সেন্টিনাল দ্বীপ : বঙ্গোপসাগরের নিষিদ্ধ ও রহস্যময় জায়গা

সেন্টিনাল দ্বীপ : বঙ্গোপসাগরের নিষিদ্ধ ও রহস্যময় জায়গা

আর. রহমান
আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে পুরো পৃথিবী মানুষের হাতে মুঠোয়। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল থেকে আমাজানের এল ডোরাডোর, সব রহস্যই কৌতূহলী মানুষ ভেঁদ করেছে। এরপরও এমন কিছু জায়গা, ঘটনা বা রহস্য আছে যা আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও জয় করা যায়নি। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত সেন্টিনাল দ্বীপ এমনই এক জায়গা। ভারতীয় উপমহাদেশে এটি নিষিদ্ধ দ্বীপ নামেও পরিচিত।

ভারত সরকার বারবার ব্যর্থ হয়েছে
সেন্টিনাল দ্বীপের অবস্থান বঙ্গোপসাগরে হলেও, দ্বীপটি কাগজে কলমে ভারতের অন্তর্ভুক্ত। ভারত সরকারের পক্ষ েেক বহুবার চেষ্টা করা হলেও দ্বীপটির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আজ অবদি দ্বীপটি সর্ম্পকে ভারত সরকার কেমন কিছু জানতে ও জানাতে পারেনি বলে সেন্টিনাল দ্বীপ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রহস্য ও কল্পকাহিনী। তবে ভারতীয় সরকারের এমন র্ব্যতার অন্যতম কারণ, এই দ্বীপের বাসিন্দারা বাইরের পৃথিবীর মানুষকে স্বাগত জানায় না। তারা এতোটাই হিংস্র যে, কোন নৌকা বা হেলিকপ্টার দ্বীপটির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেই তীর বল্লম ছুড়ে মারে।

ব্রিটিশরাও সুবিধা করতে পারেনি
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশদের নজর পড়েছিল এই দ্বীপটির উপর। ১৮৮০ সালে সেন্টিনাল দ্বীপটিকে দখল করার ফঁিন্দ আটে ব্রিটিশ শাষকরা। কৌশল হিসাবে ব্রিটিশরা এই দ্বীপের কিছু মানুষকে অপহরণ করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, অপহরণ করা অধিবাসীদের ভালো খাবার দিয়ে আপ্পায়ন করে তাদের মন জয় করা। এরপর সুযোগ বুঝে দ্বীপটি নিজেদের করে নেওয়া। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়ার সে চেষ্টা রহস্যজনক ভাবে ব্যর্থ হয়। অপহরণ করার পরপরই দ্বীপের অধিবাসীরা খুব দ্রুত মারা যায়। এর কারণ হিসাবে ধারণা করা হয় তাদের দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা। দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক মানুষের সঙ্গে বসবাস করা থেকে বিরত থাকায় তাদের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল একদমই কম। এতোই কম যে, সর্দি কাশির মত সামান্য অসুখেও তারা মারা যেতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনা, ব্রিটিশরা দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা থেকে পিছু হটে ভারতীয় মূল ভূখন্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে অধরা রয়ে যায় সেন্টিনাল দ্বীপ রহস্য।

সেন্টিনাল দ্বীপ : বঙ্গোপসাগরের নিষিদ্ধ ও রহস্যময় জায়গা

অসম্পূর্ণ কিছু তথ্য
২০০১ সালে ভারতের ট্রাইবাল ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক টিএন পন্ডিতের নেতৃত্বে দ্বীপের অধিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রাথমিক ভাবে দ্বীপটির তীরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপহার রেখে আসা হত। যেমন , খাবার, পোশাক ইত্যাদি। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। তবে বিভিন্ন ভাবে এই দ্বীপ সর্ম্পকে কিছু তথ্য বাইরের মানুষের কাছে আছে। এরমধ্যে অন্যতম ভাষা ও হিংস্রতা। ধারণা করা হয় দ্বীপ অধিবাসীরা আন্দামানিক ভাষার কাছাকাছি এক ধরনে ভাষা ব্যবহার করেন। জাতিগত ভাবে তারা শিকারী জনগোষ্ঠী।

সেন্টিনাল দ্বীপ : বঙ্গোপসাগরের নিষিদ্ধ ও রহস্যময় জায়গা

নিষিদ্ধ হলো যেভাবে
ধারণা করা হয় ৬০ বর্গ কিলোমিটারের এই দ্বীপটিতে চারশ থেকে পাঁচশ মানুষের বাস। সেন্টিনাল দ্বীপের মানুষ কৃষি কাজ করতে পারে না। এমনকি তারা আগুনও জ্বালাতে জানে না। ২০০৪ সালে সুনামিতে দ্বীপটিতে ব্যপক ক্ষতি হয়। সেন্টিনালের অধিবাসীরা বেঁচে আছে কিনা দেখার জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি হেলিকপ্টার পাঠানো হলে দ্বীপের লোকজন হেলিকপ্টারের দিকে তীর ছুড়ে জানান দেয়, সুনামির ক্ষয় ক্ষতির পরেও তারা অক্ষত আছে। এরপর ২০০৬ সালে আন্দামান দ্বীপের দুই জেলে এই দ্বীপের কাছে মাছ ধরতে যায়। অত্যধিক মদ পানের ফলে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। এবং রাতের বেলায় তারা সমুদ্র স্রোতে ভেসে সেন্টিনাল দ্বীপে চলে যায়। এরপর দ্বীপের অধিবাসীরা দুই জেলেকে নৃশংষ ভাবে হত্যা করে। ভারতীয় কোস্ট গার্ড লাশ উদ্ধার করতে গেলে, তারা কোস্ট গার্ডের হেলিকপ্টার লক্ষ করে তীর ছুড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত লাশ উদ্ধার না করেই তারা ফিরে আসতে বাধ্য হয়। পরে ভারত সরকার এই দ্বীপের অধিবাসীদের বাইরের জগতের প্রভাব মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে এই দ্বীপের তিন কিলোমিটারের কাছাকাছি যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়।