকি, বেল কিনতে পারেন। আর আছে মোৎজ়ার্টের নামাঙ্কিত অজস্র সুভেনির। এখানকার স্টোনের গয়না যেমন ক্লাসি, তেমনই স্টাইলিশ।

শপিং মলগুলো প্রধানত শহরের আধুনিক অংশে। কিন্তু ওল্ড টাউন চত্বরে থাকলে ওই দিকে আর যেতে ইচ্ছে করবে না। এই এলাকাতেই সালজ়বার্গ ক্যাথিড্রাল, হোলি ট্রিনিটি চার্চ, সেন্ট পিটার্স অ্যাবে, মোৎজ়ার্টের বাড়ি। ঘুরতে ঘুরতে সময়ের ঠিক থাকে না।

এখানের সসেজ, হ্যাম না চাখলে পস্তাতে হবে। সব দোকানের বাইরে মেনু লেখা। অনেক জায়গায় লেখা ‘কেবাপ’। খোঁজ নিয়ে জানলাম আমাদের কাবাবের অস্ট্রীয় ভার্সান কেবাপ। স্বাদ মোটামুটি একই। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যুর আসল মর্মার্থ এখানে এসেই বুঝেছি। ইউরোপে এসে সসেজ না খাওয়া অপরাধ। তাই একটা প্ল্যাটার অর্ডার করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত টেবিলে যে পদটা এসে পৌঁছল সেটা আমার গোটা দিনের খাবার! আকারে প্রকারে সসেজগুলো বৃহৎ বললে কম বলা হয়।

আর একটি অভিজ্ঞতাও ভোলার নয়। হোয়েনসাল‌জ়বার্গ ফোর্ট্রেস যাওয়ার রাস্তায় একটি রেস্তরাঁ পড়ে। খাড়াই রাস্তা চড়তে চড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়লে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেওয়া যায়। পাহাড়ের খাঁজে অদ্ভুত ভাবে তৈরি এই রেস্তরাঁ। ভিতরের স্থাপত্যও নজর টানে। তবে রেলিংয়ের ধারে বসে চোখ মেললে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে সবুজ প্রান্তর, সেই প্রান্তর ছাড়িয়ে আবছায়া আল্পস…মুহূর্ত ওখানেই থমকে যায়!