হায়া সোফিয়া
হায়া সোফিয়া, ছবি : ইন্টারনেট

হায়া সোফিয়া : তুরস্কের গোয়ার্তুমি নাকি ইসলামের বিজয়

আর. রহমান: তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহর ইস্তাম্বুুলে অবস্থিত এক বিখ্যাত স্থাপনা হায়া সোফিয়া। প্রায় এক হাজার বছর হায়া সোফিয়া ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গীর্জা। এরপর ভবনটি ৫’শ বছর মসজিদ হিসাবেও ব্যবহার হয়েছে। দেড় হাজার বছর পুরনো এই ভবনে আছে বহু ঐতিহাসিক নির্দশন। সে কারণে একে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এটি জাদুঘর হিসাবে সংরক্ষিত ছিল।

সম্প্রতি হায়া সোফিয়া জাদুঘরকে মসজিদ বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তুরস্কের একটি আদালত হায়া সোফিয়ার জাদুঘরের মর্যাদা রদ করে রায় দেওয়ার পর এরদোয়ান এটিকে মসজিদে রূপান্তরের ঘোষণা দেন।অনেক দিন ধরেই তুরস্কের ইসলামপন্থীরা এই জাদুঘরকে মসজিদে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। তবে ধর্মনিরপেক্ষরা এর বিরোধিতা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা বিশ্ব এর বিরোধা করলেও তুরস্ক সেসব তোয়াক্কা করেনি।

হায়া সোফিয়া একাধিক ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। এর অন্যান্য নামগুলো হলো, হাজিয়া সোফিয়া, আয়া সোফিয়া, সাঙ্কটা সোফিয়া ও মেগালে একসেলিয়া ইত্যাদি।

বর্তমানে হায়া সোফিয়া যেখানে অবস্থতি, এই জায়গাটি ছিল রোমান প্যাগান ধর্মের উপাসানালয়। ৩৫০ সালে প্রথম রোমান কনস্টাটিন এখানে একটি মন্দর প্রতিষ্ঠা করেন। তার পুত্র দ্বিতীয় কনস্টাটিয়াস ৩৬০ সে সেই মন্দিরকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ৪০৪ সালে এক দাঙ্গায় আগুন লেগে তখনকার কাঠের মন্দিরটি পুড়ে যায়। সেই ধ্বংসস্তুপে রোমান সম্রাট প্রথম কনস্টান্ট আরও বড় করে আরেকটি কাঠের মন্দির তৈরি করেন। ৪১৫ সালে দ্বিতীয় থিয়োসিয়াস সেই মন্দিরের উদ্বোধন করেন। ৪৩২ সালের আরেকটি দাঙ্গার আগুনে সেই ভবনটিও সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। তখন সম্রাট জাস্টিনিয়ান এখানে ঝমকালো প্রাসাদময় উপাসনালয় গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় এই শহরের নাম ছিল কন্সটাটিনোপোল। এটি ছিল মধ্যযুগের রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী। পরবর্তীতে উসমানীয় সাম্রাজের প্রতিষ্ঠার পর এই স্থানের নাম রাখা হয় ইস্তাম্বুল। স্থানটি নতুন শাষকদেরও রাজধানী হিসাবে গৃহিত হয়। উভয় রাজধানীর ক্ষেত্রেই অন্যতম প্রতীক বা প্রাণকেন্দ্র ছিল হায়া সোফিয়া।

হায়া সোফিয়ার নকশা

হায়া সোফিয়ার নকশা, ছবি : ইন্টারনেট

সম্রাট দ্বিতীয় মেহমেদ কনস্টাটিনো শহর দখলে নেওয়ার পর প্রথমেই হায়া সোফিয়াতে প্রবেশ করেছিলেন। এবং তিনিই প্রথম ভবনটিকে মসজিদে পরিণত করার ঘোসনা দেন। হায়া সোফিয়া শুধু মসজিদ থেকে গীর্জাই নয়, ভবনটি গীর্জা থাকাকালীন ও একাধিকবার এর ধরন বদলেছে। ৫৭০ সালে হায়া সোফিয়া নির্মাণ করা হয়েছিল অর্থডক্স গীর্জা হিসাবে।

এর ৬৬৭ বছর পর ১২০৪ সালে হায়া সোফিয়াকে রোমান ক্যাথলিক গীর্জায় রুপান্তর করা হয়। এরমাত্র ৫৭ বছর পর ১২৬১ সালে হায়া সোফিয়া আবারও অর্থডক্স গীর্জায় পরিণত হয়। সে যাত্রায় প্রায় দু’শ বছর গীর্জা হিসাবে ব্যহৃত হয়ে ১৪৫৩ সালে তুর্কি সালতানাতের অধীনে হায়া সোফিয়া মসজিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৫’শ বছর মসজিদ হিসাবে ব্যবহারের পর ১৯৩৫ সালে ঐতিহাসিক এই ভবনকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়।

আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল পাশা সেই সময় একটি আইন পাশ করেছিলেন। আইনটি হলো মুসলিম ও খ্রীস্টান উভয় ধর্মাবলম্বীদের জন্য হায়া সোফিয়া – এর হলরুম ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ থাকবে। তবে দীর্ঘদিনের মুসলিম দাবির মুখে সম্প্রতি এরদোয়ান এটিকে আবারও মসজিদ হিসাবে ঘোষণা করেছেন।

আরও পড়ুন- দি সিটি অব আটলান্টিস : হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার আদ্যোপান্ত
হায়া সোফিয়ার অন্দরমহল

হায়া সোফিয়ার অন্দরমহল, ছবি : ইন্টারনেট

এক সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ান বলেন, ২৪ জুলাই মসজিদের ভেতর মুসলিমরা নামাজ আদায় করবেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অন্য সব মসজিদের মতো স্থানীয় ও বিদেশ থেকে আগত মুসলিম ও অমুসলিমদের জন্য হায়া সোফিয়ার দরজা খোলা থাকবে।’

যদিও হায়া সোফিয়াকে জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তর করা নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই একে সাদুবাদ জানালেও একটি মহল বাজে দৃষ্টান্ত বলে অবহিত করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখছে, এটি কোন যুগান্তরী সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এখানে ইসলাম নয়, জিতেছে মৌলবাদ।

এদিকে পশ্চিমা বিশ্ব একে তুরস্কের গোয়ার্তুমি বলে চালিয়ে দেওয়াও চেষ্টা করছে। তাদের দাবী তুরস্কে মসজিদের কোন অভাব ছিল না। আর হায়া সোফিয়া ছিল মুসলীম ও খ্রিস্টান উভয় ধর্মের নির্দশন। যা ছিল সম্প্রীতির সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।