লিওনার্দো

৫০০ বছরেও অভেদ্য ভিঞ্চির মোনালিসা রহস্য

শিল্প ও সাহিত্য :

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি একজন চিত্রশিল্পীই নন। তার আকিবুকি কখনো বৈজ্ঞানিক রুপরেখা, কখনো বা সমারাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করেছে। তবে ভিঞ্চির মোনালিসার ছবি নিযে তাবৎ দুনিয়ায় রয়েছে হাজারটা রহস্য। ৫০০ বছর ধরেও ভিঞ্চির এ রহস্য কেউ ভেদ করতে পারেনি।রোম থেকে আল্পসের পথে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যখন ফ্রান্সের উদ্দেশে যাত্রা করেন, তখন তার বয়স ৬৪। চলেছেন ঘোড়ায় টানা গাড়িতে। যাত্রার আগে ঠিক করলেন, মোনালিসাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। চিত্রকর্মটি ঘোড়ার জিনের পেছন দিকে ঝোলানো ভারী থলিতে রাখা হলো। লিওনার্দো চলেছেন ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের অনুরোধে। বড় অংকের পেনশন আর লোয়ারে বিশাল অট্টালিকাসম বাড়ির প্রস্তাব দিয়ে লিওনার্দোকে রাজি করিয়েছেন তিনি।

লিওনার্দোর জন্য এসব প্রাপ্তি ছিল স্বাভাবিক। জীবনের বেশির ভাগ সময়ে তিনি ধনী ও ক্ষমতাধরদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। উপভোগ করেছেন ফ্লোরেন্সের প্রভাবশালী বণিক পরিবার, মিলানের ডিউক আর রোমের পোপের পৃষ্ঠপোষকতা। তবে প্রথম ফ্রান্সিসের ওই প্রস্তাবটি ছিল লিওনার্দো গৃহীত কারো শেষ অনুরোধ। কেননা ১৫১৯ সালের ২ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ধরে নেয়া হয়, তার মৃত্যুর সময় রাজা ফ্রান্সিস উপস্থিত ছিলেন বা লিওনার্দো রাজার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। যদিও এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। রাজা ফ্রান্সিস লিওনার্দোর মৃত্যুর একদিন পর সেখানে পৌঁছেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক দাবি করেন। আর এত শতক পেরিয়ে সে ঘটনার সত্যতা আজ খুঁজে বের করা নেহাত কঠিন।

তার প্রয়াণের ৫০০ বছর স্মরণে ইউরোপজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে তার কাজের প্রদর্শনী। ভিঞ্চিপ্রেমী মানুষ ছুটছেন মিলান, প্যারিস, ফ্লোরেন্স কিংবা ভেনিসের জাদুঘরে এ মায়েস্ত্রোর মাস্টারপিস—মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার, ভার্জিন অব দ্য রকস কিংবা সেন্ট জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট এক ঝলক দেখতে। বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম সেরা শিল্পী স্মরণে। শিল্পীসত্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিজ্ঞানী, ভাস্কর, স্থপতি, উদ্ভাবক, সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, আবিষ্কারক লিওনার্দোর প্রগাঢ় প্রতিভা আজো জট পাকানো ধাঁধা হিসেবে রহস্য ছড়ায়। মৃত্যুর পর তার ডায়েরি, তার সম্পর্কে লেখা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে ভিন্ন এক সত্তার সন্ধান মেলে, যে সত্তা প্রতিভা ও পাগলামিতাড়িত।

মনঃসংযোগ স্থির না করতে পারার বিষয়টি লিওনার্দোর মধ্যে ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠতে থাকে, বিশেষ করে ভিঞ্চি নামের ছোট গ্রাম থেকে ফ্লোরেন্সে আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিওর কাছে প্রশিক্ষণের দিনগুলোয়। ভেরোচ্চিও ছিলেন সত্যিকারের রেনেসাঁর মানুষ। যিনি লিওনার্দোর বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ ইচ্ছা আর সারগ্রাহী প্রতিভাকে উপভোগ করেছেন। তবে গুরু ভেরোচ্চিওর কাছ থেকে দ্রুত কার্য সম্পাদন আর সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের গুণগুলো লিওনার্দো আয়ত্ত করতে পারেননি। তার প্রথম কমিশনপ্রাপ্ত কাজ, যা কিনা লিওনার্দো তার পিতার মাধ্যমে পেয়েছিলেন, তা বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না করায় বাতিল করা হয়। এছাড়া কর্মসূচি অনুযায়ী অন্য কাজটিও কখনো তার শুরু করা হয়নি। এদিকে স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই করতে হয়েছে তাকে। ২৬ বছর বয়সে ফ্লোরেন্সে নিজের একটি স্টুডিও না দাঁড় করানোর আগ পর্যন্ত ভেরোচ্চিওর ওয়ার্কশপে বেকার সময়ক্ষেপণ করেছেন।

