সিনেমা পোস্টারের হাওয়া বদল
সিনেমা পোস্টারের হাওয়া বদল

সিনেমা পোস্টার: সময়ের দৌড়ে রূপ হারিয়েছে যে শিল্প

রায়হান রহমান: কথায় আছে- আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী। সিনেদুনিয়ায় এই লোককথার প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি। তাই দীর্ঘকাল পোস্টারের শিল্পশৈলী দেখে সিনেমা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতেন দর্শকরা। সিনেমা সংশ্লিষ্টরাও প্রথম দর্শনে দর্শকের মন পেতে পোস্টারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতেন। এখন আর সে চিত্রটি নেই। সময়ের হাওয়ায় গা ভাসিয়ে সিনে পোস্টারে এসেছে আমূল পরিবর্তন। পাল্টে গেছে এর রকম-সকম ও আকার আয়তন।

একটা সময় দর্শক আকর্ষণে বিচিত্র সব কম্পোজিশনে আঁকা হতো সিনেমার ব্যানার। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য পোস্টারে প্রাধান্য দেওয়া হতো গোলাপি, হলুদ, উজ্জ্বল নীল ও উজ্জ্বল সবুজ রং। প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহের সামনেই সেগুলো ঝুলিয়ে রাখা হতো। এতে শিল্পী তার শৈল্পিক জাদুতে ফুটিয়ে তুলতেন সিনেমার পুরো আবহ। নির্দিষ্ট চলচ্চিত্রের ফটো ইমেজ দেখেই আঁকতেন তারা। বেশির ভাগ ছবির পোস্টারে দেখা যেত, হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভিলেন। তার ঠিক সামনেই রিভলবারের ট্রিগার চেপে ধরে আছেন তেজি নায়ক। নায়কের দুই পাশে রয়েছেন দুই নায়িকা। একজন লাস্যময়ী ভঙ্গিমায়, অন্যজন কুড়াল হাতে রণমূর্তি হয়ে। বিশেষ করে কাইয়ুম চৌধুরীর ‘মিলন’ ও ‘ইন্ধন’, আবদুল সবরের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ও ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী, নিতুন কুন্ডুর ‘তানহা’ এবং সুভাষ দত্তের আঁকা বাংলাদেশের প্রথম ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর নান্দনিক পোস্টার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

উচ্চকিত রঙের সঙ্গে অনবদ্য লেটারিং আর জোরালো রেখার টানে এসব সিনে ব্যানার পেইন্টিং এখন আর নেই। ডিজিটাল ব্যানারের বদৌলতে হারিয়ে গেছে হাতে আঁকা সিনেমার পোস্টার। স্বাধীনতার পর থেকেই ব্যাপকভাবে সিনেমার পোস্টার ছাপা হতে থাকে। যদিও সে সময় পোস্টারগুলো ছাপা হতো এক রঙের। পরে সত্তরের দশকের শেষার্ধে প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ছাপারও উন্নয়ন ঘটে। গ্রাফিক্স ডিজাইনের নতুন সম্ভাবনা দেখা দেয়। সত্তরের দশকের শেষ দিকে রঙিন পোস্টার ছাপা হতে থাকে। সিনেমার পোস্টারে আমূল পরিবর্তন ঘটে ২০০৬ সালে। আবুল কালাম আজাদ নামের এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে দেশে প্রথম ডিজিটাল প্রিন্টের আবির্ভাব ঘটে। ব্যস, সেই থেকেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে ডিজিটাল দুনিয়ায়। এরপরও দু’একটি পোস্টার হাতে আঁকা হলেও ২০১০ সালের পর দেশীয় কোনো সিনেমার পোস্টার আর আঁকা হয়নি।

কথায় আছে- আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী

কথায় আছে- আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী

সস্তামূল্যে অধিক পোস্টার পাওয়ার সুযোগ ও চলচ্চিত্রের বাজেট ঘাটতি থাকায় প্রযোজকরাও ডিজিটালে ঝুঁকেছেন। তা ছাড়া দ্রম্নত সময়ের মধ্যেই কয়েক হাজার পোস্টার পাওয়া যায় বলে অনেকেই এটিকে প্রাধান্য দেন। অতি সাম্প্রতিক সময়ে মোশন পোস্টার বা অ্যানিমেশন করা সিনেমার পোস্টার অবমুক্ত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার পাশাপাশি পোস্টারেও আধুনিকতার ছোয়া আসবে, এটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন দেশীয় চলচ্চিত্রের বেশির ভাগ নির্মাতারা। তাদের মতে, এখন অনলাইনের যুগ। দর্শকরা হতে আঁকা পোস্টারের চেয়ে মোশন পোস্টার বা ডিজিটাল পোস্টার দেখতে বেশি পছন্দ করেন। আর দর্শক চাহিদার কথা মাথায় রেখেই তাদের কাজ করতে হয়।

এদিকে সিনেমার পোস্টারের অবয়বেও এসেছে পরিবর্তন। আগে প্রতিটি পোস্টারে একাধিক চরিত্র উপস্থাপন করা হতো। এখন বেশির ভাগ সময়ই নায়ক ও নায়িকার ছবি দিয়ে পোস্টার করা হয়। কখনো কখনো শুধু নায়কের ছবি দিয়েও প্রকাশ তৈরি করতে দেখা গেছে। বিগত তিন বছরে এর মাত্রা আরও বেড়েছে।

অথচ বাইরের দেশে এখনো হাতে আঁকা সিনেমার পোস্টারের কদর রয়েছে। ক’বছর আগেও ফ্রান্সের পস্নাই দ্য টোকিও মিউজিয়াম আয়োজিত সিটি প্রিন্সেস শীর্ষক প্রদর্শনীতে সমাদৃত হয় বাংলাদেশের মোহাম্মদ শোয়েবের আঁকা একটি ব্যানার পেইন্টিং। ১৮ ফুট বাই ১০ ফুটের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের বিশাল পেইন্টিংটি ছিল ওই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। আরেক বাংলাদেশি ব্যানার শিল্পী শীতেশ সুরের কাজ প্রশংসিত হয়েছে জাপান ও লন্ডনে। অধুনালুপ্ত ঢাকা আর্ট সেন্টারে ব্যানার পেইন্টার বাহরামের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী মুগ্ধ করেছে দর্শকদের।

কৃতজ্ঞতা: যায়যায়দিন