ভারতীয় নায়িকাদের দাপটে কোণঠাসা দেশীয় নায়িকারা

বিনোদন রিপোর্ট

দেশীয় চলচ্চিত্রে ‘নায়িকা সংকট’র জুজু এখন আর নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি অনুমেয়। প্রতিবছরই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নায়িকা। এ বছরের মাঝামাঝি সময়েও সুপারস্টার শাকিব খানের বিপরীতে যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। তবুও চলচ্চিত্র পাড়ায় কানকথা, কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন দেশীয় নায়িকারা। কারণ, দেশীয় পরিচালক ও প্রযোজকদের বিদেশী নায়িকাপ্রিতি। সহজ করে বলতে গেলে, ভারতীয় নায়িকাদের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য করতে চাইছেন তারা। এতে বড় বড় প্রজেক্ট হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেশীয় নায়িকাদের। এমনিতেই সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে যাও নির্মাণ হচ্ছে; তার বেশিরভাগ সিনেমাতেই দেখা যাচ্ছে বিদেশিদের দৌরাত্ব।
আগে থেকেই কলকাতার তারকারা এপার বাংলায় এসে কাজ করেন। ঢাকার অনেক তারকাও কলকাতায় গিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রকট হয়েছে ভারতীয় সিনেমার একতরফা প্রভাব। সাফটা চুক্তির আওতায় সুবিধার নাম করে আনা হচ্ছে ভারতীয় সিনেমা, তেমনি বেড়েছে ভারতীয় নায়িকা আমদানির হিড়িক।
খোজ নিয়ে দেখা গেছে, দেশীয় প্রযোজক ও পরিচালকরা নিত্যই কলকাতার নায়িকাদের খোঁজ করেন। জানতে চান অমুক নায়িকার পারিশ্রমিক কতো? অমুক নায়িকা সিনেমার প্রতি কতোটা আন্তরিক? অমুক নায়িকা বাংলাদেশি সিনেমা করতে আগ্রহী কী না? আর এসব প্রযোজকদের আগ্রহের তালিকায় এগিয়ে রয়েছে কলকাতার শ্রাবন্তী ও শ্রভশ্রী। এরপর নুসরাত জাহান, মিমি চক্রবর্তী, পাওলি দাম, প্রিয়াঙ্কা সরকার থাকে তাদের পছন্দের তালিকায়।
কিছু বিশেষ চরিত্রের জন্য অনেকেই স্বস্তিকা মুখার্জি, শ্রীলেখা মিত্রকেও চান। এরই মধ্যে পারভেজ আমিন নামে এক পরিচালক ঘোষণা দিয়েছেন স্বস্তিকাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের।
এর ফলে বেকায়দায় রয়েছে দেশীয় নায়িকারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে, দেশীয় নায়িকারা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। কারণ, আজকাল দশটা সিনেমার নাম ঘোষণা হলে সেখানে সাতটি ছবির প্রধান চরিত্রেই থাকেন কলকাতার নায়িকারা। যেখানে বিভিন্ন প্রজন্মের পপি, পূর্ণিমা, অপু বিশ্বাস, মাহি, মিম, পরীমনি, নুসরাত ফারিয়া, আঁচল, তমা মির্জা, আইরিন, ববি, পূজার মতো নায়িকারা রয়েছেন। সেখানে প্রযোজকদের এতো কলকাতাপ্রিতি কেন?
এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেশ কয়েক জন প্রযোজক ও পরিচালকদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্যমতে, ‘দেশীয় নায়িকাদের ব্যার্থতার কারণেই বাধ্য হয়ে বিদেশীদের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এছাড়াও বেশকিছু কারণে দেশের নায়িকাদের এড়িয়ে চলেন তারা। তার অন্যতম কারণ, সিনেমার প্রতি দেশি নায়িকাদের আন্তরিকতার অভাব।’
প্রযোজক ও পরিচালকরা আরো বলেন, ‘এখানকার নায়িকারা বেকার বসে থাকবেন কিন্তু কোনো কম্প্রোমাইজ করে কাজ করবেন না। সেটা যতোই ভালো চরিত্র হোক। ভালো গল্প ও চরিত্রের জন্য এক পয়সা স্যাক্রিফাইস করতে রাজি হন না কেউ। সঙ্গে আকাশছোয়া পারিশ্রমিক তো আছেই। অনেকে চুক্তি করে অগ্রিম টাকা নিয়েও শিডিউল ফাঁসান। অনেক নায়িকা আছেন যারা শুটিংয়ে ঠিক টাইমে সেটে আসেন না। এভাবে কাজ করাটা অনেক কঠিন। কিন্তু কলকাতার নায়িকারা বেশ কাজের। পারিশ্রমিকটাও কম লাগে। দেশের জনপ্রিয় নায়িকারা যে পারিশ্রমিক পান সে টাকার ২০-৩০ ভাগ কম দিয়ে কলকাতার শ্রবন্তীকে পাওয়া যায়।’
তবে সত্যিই কি ঢাকাই সিনেমায় এমন কোন নায়িকা নেই, যার সিনেমার প্রতি ভালোবাসা ও কম্প্রোমাইজ করা মানসিকতা রয়েছে। নাকি নির্মাতারা তাদের মেধার দৈন্যতার বিষয়টি ঢাকতেই নায়িকাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন? বাস্তবতা হচ্ছে, এ মুহূর্তে আনাড়ি নায়িকার পাশাপশি প্রতিষ্ঠিত ও দক্ষ নায়িকাও রয়েছে। যারা একসময় পর্দা কাঁপিয়েছেন। এখনও তারা ফুরিয়ে যাননি। শুধু সময় উপযোগী করে তাদের উপস্থাপন করাটা জরুরি। সেজন্য দরকার মেধাবী নির্মাতা ও শিল্পবান্ধব প্রযোজক।
বর্তমানে ঢাকাই সিনেমার এমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার দৃশ্যটি একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের তৈরি। গত কয়েক বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে পতনের ধ্বনি ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। হিংসা, বিদ্বেষ, নিষিদ্ধকরণ, অন্ধকার রাজনীতি- সবকিছুই কেউ না কেউ প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সমস্যা সমস্যার জায়গায়ই রয়ে গেছে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশীয় সিনেমার সৌন্দর্য্য, নায়িকারা। হাতেগোনা কয়েকজন বাদে, বেশীরভাগ নায়িকাদের হাতে নেই নতুন সিনেমার কাজ। চলচ্চিত্রে কাজ না পেয়ে অনেক নায়িকারা হাটছেন বিকল্প পথে। কেউ যুক্ত হচ্ছেন কর্পোরেট জগতে বা ছোট পর্দায়। কিন্তু এভাবে আর কত দিন?