১৪৭৮ সালের জানুয়ারিতে একজন স্বতন্ত্র চিত্রশিল্পী হিসেবে বড় একটি কাজের জন্য কমিশনপ্রাপ্ত হন। কাজটি ছিল স্যান বার্নার্ডোর চ্যাপেলের বেদির পেছনে ছবি আঁকার। এর জন্য অগ্রিম ২৫ ফ্লোরিন নগদ গ্রহণ করলেও কাজটি তিনি হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হন। এসব কারণে তার প্রতি অনাস্থা তৈরি হওয়ায় ভেরোচ্চিওর ওয়ার্কশপের অন্য শিল্পীদের তুলনায় লিওনার্দো স্বতন্ত্র চিত্রকর হিসেবে খুব একটা সাফল্য পাননি। তাছাড়া অন্য শিল্পীদের যেখানে কাজের জন্য রোমে পোপের কাছে পাঠানো হয়, লিওনার্দো তখন একজন সংগীতজ্ঞ হিসেবে প্রেরিত হন মিলানে লরেঞ্জো দে মেডিসির কাছে। এ রাজনীতিবিদ ও ফ্লোরেন্টাইন প্রজাতন্ত্রের শাসক ছিলেন ইতালির রেনেসাঁর শক্তিশালী ও উৎসাহী একজন পৃষ্ঠপোষক।

২০০৪ সালে চার্লস নিকোল তার ‘লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি: দ্য ফাইটস অব দ্য মাইন্ড’ বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘লিওনার্দো ঠিক কী অবস্থায় ফ্লোরেন্স ছেড়ে গেছেন কিংবা তখন তার মানসিক অবস্থাটা কী ছিল তা আমরা জানি না। হয়তো তিনি ব্যর্থতা ও হতাশার বোধ, বিশেষ করে অসম্পূর্ণ ছবি, বিতর্কিত জীবনধারা, একাধারে প্রতিভা ও পাগলামির অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন।’ লিওনার্দোর সঙ্গে রাফায়েলের বয়সের তুলনা করলে দেখা যায়, একই বয়সে ভ্যাটিকানের দেয়ালজুড়ে চিত্রকর্ম সম্পাদনের পাশাপাশি ৮০টির বেশি পেইন্টিংয়ের কাজ শেষ করেছিলেন তিনি। সে তুলনায় লিওনার্দোর ঝুলিতে তেমন কোনো অর্জন জমা পড়েনি।

ওই সময় মিলানের ভবিষ্যৎ ডিউক লুডোভিচো ইল মোরোর দরবারে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ধারণা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকদের চমকে দিয়েছিলেন লিওনার্দো, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ হস্তান্তর করার বিষয়ে তাদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হন। লুডোভিচোর পিতার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি তৈরির কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। জানা যায়, লুডোভিচো তার মিত্র লরেঞ্জো ইল ম্যাগনিফিকোকে নাকি আরো দক্ষ কোনো শিল্পী নিয়োগের কথা বলেছিলেন। কেননা লিওনার্দো কাজটি শেষ করতে আদৌ সফল হবে কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। ২০০৬ সালে কার্লো ভিচ্চি তার প্রকাশিত ‘লিওনার্দো’ বইয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন। লেখক মাত্তেও বান্দেলো ছিলেন ভিঞ্চির সমসাময়িক। বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য লাস্ট সাপার’ নিয়ে কাজের সময়গুলোতে তিনি লিওনার্দোকে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তখন তিনি তার অস্থির মেজাজ, চঞ্চলতা, বিশৃঙ্খলতা আর সাংগঠনিক দক্ষতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেন। সে সম্পর্কে মাত্তেও বলেছেন, ‘দেখতে পেতাম এক ধরনের পাগলামি বা ঘোর তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, কখনো ভরদুুপুরে তিনি বেরিয়ে পড়ছেন। একদিন কোর্তেভেচ্চিওতে (ইতালির একটি জায়গার নাম) কাদামাটির তৈরি দারুণ একটি ঘোড়ার মডেল দেখে দেখে ছবি আঁকছিলেন। কী মনে করে থামলেন, ছবি আঁকার উঁচু মঞ্চ থেকে নেমে আবার তাতে উঠলেন এবং ব্রাশ হাতে নিয়ে ছবির ফিগারের ওপর আলতো করে দু-একটি আঁচড় বুলিয়ে হুট করে কাজ থামিয়ে দিলেন। এরপর চলে গেলেন।’ লিওনার্দোর অন্যতম মাস্টারপিস দ্য লাস্ট সাপারের কাজ শেষ করতে সময় লাগে তিন বছর। তবে ফ্রেসকৌ টেকনিকের (ভেজা পলেস্তারার উপরিভাগে লাগিয়ে শুকাতে দেয়া রঞ্জক পদার্থ ও ওই রঞ্জক দ্রব্য দিয়ে ছবি আঁকার পদ্ধতির) ভুল ব্যবহারের কারণে কাজের গতিতে ছেদ পড়ে।

