অবান্তর বিজ্ঞাপনে বিরক্ত দর্শক

অবান্তর বিজ্ঞাপনে বিরক্ত দর্শক

বিনোদন, বিশেষ প্রতিবেদন :

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থহীন, অবান্তর ও দূর্বল গল্প নিয়ে নির্মিত হচ্ছে অধিকাংশ টিভি বিজ্ঞাপন। অর্থহীন বিজ্ঞাপনের এমন সয়লাবে যারপর নাই বিরক্ত দর্শক। প্রশ্ন উঠেছে, এসব বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও। 

একটি বিষয়কে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মাঝে মনস্তাত্বিক প্রভাব ফেলে বিজ্ঞাপন চিত্র। বিজ্ঞাপনের অনেক রকম-সকম থাকলেও টিভি বিজ্ঞাপনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এসব বিজ্ঞাপনের নিন্মমান ও অর্থহীন বার্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেছেন সবাই। স্বাভাবিক ভাবেই বিজ্ঞাপন ব্যাতীত নতুন পণ্যের বিত্তান্ত জানা যায় না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রকমারি ও গালভরা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাণ করা হচ্ছে, এমন সংখ্যাও নেহাত কম নয়। নামকাওয়াস্তে কোম্পানীর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর বিজ্ঞাপনেও এসব বিষয় লক্ষ্য করার গেছে। বিশেষ করে এনার্জি ডিংকের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন এমন ভাবে নির্মাণ করা হয়, যার সঙ্গে থাকে না বাস্তবতার মিল। বেশ কিছু কাপড় ধোয়ার গুড়া সাবানের বিজ্ঞাপন প্রচার হয়। সেখানে দেখা যায়, একটি মেয়ে প্রথমবারের মত বেতন পেয়ে মাকে নিয়ে গেছেন ভালো একটি রেস্টুরেন্টে। পরিস্কার কাপড়ের অভাবে সেখানে শুনতে হচ্ছে কটু কথা। কিংবা একটি সরকারি অফিসে একজন মহিলা ঘুষ গ্রহণ করেন না; কারণ তিনি অমুক ব্রান্ডের গুড়া সাবান দিয়ে কাপড় ধুয়ে থাকেন। বাদ দেওয়া যাবে না, হরলিকসের বিজ্ঞাপনের বিষয়টিও। সেখানে বারবার দেখানো হচ্ছে, এটি খেলে সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় টলার, স্ট্রংগ্রার এবং শার্পার হওয়া যাবে। বাস্তবিক অর্থে হরলিকস খেলেই যে একজন বাচ্চা বুদ্ধিমান হবে এমনটি নয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ পত্রপত্রিকায় বেশ কয়েকবার লিখালিখিও হয়েছে। যদিও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

