সাহারা মরুভূমি, ছবি : ইন্টারনেট

সাহারা মরুভূমি : টেথিস সাগর থেকে মরু হওয়ার গল্প

আর. রহমান

সাহারা মরুভূমি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সর্বোচ্চ উষ্ণতম স্থানও বটে। কয়েক কোটি বছর আগে এই মরুভূমির জায়গায় ছিল টেথিস সাগর। নীল জলরাশির সে জায়গা এখন দখল করে করে রেখে কোটি কোটি বালুকণা। একটি সাগর কি করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমিতে পরিণত হয়, তা নিয়ে গবেষণা কম হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সাহারা মরুভূমিকে নিয়ে গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য আবিষ্কার করেন।

 

ডেজার্ট বেল্ট ও সাহারা মরুভূমি

পৃথিবীর ঠিক মাঝ বরাবার বিশাল একটি অংশ মরুভূমি। চীনের গপি মরুভুমি থেকে আমেরিকার চিহুহান মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃতি এ অংশকে বলা হয় ডেজার্ট বেল্ট। এই ডেজার্ট বেল্টে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মরুভূমি সাহারা। মূলত উত্তর আফ্রিকার বৃহদাংশ জুড়ে সাহারা মরুভূমির রাজত্ব। এই রাজত্বের পূর্বে লোহিত সাগর, উত্তরে মেডিটেরিয়ান সাগর এবং পশ্চিমে আছে আটলান্টিক সাগর। দক্ষিণে এই সীমানা ধরা হয়েছে সাহেল পর্যন্ত।
সাহারা মরুভূমি আয়োতনে সমগ্র ভারতের প্রায় তিন গুণ বড়। এটি বারোটি দেশজুড়ে বিস্তৃত। মিশর, মরোক্ক, লিবিয়া, মালি, মৌরিতানিয়া, আলজেরিয়া, চাঁদ, ইরিত্রিয়া, নাইজার, সুদান, তিউনিশিয়া ও পশ্চিম সাহারা। সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ পৃথিবীর একটি টেকটোনিক প্লেটের উপর অবস্থিত। অতীতে আফ্রিকা ও ইউরোপের মাঝে ছিল টেথিস সাগর।

সাহারা মরুভূমি যেভাবে এলো

ধীরে ধীরে জলবিচ্ছিন্ন হয়ে এ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়, ছবি: ইন্টারনেট

ধীরে ধীরে জলবিচ্ছিন্ন হয়ে এ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়, ছবি: ইন্টারনেট

প্রায় চার কোটি বছর আগে টেকটোনিক প্লেটের গতিশীলতার ফলে প্লেটটি উত্তরের দিকে সরে এসে আফ্রিকা ও ইউরোপকে একসাথে মিলিয়ে দেয়। ফলে আফ্রিকার উত্তরাংশ সংকোচিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে উঠে যায়। এরপর ধীরে ধীরে জলবিচ্ছিন্ন হয়ে এ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়। মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে মাত্র দেড়শো কিলোমিটার দূরে সাহারা মরুভূমির একটি অংশের নাম ওয়াদি-আল-হিতান। আরবি ভাষার এ শব্দটির বাংলা অর্থ তিমির উপত্যকা। প্রায় ৩৬ লক্ষ বছর আগে বিলুপ্ত ডোরাডান প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম এখানে পাওয়া গেছে।

বিশ হাজার বছর পরপর রূপ বদলে যায়

সাহারা মরুভূমি যে অতীতে সমুদ্র ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই ওয়াদি-আল- হিতান। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জীবাশ্ম পাওয়া গেছে এখানে। সাহারা মরুভূমিকে দেখলে মনে হবে প্রকৃতি থেকে সবুজ রং মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু সমুদ্র থেকে মরুভুমিতে পরিণত হওয়ার পরেও বহুবার সাহারা মরুভুমি সজিব হয়ে উঠেছিল। প্রতি বিশ হাজার বছর পরপর সাহারা জলভূমি ও তৃণভুমিতে পরিণত হয়। এর কারণ হলো পৃথিবী তার নিজ অক্ষপথে প্রতি বিশ হাজার বছর পরপর সামান্য উত্তর দিকে কাত হয়ে যায়। এর ফলে পৃথিবীর মৌসুমি বায়ুর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ঠিক সে সময় সাহারা মরুভুমিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার ফলে এ অঞ্চল সবুজে পরিণত হয়। সর্বশেষ পাঁচ থেকে সাত হাজার বছর আগে সাহারা অঞ্চলে মানুষ ও পশুপাখির বসবাস ছিল। ধারণা করা হয় ১৫ হাজার বছর পর সাহারা মরুভুমি আবারও সবুজ হয়ে উঠেবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বালির স্তুপ

সাহারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বালির স্তুপও বটে। মরুভুমির বালি দিয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আট ইঞ্চি পুরু করে ঢেকে ফেলা সম্ভব। সাহারা মরুভূমিতে একবার বালি ঝড় শুরু হলে, সেটা টানা চারদিন পর্যন্ত চলে।  বালি ঝড়ের সঙ্গে বয়ে আসা প্রচুর বালি তৈরি করে ছোটখাটো বালির পাহাড়। বালির পাহাড়ের উচ্চতায় প্রায় ১৫ তলার বিল্ডিংয়ের সমান হয়। মরুঝড়ের ফরে সৃষ্ট বালির পাহাড়গুলো স্থায়ি নয়। যা বছরে প্রায় পঞ্চাশ ফুট পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয়।

মরুভুমির বালি দিয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আট ইঞ্চি পুরু করে ঢেকে ফেলা সম্ভব, ছবি: ইন্টারনেট

