হঠাৎ গ্রেপ্তারে নাগরিকের করণীয়

 মো. মাহবুবুর রহমান

সাধারণত কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে তবেই পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে। একে আইনের ভাষায় ‘ওয়ারেন্ট’ বলে। তবে গ্রেপ্তারে পূর্বে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কারণ দর্শাতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে একজন ধৃত ব্যক্তিকে এ অধিকার দেয়া হয়েছে। সুতরাং গ্রেপ্তারের সময় ধৃত বক্তির এ অধিকার আছে যে, কোন কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং তার গ্রেপ্তারের জন্য কোনো ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে কিনা।

তবে বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে একজন পুলিশ অফিসার গ্রেপ্তারাদেশ বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার ১ নং উপধারা মতে, একজন পুলিশ অফিসার ম্যাজিস্ট্রেটের ওয়ারেন্ট ছাড়াই কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। যেমন- ১. যে অপরাধে অভিযুক্ত হলে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করার অধিকার কার্যবিধিতে দেয়া আছে, ২. যার কাছে ঘর ভাঙার যন্ত্র আছে, ৩. সেই ব্যক্তি যাকে ‘ঘোষিত অপরাধী’ বলা হয়। এদের ধরার জন্য সংবাদপত্র বা গেজেটে ঘোষণা দেয়া হয়, ৪. যে ব্যক্তির কাছে চোরাইমাল আছে বলে সন্দেহ করা হয়, ৫. পুলিশকে যারা তাদের কাজে বাধা দেয় বা পুলিশের হেফাজত থেকে যারা পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে, ৬. যারা প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে পলাতক, ৭. বাংলাদেশের বাইরে যারা অপরাধ করে, তাদের যদি বাংলাদেশে পাওয়া যায়, ৮. গুরুতর অপরাধে দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা খালাস পাওয়ার পরও তাদের যেসব নিয়ম মেনে চলতে হয়, সেগুলো যারা ভঙ্গ করে, ৯. যেসব আসামিকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তারের জন্য অন্য থানা থেকে অনুরোধ করা হয়।

প্রশ্ন থেকে যায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া ধৃত অপরাধীকে পুলিশ কতদিন আটক রাখতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারায় গ্রেপ্তার ও ধৃত ব্যক্তির জন্য রক্ষাকবচ প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। অপরদিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পুলিশ অফিসার যদি কাউকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করে, তাহলে ২৪ ঘণ্টার বেশি নিজের হেফাজতে রাখতে পারবে না। ২৪ ঘণ্টার আগেই ধৃত ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করতে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি জামিনের অযোগ্য ও আমলযোগ্য যেমন খুন বা গুরুতর অপরাধ করে, তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯(১) ধারা অনুসারে, যেকোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যক্তিবর্গ ওই অপরাধী ব্যক্তিকে বা অপরাধী বলে ঘোষিত কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। এক্ষেত্রে আবশ্যিক দেরি না করে তাকে পুলিশ অফিসারের কাছে অর্পণ করতে হবে অথবা পুলিশ অফিসার না থাকলে তাকে থানা হেফাজতে দিতে হবে।

গ্রেপ্তারের পর ধৃত ব্যক্তির অধিকার ও করণীয় : ওয়ারেন্টমূলে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে, তাহলে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্রেরণের পর কোর্ট হাজত থেকে ওকালতনামা সংগ্রহপূর্বক আইনজীবী নিযুক্ত করে জামিনে আনার জন্য দরখাস্ত দাখিল করতে হবে বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে মুচলেকাসহ বা মুচলেকা ছাড়া জামিনে আনার জন্য দরখাস্ত দাখিল করতে হবে।

আটকের পর পুলিশ বা কর্তৃপক্ষ অবশ্যই তার আটকের কারণ জানাবে এবং আইনজীবীর সাহায্য নেয়ার জন্য যথাযথ সুযোগ প্রদান করবে। কোনো ব্যক্তি যদি জামিনযোগ্য অপরাধের জন্য আটক হন, তাহলে পুলিশ অফিসার বা ম্যাজিস্ট্রেটকে মুচলেকা বা জামিনদারের মাধ্যমে ধৃত ব্যক্তি তার অধিকার হিসেবে জামিনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

কোনো ব্যক্তি আটক হওয়ার পর যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির না করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তির দায়িত্ব হলো, পরবর্তীতে আদালতে হাজির করার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি অবহিত করা অথবা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দরখাস্তের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। পাশাপাশি বেআইনিভাবে আটক রাখার কারণে ওই ব্যক্তি যে মানসিক, শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন, তার জন্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করা।

পুলিশ প্রহরায় আটকাবস্থায় যদি পুলিশ স্বীকারোক্তি নেয়ার জন্য বা অন্য কোনো কারণে কোনো ব্যক্তিকে আঘাত বা নির্যাতন করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আদালতের মাধ্যমে থানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির অধীনে আশ্রয় নিতে পারেন। পাশাপাশি দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা দায়ের করতে পারেন।

মনে রাখতে হবে, থানায় বা পুলিশি হেফাজতে আপনাকে অত্যাচার করে পুলিশ কর্তৃপক্ষ কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে না। আর তাদের কাছে প্রদত্ত কোনো স্বীকারোক্তি সাক্ষ্য প্রদানের ২৫ ধারা অনুসারে আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্যও নয়। আর যদি জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়, তাহলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি।

যত নিকটতম বন্ধু বা আত্মীয়ই হোক না কেন, মনে রাখতে হবে, গ্রেপ্তারের পর থানা বা অন্য কোথাও কাউকে বিশ্বাস করে কখনই কোনো সাদা কাগজে দস্তখত করা যাবে না। পুলিশ যদি আটক রাখার পর তারিখবিহীন সাদা কাগজে সই করতে বলে, তবে ধরে নিতে হবে, তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে। তাই যত অত্যাচারই করুক না কেন, সাদা কাগজে সই করা যাবে না। আর চাপে পড়ে বা নির্যাতনের স্বীকার হয়ে যদি তা করা হয়, তাহলে যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কাগজটি উদ্ধারের জন্য শরণাপন্ন হতে হবে।

ইতোমধ্যে আমাদের দেশে বেশকিছু গুমের ঘটনা ঘটেছে। কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বা কর্তৃপক্ষ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই ব্যক্তিকে আদালতে হাজির না করে বা গোপনভাবে আটক রাখে, তাহলে পরিবারের সদস্যদের করণীয় হলো হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হেবিয়াস করপাস রিট দায়ের করা। এর সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন করে বিষয়টি মিডিয়ায় প্রকাশ করা যেতে পারে। রিট জারির পর আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ধৃত ব্যক্তিকে দ্রুত হাজির করার ব্যাপারে আদেশ দেবেন।

মূলত আমাদের দেশে বহু ভালো আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগের অভাবে পুলিশি নির্যাতন, হঠাৎ গ্রেপ্তার, গ্রেপ্তার-পরবর্তী বিড়ম্বনা বেড়ে গেছে। আর সাধারণ মানুষের আইনসম্পর্কিত ধারণা কম থাকায় তা আরো আগুনে ঘি ঢালার মতো হয়েছে। তাই সবাই যদি তার অধিকার ও করণীয় সম্পর্কে সজাগ থাকেন, তাহলেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজটি সহজ হবে।