কখনো থেমে থেমে, কখনো দীর্ঘ বিরতি দিয়ে মোনালিসা আঁকতে প্রায় ১৬ বছর সময় নিয়েছিলেন তিনি। এমন নয় যে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ আর অধ্যয়নে অপারগ ছিলেন। তবে দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় তার সার্বিক প্রচেষ্টায় বিচ্যুতি ঘটাত। মিলানের ডিউক বিষয়টি জানার পরও লিওনার্দোর সঙ্গে একটি চুক্তি করতে আগ্রহী হলেন। চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার কথাও উল্লেখ করলেন। তবে ২০ বছর ডিউকের সঙ্গে লিওনার্দোর কাজ করার চুক্তির মেয়াদকালের যখন সমাপ্তি ঘটে, তখন দেখা গেল, লিওনার্দো ডিউকের কোনো কাজই শেষ করতে পারেননি। লিওনার্দো স্বয়ং তার ডায়েরিতে এ নিয়ে লিখে গেছেন।

প্রতিভাতাড়িত এ শিল্পীর সর্বগ্রাসী কৌতূহল সম্পর্কে কে না জানে। এ কৌতূহল যেমন তার সৃজনশীলতাকে প্ররোচিত করেছে, তেমনি মনঃসংযোগের বিচ্যুতি ঘটিয়েছে আর কাজ সম্পাদনের প্রক্রিয়াকে করেছে বিভ্রান্ত। তবে লিওনার্দো তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির পরও তিনি কখনো কাজ করা থামাননি। যেমন ফ্রেসকৌ টেকনিক ব্যবহারের অনিহা তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এক পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেয়। তেলরঙের ব্যবহার আর নতুন বার্নিশ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দ্য লাস্ট সাপার চিত্রকর্মটি অল্পের জন্য নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেও ‘দ্য ব্যাটেল অব আনগিয়ারি’ ছবিটির আর শেষ রক্ষা হয় না। পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।

লাস্ট সাপারের কাজ সম্পন্ন প্রসঙ্গে সময়ক্ষেপণের বিষয়টি আগেই উল্লেখ করেছি। কাজটি শেষ করা প্রসঙ্গে লিওনার্দোকে প্রায়ই তাড়া দেয়া হতো। এটি কবে নাগাদ শেষ হবে জানতে চাইলে মিলানের ডিউককে লিওনার্দো বলেছিলেন, তিনি মূলত জেসাস ও জুডাস চরিত্র দুটির জন্য যোগ্য দুজন মডেল খুঁজে পাচ্ছেন না। জুডাসকে খুঁজতে তিনি মিলানের জেলখানা পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়েছেন, কিন্তু তিনি এ লোকের যোগ্য বিশ্বাসঘাতক মডেল চরিত্রের দেখা পাননি। প্রভুর বিশ্বাসহন্তাকে চিত্রিত করতে তিনি কূটকৌশলী একটা চেহারা খুঁজে চলেছেন। লিওনার্দোর এ কথা শুনে ডিউক অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন, আর লিওনার্দোও সময় পেয়ে যান নিজের মতো করে কাজ শেষ করার।

ভ্যাটিকানে লিওনার্দো তিন বছরেরও কম সময় কাটিয়েছেন। তবে সেখানে তিনি তার কাজের তেমন কোনো চিহ্ন রাখতে পারেননি। যেমনটা রাফায়েল বা মিকেলাঞ্জেলো রেখেছেন। ৬৪ বছর বয়সে তাই ফ্রান্সের রাজার কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবে লিওনার্দো এক ধরনের স্বস্তি পেয়েছিলেন। যদিও যাওয়ার সময় নিজের সব কাজের সঙ্গে রেখেছিলেন মোনালিসাকে। কেননা তখনো তার কাছে মোনালিসা একটি অসমাপ্ত চিত্রকর্ম। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোনালিসার ক্যানভাসে তুলির আঁচড় বুলিয়েছেন তিনি। বলা হয়, মৃতুই মোনালিসাকে লিওনার্দো থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

একজন মানুষ তার জীবনজুড়ে যতটা না কল্পনা করতে পারে, লিওনার্দোর অর্জন তার চেয়ে অনেক বেশি। তবে তিনি যদি তার শিল্প, অন্তর্দৃষ্টি আর আবিষ্কার ঘিরে নিজেকে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করতে পারতেন, তাহলে ইতিহাসে তার কাজের প্রভাব কী হতো!

লেখক: রুহিনা ফেরদৌস