মরুভুমির বালি দিয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আট ইঞ্চি পুরু করে ঢেকে ফেলা সম্ভব, ছবি: ইন্টারনেট

এই মরুভূমিটি মূলত পাথুরে মালভূমি ও বালির সমুদ্র দিয়ে গঠিত। ফলে বাতাস এবং হাল্কা বৃষ্টিপাতের কারণে বালিয়াড়ি, বালির সাগর, পাথুরে মালভূমি, শুষ্ক উপত্যকা, শুষ্ক হ্রদ ও নুড়ি প্রান্তড়ের সৃষ্টি হয়।  বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু পর্বতমালা, কতগুলো আগ্নেয়গিরি, মরুভূমির বালির নীচ থেকে উঠে আসে। এদের মধ্যে এয়ার পর্বতমালা, আহাগার পর্বতমালা, সাহারান অ্যাটলাস, তিবেস্তি পর্বতমালা, আদ্রার দে ইফোরাস এবং রেড সি হিলস উল্লেখযোগ্য।

মরুভূমির জীবজগৎ

মরুভূমি হলেও সাহারার আছে বিচিত্র জীবজগৎ। বৃষ্টিপাতের ভিত্তিতে সাহারার বৃক্ষরাজি বিভক্ত হয়েছে তিনটি প্রধান এলাকায়। উত্তরাঞ্চল (মেডিটেরিয়ান), মধ্যাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চল। সাহারা মরুভূমিতে উদ্ভিদ জগতের প্রায় ২৮০০ প্রজাতির বৃক্ষের উপস্থিতি রয়েছে। এই সংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ সাহারার স্থানীয় উদ্ভিদ। মধ্য সাহারায় ৫০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে যা এলাকার বিশালতার কাছে সামান্যই বটে। আকাসিয়া, খেজুর, সাকুলেন্ট, কাঁটাবন এবং ঘাসগুলো মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কারণে।

সাহারা মরুভূমির তাপমাত্রা

সাহারা মরুভূমির আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে এবং সূর্যের স্থায়িত্ব কাল অত্যন্ত দীর্ঘ হয়। মরুভূমির বেশিরভাগ অংশ বছরে ৩,৬০০ ঘণ্টা বা ৮২% এর বেশি সূর্যরশ্মি পেয়ে থাকে এবং পূর্বাঞ্চলে এর পরিমাণ ৪,০০০ ঘণ্টা বা ৯১% এর বেশি। সবচেয়ে বেশি উত্তাপের রেকর্ডের অধিকারী মিশরের উঁচু এলাকা (আসওয়ান ও লুক্সর) এবং নুবিয়ান মরুভূমি (ওয়াদি হালফা)।

সূর্যের অবিরত অবস্থান, কম গাছ-পালা, স্বল্প বৃষ্টিপাত এবং কম আর্দ্রতার কারণে গ্রীষ্মে সাহারার গড় তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্র্রী সেলসিয়াস বা ১০০.৪ থেকে ১০৪.০ ডিগ্রী ফারেনহাইটে পৌঁছায়। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল আলজেরিয়ান মরুভূমির বোউ বারনোস শহরের দখলে, ৪৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১১৬.৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট।

মরুভূমির বালুর তাপমাত্রা আরও বেশি। দিনের বেলা বালু প্রচন্ড গরম থাকে। ৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১৭৬ ডিগ্রী ফারেনহাইটে উঠে যায় নিমেষেই। সুদানে বালুর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮৩.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস (১৮২.৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট)।

এই মরুভূমিতে আছে রকমারি প্রাণী

সাহারা মরুভূমির প্রাণীকুলও বেশ সমৃদ্ধ। সাহারায় বেশ কয়েক প্রজাতির শিয়ালের বাস। তাদের মধ্যে ফেনেক ফক্স, পেল ফক্স এবং রুপেলস ফক্স অন্যতম। এডেক্স নামক বিশাল এন্টিলোপের বাস সাহারা মরুভূমিতে এবং তারা পানি ছাড়া প্রায় এক বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। দরকাস গাযেল নামক হরিণও অনেকদিন পর্যন্ত পানি ছাড়া বাঁচ পারে। এ ধরনের হরিণ কেবল মাত্র সাহারা মরুভূমিতেই দেখতে পাওয়া যায়।সাহারায় এই প্রজাতির হরিণ দেখতে পাওয়া যায়।

সাহারা মরুভূমির প্রাণীকুলও বেশ সমৃদ্ধ,ছবি : ইন্টারনেট

সাহারা মরুভূমির প্রাণীকুলও বেশ সমৃদ্ধ,ছবি : ইন্টারনেট

এছাড়া আলজেরিয়া, তোগো, নাইজার, মালি, বেনিন এবং বুরকিনা ফাসো অঞ্চলে সাহারান চিতার দেখা মেলে। বর্তমানে মাত্র ২৫০ টি পূর্ণবয়স্ক চিতার অস্তিত্ব পাওয়া যায় সাহারাতে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসের সূর্য এড়িয়ে চলা এই চিতাবাঘগুলো সাধারণত ফ্যাকাসে বর্ণের হয়। চিতা ছাড়া অন্যান্য প্রজাতির চিতাগুলো চাদ, সুদান এবং নাইজারের পূর্বাঞ্চলে বাস করে। সাহারা মরুভূমিতে মনিটর লিজার্ড, হাইরেক্স, স্যান্ড ভাইপার, রেড-নেক অস্ট্রিচ, আফ্রিকান সিলভার বিল, ব্ল্যাক ফেইসড ফায়ারফিঞ্চ এবং কিছু সংখ্যক আফ্রিকান বুনো কুকুর বাস করে। মৌরিতানিয়া এবং এনেদি মালভূমিতে কিছু ছোট প্রজাতির কুমির বাস করে।