৩৪ বছর শিক্ষকতা শেষে এখন পত্রিকার হকার

খবরাখবর ডেস্ক:

টানা ৩৪ বছর পড়িয়েছেন। শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসীত করেছেন হাজার হাজার ছেলে মেয়েকে। সরকারি নিয়ম অনুসারে শিক্ষকতা থেকে নিয়েছেন অবসর। তাই বলে বসে থাকবেন? এমন মানুষ নন আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজের রসায়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী ইসাহাক শরীফ। লোকে তাকে ইসাহাক স্যার বলেই ডাকে। অবসরের এই সময়েও খেটে যাচ্ছেন জ্ঞানের আলো পৌছে দিতে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পত্রিকা বিলি করছেন তিনি। কোনও আর্থিক অনটনের কারণে নয়, একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের মাঝে তথ্য জ্ঞান পৌঁছে দিতে তার এই প্রয়াস। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটেসহ বিভিন্ন যানবাহনে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ ঘুরে ৩শ’ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি।

শুধু অর্থ কামাই নয়, যারা ছোট কাজ করতে অপমানিত বোধ করেন, যারা কাজ করতে লজ্জা পান সেই সব নতুন প্রজন্মের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতেই এই কাজ বেছে নিয়েছেন তিনি। এই দৃষ্টান্ত অনুকরণ করে কেউ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হলেই তবেই স্বার্থকতা খুঁজে পাবেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজের রসায়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী ইসাহাক শরীফ।

হকারি জীবনের শুরুতে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত মহল ইসাহাকের এই কাজটি তুচ্ছজ্ঞান করেননি বটে, তবে তারা বিভিন্নভাবে তার হকারি কাজে বাঁধ সাধেন। স্ত্রী, একমাত্র শিক্ষিকা মেয়ে এবং মেঝভাই তার হকারির বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ করে। তবে ইসাহাক শরীফ এসব নিয়ে কারও সাথে বিতর্কে যাননি। তার বক্তব্য, আমার একটা লক্ষ্য আছে, তারা (আত্মীয়-স্বজন) তো সেটা ফেলে দিতে পারে না।

তাদের অনেকেই তাকে বলেছেন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এই কাজটি মানানসই নয়। বিশেষ করে তার (ইসাহাক) জন্য উপযুক্ত নয় এবং আর্থিক সমস্যা নেই বলে স্বজনরা তাকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। হকার হওয়ার পর কিছু মানুষ, এমনকি সাবেক কিছু ছাত্ররাও তাকে এড়িয়ে চলেছে।

শুরুর দিকে তিনি দেড় শ’ কপি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা বিক্রি করতেন। এখন জাতীয় ও স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় ৩শ’ কপি পত্রিকা বিলি করেন প্রতিদিন।

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে হকারি কাজ শুরু হয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইসাহাক শরীফের। পায়ে হেটে ১৫-২০ কিলোমিটারসহ বিভিন্ন যানবাহনে বাবুগঞ্জের কেদারপুরের পূর্ব ভূতেরদিয়া থেকে বাহেরচর, রাকুদিয়া, রহমতপুর, ৭ মাইল ক্যাডেট কলেজ এবং উজিপুরের গুঠিয়া এলাকার প্রায় ৮০ কিলোমটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন গ্রাহকদের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন তিনি। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়, শৈত্য প্রবাহ কোনও কিছুই ইসাহাকের হকারি কাজে বাঁধ সাধতে পারেননি। হকারি করে কমিশনে প্রতিদিন প্রায় ৪শ’ টাকা আয় করেন তিনি। কিছু টাকা আজীবন বাকি থেকে যায়। গত মে মাসে ১৩ হাজার, জুনে ৬ হাজার, জুলাইতে ৭ হাজার, আগস্টে ৮ হাজার এবং সেপ্টেম্বরেও ৮ হাজার টাকা আয় হয়েছে তার।

আয়ের একটি অংশ শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ‘পড়ুন শিখুন, জীবন গড়ুন’ বলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করেন তিনি।

এখন থেকে যেসব এলাকায় পত্রিকা দেন সেইসব এলাকার প্রাইমারি থেকে কলেজ পর্যায়ের মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্রেস্ট না দিয়ে নগদ টাকা পুরস্কার দেওয়ার মনস্থির করেছেন ইসাহাক শরীফ।

ইসাহাক শরীফ এর মতে, ‘উন্নত দেশে সবাই কাজকে সন্মান করে। এদেশে কাজের শ্রেণি বিন্যাসে যুবকরা পরিশ্রম বিমুখ। তারা পরিশ্রমের কাজকে হেয় মনে করে এবং এ কারণে তারা কাজ পায় না। তারা বেকারত্বের মধ্যে নেশায় মত্ত হয়। আর্থিক অস্বচ্ছলতা না থাকার পরও তাদের কাছে উদাহরণ সৃষ্টির জন্য এই কাজ চালাচ্ছেন তিনি। এটা তাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে। ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর কুলি হয়েছিলেন। সেটা আমরা স্বীকার করি, কিন্তু অনুসরণ করি না।’

বাবুগঞ্জের রাকুদিয়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম শরীফ ও গৃহিনী জামেনা খাতুন দম্পত্তির ছেলে ইসাহাক শরীফ ১৯৬৩ সালে বানারীপাড়ার চাখার ফজলুল হক স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ৪ ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় ইসাহাক চাখার ফজলুল হক কলেজ থেকে ৬৮ সালে এইচএসসি পাশ করার পর পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়েন। ৪ বছর বিরতির পর ৭১ সালে ভোলা সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি এবং ৭৩ সালে (পরীক্ষা হয় ৭৫ সালে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর পাশ করেন।

স্নাতকোত্তর পাশ করেই ৭৫ সালে নিজ গ্রামে বাবা ‘আবুল কালামের’ নামে বড় ভাই ব্যবসায়ী হাসান আলী শরীফের উদ্যোগে ৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজের’ রসায়ন বিভাগের প্রভাষক পদে যোগ দেন তিনি। ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারিকরণ হয়। একই স্থানে মা জামেনা খাতুনের নামে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন তার বড় ভাই।