চশমা পরা হনুমানের অজানা যত কথা

দূর থেকে দেখলে মনে হবে বানর সাহেব চশমা পরে বসে আছেন। কাছে গেলে স্পষ্ট হবে চোখের চারপাশে সাদা লোম চশমার আকার নিয়েছে। এ জন্যই নাম তার চশমা পরা হনুমান (Spectacles’ Langur, Phayre’s Langur বা Phayre’s Leaf Monkey)। Cercopithecidae গোত্রভুক্ত এই প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম trachypithecus phayrei।

চশমা পরা হনুমান আকারে অনেক ছোট হলেও এদের শরীরের তুলনায় লেজ অনেক লম্বা। মাথা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত এরা ৫৫-৬৫ সেন্টিমিটার হলেও লেজের দৈর্ঘ্য ৬৫-৮০ সেন্টিমিটার। পুরুষ হনুমান ওজনে ৭ থেকে ৯ ও স্ত্রীগুলো ৫ থেকে সাড়ে ৭ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। কালচে বাদামি শরীরে বুকের দিকটা সাদা। নবজাতকের পুরো দেহের লোম কমলা, যা মাস খানেক পরই ধূসর হতে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক চশমা পরা হনুমানের মাথার বড় বড় লোম দেখে মনে হবে পরচুলা পরে বসে বা ঝুলে আছে। অন্য হনুমানগুলোর তুলনায় এরা অনেকটা লাজুক প্রকৃতির। দিনের বেলায় ঘন বনের ছায়াযুক্ত স্থানে এদের বিচরণ। ঘুম, চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, খেলাধুলা, গা চুলকানো, বিশ্রাম সবকিছু এরা গাছেই সম্পন্ন করে। সহজে এদের পা মাটিতে পড়ে না। দল বেঁধে চলাফেরা করলেও সহসা চশমা পরা হনুমানের দেখা পাওয়া যায় না। একজন শক্তিশালী পুরুষের নেতৃত্বে দলে বাচ্চাসহ ১০-১২টি হনুমান থাকে।

চশমা পরা হনুমানের অজানা যত কথা

চশমা পরা হনুমান গাছের ডালে ডালে ঘুরে পাতা, পাতার বোঁটা, ফুল, ফল ও কুঁড়ি খায়। উদ্ভিদের পরাগায়ন ও বংশবৃদ্ধিতে এদের বেশ ভূমিকা রয়েছে। মা হনুমান তার বাচ্চাকে বুকে নিয়ে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে পড়ে। পাতা ও গাছে জমে থাকা পানি ও শিশির পান করে এরা তৃষ্ণা মেটায়। ‘চেং কং’ শব্দ করে ডাকা চশমা পরা হনুমান অন্যকে ভয় দেখাতে মুখে ভেংচিও কাটে!

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এদের প্রজননকাল। স্ত্রী হনুমান ১৫০-২০০ দিন গর্ভধারণ শেষে একটিমাত্র বাচ্চা প্রসব করে। গড়ে প্রতি দুবছরে এরা একবার বাচ্চার জন্ম দিয়ে থাকে। চশমা পরা হনুমান প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

বাংলাদেশের কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, পাবলাখালি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে চশমা পরা হুনুমানের দেখা পাওয়া গেলেও এরা এখন মহাবিপন্ন প্রাণী। অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অচিরেই এই প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর তা হবে আমাদের জীববৈচিত্র্য সম্পদভাণ্ডারে অপুরণীয় ক্ষতি। প্রকৃতির ভারসাম্য হবে বিনষ্ট।

চশমা পরা হুনুমানদের টিকিয়ে রাখতে বন উজাড় ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ করতে হবে। নিশ্চিৎ করতে হবে বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আবাসস্থল। পর্যটন শিল্পকে পরিচালনা করতে হবে প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর যেকোন অবকাঠামো নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই বিলুপ্তি থেকে বাংলাদেশে রক্ষা পাবে চশমা পরা হনুমান।