অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

জেল খাটা বাঙালি ছেলেটাই অবশেষে নোবেল পেলো

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

এবছর চতুর্থ বাঙালি হিসেবে নোবেল পেয়েছেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বাস্থ্য খাতে দুর্বলতা, শিক্ষায় ঘাটতি এবং দারিদ্র্যসীমা থেকে উত্তরণ না ঘটা, গরিব মানুষ গরিবই থেকে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি সমস্যার সমাধান খুঁজে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী হয়েছেন।সঙ্গে তার স্ত্রীও পেয়েছেন একই বিষয় নোবেল পুরস্কার।১৯৯৮ সালে নোবেল পাওয়া আরেক বাঙালি অমর্ত্য সেন। নোবেল পাওয়া অন্য দুই বাঙালি হলেন সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিতে বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এ পুরস্কারের ঘোষণায় নোবেল কমিটি জানায়, তাঁদের গবেষণা পুরো পৃথিবীকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন হাতিয়ারের সন্ধান দিয়েছে। মাত্র দুই দশকে এই ত্রয়ীর গবেষণাপদ্ধতি উন্নয়ন অর্থনীতির রূপরেখা পাল্টে দিয়েছে। এখন অর্থনীতির গবেষণায় এটি অন্যতম মডেল। বলে রাখা ভালো, এই অর্থনীতিবিদ দম্পতির সঙ্গে নোবেল পাওয়া ৫৪ বছর বয়সী মাইকেল ক্রেমার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তবে অভিজিতের কাজ নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি কথাবার্তা হচ্ছে তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে। রান্নায় পারদর্শিতা, তিহার জেলে ১০ দিন, বিবাহবিচ্ছেদ ও ফরাসি স্ত্রী, বিজেপির সঙ্গে শীতল সম্পর্ক কত কিছুই না আলোচনার বিষয় এখন।

মা-বাবা দুজনেই অর্থনীতির অধ্যাপক। ছেলেও তা-ই। মা নির্মলা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাবা দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়। মা মারাঠি, কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেসের অর্থনীতির অধ্যাপক। বাবা ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক। তবে অভিজিতের জন্ম মুম্বাইয়ে, ১৯৬১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। অভিজিতের শৈশব-কৈশোর কেটেছে কলকাতাতেই। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে লেখাপড়া করেছেন। ১৯৮১ সালে স্নাতক হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

এখন তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক অধ্যাপক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক। এমআইটির শিক্ষকতার পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত অভিজিৎ। বিশ্বের দরিদ্রদের নিয়ে গবেষণা করার জন্য ২০১৩ সালে অভিজিৎ ও এস্থার দুফলো যুগ্মভাবে ‘আবদুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’ গড়ে তুলেছিলেন। ২০০৩ সালে প্রথমে তৈরি হয় ‘পভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’। এর দুই বছর পর এমআইটির এক প্রাক্তন ছাত্র অনুদান দিলেন। ওই ছাত্রের পিতার স্মরণে এর নতুন নাম হলো ‘আবদুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’। সংক্ষেপে বলা হয় জে-প্যাল। সারা বিশ্বের পাঁচটি শহরে তার দপ্তর রয়েছে।

আনন্দবাজার পত্রিকা অভিজিতের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে নতুন এবং মজার কিছু তথ্য দিয়েছে। যেমন একবার চাপে পড়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে, নিউ এম্পায়ার হলে দেখা সেই সিনেমার নাম ছিল স্টার ওয়ারস। সেদিনই কলেজে অর্থনীতির ক্লাস ছিল তাঁর বাবা দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

ছাত্রজীবনে জেলও খেটেছিলেন অভিজিৎ। ১৯৮৩ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতিকে বরখাস্ত করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাড়ি ঘেরাও করেছিলেন। তার জেরে অভিজিৎসহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। উপাচার্যের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ১০ দিন তিহার জেলে ছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জেলে থাকার সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ভর্তিপ্রক্রিয়া বদলানোর দাবিতে আন্দোলন হচ্ছিল। ফি এত বাড়িয়ে দেওয়া হয় যে তা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছাত্র সংসদ এর প্রতিবাদ করায় তৎকালীন ছাত্র সংসদের সভাপতিকে বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তার পরই ছাত্র আন্দোলন আরও তীব্র হয়। সেই আন্দোলন দমন করতেই পুলিশ ঢোকে ক্যাম্পাসে। আমাদের মারতে মারতে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্দেহ নেই, এতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল।’

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরপরই এমআইটিতে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে ভারত নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর মাতৃভাষা বাংলায় দিয়েছেন। একটি প্রশ্ন ছিল, মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের সময় ভারতের অর্থনীতি কেমন চলছে। অভিজিতের জবাব ছিল, ‘আমার মতে, (ভারতের) অর্থনীতির হাল এখন খুব খারাপ। সরকারের রাজকোষে ঘাটতি বিপুল। তবু তারা সকলকে খুশি করার জন্য চেষ্টা করছে। আর তার পরও ভান করছে, বাজেটে ঘোষিত ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা যাবে। আর শুনতে ভালো লাগে বা রাজনৈতিক ফায়দা রয়েছে, এমন প্রকল্প ঘোষণার প্রবণতা ভারতের দীর্ঘদিনের। কিন্তু সরকারের উচিত এমন সব প্রকল্প ঘোষণা করা, যা সত্যি সত্যিই কাজে আসবে, গরিব মানুষের কাজে লাগবে। তাদের হাতে টাকা জোগাবে।’