অবান্তর বিজ্ঞাপনে বিরক্ত দর্শক

তবুও রঙচঙ মাখিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা থামছেই না। এ ধরনের অর্থহীন বিজ্ঞাপনের খপ্পরে পড়েছিলেন ভারতের বৈভব বেদী নামের এক যুবক। ঘটনা ২০০৯ সালের। ২৬ বছর বয়সী এ যুবক ভারতীয় একটি আদালতে মামলা টুকে দেন বিখ্যাত ডিওরেন্ট ব্র্যান্ড ‘এক্স’র বিরুদ্ধে। তার অভিযোগ ছিল, বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে এক্স’র যে কোন একটি বডি স্প্রে গায়ে মাখলেই অর্ধনগ্ন নারীরা ছুটে আসেন। কিন্তু তিনি সাত বছর ধরে এই ডিওরেন্ট ব্যবহার করলেও কোন বান্ধবী জুটেনি তার। যদিও বৈভব অভিযোগ দায়ের করে খুব একটা সুবিধা করতে পারে নি। কিন্তু প্রায় দশ বছর পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। ঐ ঘটনার মধ্যদিয়ে একটি বিষয় নিশ্চত হওয়া গেছে, এরকম রংচং ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট একটি গোষ্টি প্রতিনয়ত প্রভাবিত হচ্ছে। সঙ্গে প্রতারিতও। বিজ্ঞাপনের ভুল বার্তা বা মিথ্যা তথ্যের প্রভাবের এমন অসংখ্য দৃস্টান্ত আমাদের চারপাশে রয়েছে৷ এমনকি মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অসংখ্য ভুল বার্তা প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপন থেকে হজম করতে হচ্ছে৷ একটা মেয়েকে ভালো বিয়ে থেকে শুরু করে ভালো চাকরি, সবকিছুর জন্য ফর্সা হতে হবে৷ শ্যামবর্ণের মেয়েদের কপালে চাকরিও নেই; বিজ্ঞাপনের এমন ধারণা চোখ বুজে বিশ্বাস করা সাধারণ মানুষগুলো ছুটছে আয়ুর্বেদিক থেকে শুরু করে টিউবলাইট-লেজারলাইট ফর্মুলাযুক্ত রং ফর্সাকারী ক্রিমের দিকে। বাদ যাচ্ছে না পুরুষরাও। শুধু তাই নয়, স্থূলতা মানেই হাস্যকর, অপমানজনক – নিজের পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে এমন বার্তা দেয়া বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসের ছলে স্বাগত জানাচ্ছি আমরা৷ এর মধ্য দিয়ে দিনকে দিন বর্ণবাদ ও বাহ্যিক রূপকে যোগ্যতার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। পণ্যের গুণাগুণ নিয়ে অতিরঞ্জন তো আছেই, সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে নানাভাবে হেয় করে পণ্য বিক্রির চেষ্টা চলছে৷ একদিকে কোনো আঞ্চলিক ভাষাকে নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে, অন্যদিকে কখনো নারীকে দেখানো হচ্ছে লোভী হিসেবে৷ কারণ বিশেষ ব্র্যান্ডের ফ্রিজ না কিনে না দিলে সংসারই করবেন না তিনি! আবার এত বছরের প্রেমিককে ছেড়ে শুধু পারফিউমের ঘ্রাণে পাগল হয়ে অন্য পুরুষের পেছনে ছুটলেন আরেক নারী৷ বিজ্ঞাপনের এই আইডিয়াটি অবশ্য সারা পৃথিবীতেই বহুল ব্যবহৃত৷
যদিও ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা, ২০১৪’-তে বলা আছে, ‘বিজ্ঞাপনে এমন কোনো বর্ণনা বা দাবি প্রচার করা যাবে না, যাতে শিশু থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সের জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারিত হতে পারে৷ বিজ্ঞাপনে নোংরা ও অশ্লীল শব্দ, উক্তি, সংলাপ, জিঙ্গেল, গালিগালাজ ইত্যাদিও থাকা যাবে না৷ শুধু তাই নয়, দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে এবং সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এমন কোনো বিজ্ঞাপনও প্রচার করা যাবে না৷ পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা বা দৈহিক আকার-বর্ণকে কেন্দ্র করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার নিষেধ।’

অবান্তর বিজ্ঞাপনে বিরক্ত দর্শক

তবুও কোন ভাবেই এসবের দাড়ি টানা যাচ্ছে না। যদিও একটা সময় টিভি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল মানুষের মুখে মুখে উড়ে বেড়াত। অর্থপূর্ণ সেসব বিজ্ঞাপনের গল্প ছিল বাস্তবিক, বুদ্ধিদিপ্ত। এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরনো দিনের বেশ কিছু বিজ্ঞাপনের ভিডিও ঘুরে বেড়ায়। তবে সব বিজ্ঞাপনই যে মানহীন বা অর্থহীন ভাবে নির্মিত হচ্ছে তেমনটি নয়। এর মাঝেও কিছু বিজ্ঞাপন মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। সেসব বিজ্ঞাপনের শিল্পগুণ সবাইকে মুগ্ধ করেছে। তার মধ্যে একটি বিজ্ঞাপনের কথা না বললেই নয়। গত ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে সান কমিউনিকেশনস। ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর রীতিমত ভাইরাল হয়ে পড়ে। এতে দেখা যায় একটি মেয়ে বলছে ‘চুল আরও ছোট করেন, যেন মুঠোয় ধরা না যায়’। এই একটি লাইন দিয়েই পুরো বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হৃদয় বিদারক ছবিটি ফুটিয়ে তুলেছেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা। দুই মিনিটের এই বিজ্ঞাপনটি ভাবিয়েছে ১৬ কোটি বাঙালিকে। এভাবে ভালোমন্দের মিশিলে নির্মিত হচ্ছে বিজ্ঞাপন। হওয়ার কথাও তাই। তবে সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় আনলে এখনকার বিজ্ঞাপনগুলোতে থাকে ভাড়ামো। অধিকাংশ বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু বুঝে আসেনা কারো। তাই বিজ্ঞাপন শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে একটি বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠেছে।বিজ্ঞাপন নিয়ে এমন আলোচনা চলতেই থাকবে। তবে শেষ করা যাক, আধুনিক বিজ্ঞাপনের জনক টমাস জে ব্যারেটর একটি উক্তি দিয়ে। তিনি বলেছেন ‘রুচি পালটায়, ফ্যাশন পালটায়, আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের এর সঙ্গে তাল মিলিয়েই পালটাতে হবে৷ এমনটা নয় যে প্রতিবারই নতুন আইডিয়া পুরনো আইডিয়ার চেয়ে ভালো হবে৷ কিন্তু তা অবশ্যই পুরনোটার চেয়ে ভিন্ন এবং তা বর্তমান রুচির সঙ্গে মিলবে৷’