বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ
বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ

একজন জামাল ভূঁইয়া ও বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ফুটবল

খেলাধুলা ডেস্ক:

মঙ্গলবারের যুব ভারতীয় মাঠে বাংলাদেশ বনাম ভারতের ম্যাচের কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যান। চলুন এক বছর পিছনে চলে যাই। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ কাতার বনাম বাংলাদেশের খেলা হচ্ছে। চলছে অভাবনীয় এক লড়াই। কে ভেবেছিল, কাতারের বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বাংলাদেশ। মূল সময়ের খেলা শেষে খেলা চলছে ইনজুরি টাইমের। বামপ্রান্ত থেকে আক্রমণে উঠছিলেন মাশুক মিয়া জনি। পাস দিলেন
লাল সবুজের অধিনায়ক জামাল ভূইয়াকে। জামালের ডান পায়ের কোনাকুনি শটে বোকা বনে গেলে কাতারের গোলরক্ষক।বাংলাদেশ পেয়ে গেল জয়সূচক একটি গোল।প্রথমবারের মত বাংলাদেশ হারাল কাতারের মত শক্তিশালী ফুটবল দলকে। ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মত এশিয়ান গেমসের নকআউট পর্বে পা রাখল লাল সবুজের জার্সি। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে থাকা বাংলাদেশ ফুটবল দল পেল প্রাণশক্তি। তার পুরো কৃতিত্ব তরুণ তুর্কি মিড ফিল্ডার জামাল ভুইয়ার। যার ছোঁয়ায় বদলে গেছে বাংলাদেশের ফুটবল দল। কোটি মানুষ আবারও স্বপ্ন দেখছে সোনালী অতীতের। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে কে এই জামাল ভুইয়? তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক।

বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ফুটবল

শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন জামাল

সময়টা ষাটের দশক। জামালের বাবা পাড়ি জমান ডেনমার্কে। সেখানের স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার পর বিয়ে করেনে স্থানী একজনকে। সেই সূত্রে জামালের জন্ম ডেনমার্কে।যার পুরো নাম জামাল হারিস ভূঁইয়া। বাবা – মা দুজনেই জামালকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেটার শিরা-উপশিরায় ছিল ফুটবল প্রেম।সেই প্রেম থেকেই জামাল একদিন হয়ে উঠলেন ডেনমার্কের শীর্ষস্থানীয় লিগের প্রতাবশালী খেলোয়ার।বর্তমানে ১৬

জামাল ভূইয়া

কোটি মানুষের দেশের প্রাণভ্রমরা জামালের ইতিহাস এখানে শেষ নয়। আরও আছে। ডেনিশ ক্লাব ব্রন্ডবি আইএফের যুবদলে নিয়মিতই খেলতেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে এফসি কোপেনহেগেনের যুবদলের বিপক্ষে তার করা একটি গোল মুগ্ধ করেছিল এফসি কোপেনহেগেনের কর্তাদের। এরপর যোগ দেন এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। এই দলের মূল দলের হয়েই সিনিয়র ফুটবলে অভিষেক তাঁর।এছাড়াও জামাল খেলেছেন ফিলিপাইনের ক্লাব স্ট্যালিয়ন্সে। ২০১৩ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে পরিচিত মুখ। খেলার পাশাপাশি জামাল একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ডেনমার্কের স্থানীয় একটি হাইস্কুলে ইতিহাস ও ইংরেজি বিষয় ক্লাস নিতেন।

তবে বাংলাদেশের মানুষের ফুটবলের প্রতি এতো ভালোবাসা মুগ্ধ করেছে তাকে। সেই টানেই বাবার জন্মস্থানের জন্য লড়তে এসছেন তিনি। ২০১১ সালে একবার এসেও ফিরে গিয়েছিলেন। খাপ খাওয়াতে পারেননি। তবে ২০১৩ সালের দ্বিতীয়বারের মত এসে সবার মনে জায়গা করে নেন তিনি। পেয়ে যান বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলার টিকিট।সে বছরই বাংলাদেশের তৎকালীন ডাচ কোচ ডি ক্রুইফের হাত ধরেই জাতীয় দলে অভিষেক হয় তাঁর। ২০১৩ সালের ৩১ আগস্ট আসে তার জীবনের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। প্রথমবার নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন জামাল ভূঁইয়া। তিনিই প্রথম বিদেশে জন্ম নেওয়া ক্রীড়াবিদ, যিনি আন্তর্জাতিক খেলার মাঠে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

বাংলাদেশে এসেই রীতিমত ইতিহাস রচনা করতে থাকেন তিনি। শেখ জামালের হয়ে মাঠে নেমে ক্লাব ফুটবলেও জন্ম দেন নতুন ইতিহাস। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ফুটবল টুর্নামেন্টে আইএফএ শিল্ড ২০১৪ এর ফাইনালে শেখ জামালকে তোলার পিছনে ছিল অবদান। যদিও ট্রফি জিততে ব্যর্থ হয়েছিল জামালের দল।ওই বছরই ভুটানে অনুষ্ঠিত কিংস কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় শেখ জামাল। ক্লাবের হয়ে জিতেন প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি। ক্লাবের পাশাপাশি দুর্দান্ত পারফরমেন্স করেছেন জাতীয় দলে। ২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন জামাল।

এবার আসা যাক, মঙ্গলবারের ভারত বাংলাদেশ ম্যাচে।ফলা ফল ১-১ এ ড্রো হলেও এটি ভারতীয় ফুটবল সামরাজ্যে বড় আঘাত। সেটা বোঝা গিয়েছে ম্যাচের বিরতিতে দিল্লি থেকে এক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক মন্তব্য দেখে। তিনি বাদ্য হয়েই বলে উঠলেন, ‘দারুণ খেলছে বাংলাদেশ! বাংলাদেশ আরও ৩-৪ গোলে এগিয়ে থাকতে পারত। দুটো পেনাল্টি…।’ যদিও জিততে জিততে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তবে ৯০ মিনিট জামাল ভূঁইয়ারা যে খেলাটা উপহার দিয়েছেন, এ বাংলাদেশকে মনে রাখতেই হবে ভারতকে।

বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ফুটবল

বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ফুটবল

কারণটা সবারই জানা। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যেমন কৌশলী ফুটবল খেলছে, সত্যিই দুর্দান্ত । ৪২ মিনিটে জামাল ভূঁইয়ার সেট পিসে দুর্দান্ত এক হেডে সাদ উদ্দীন বল জড়িয়ে দেন ভারতের জালে। এ গোলে দর্শকে ঠাসা যুবভারতী স্টেডিয়ামে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। হাজারো নীল জার্সির সমর্থকদের ভিড়ে হাতে গোনা কিছু লাল-সবুজের দর্শকদের চিৎকারই তখন অনেক জোরাল। আহ! এমন একটি দৃশ্য দেখার জন্যই কত বছর অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ। যদিও ৮৮ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও বাংলাদেশকে গোল হজম করতে হয়েছে। মাঠ ছাড়তে হয়েছে ১-১ ড্র নিয়ে। তবে এই ম্যাচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি অনেক। ম্যাচের আগে পরিসংখ্যান-ইতিহাস ভারতের পক্ষে ছিল। ভারতের ১২ জয়ের বিপরীতে বাংলাদেশ জিতেছে ৩টিতে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ৮৩ ধাপ। তবুও ৬০ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে স্বাগতিকদের বিপক্ষে যে লড়াইটা জামাল-সাদরা করেছেন সত্যিই প্রশংসনীয়।