মিশরীয় রানীর সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ

মিশরীয় পরাক্রমশালী রানীর সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ

রিয়াজ মাহবুব: কথিত আছে মিশরীয় রানী ক্লিওপেট্রার সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ ছিল। প্রায় ১ হাজার ৪শ বছর পর ভূমধ্যসাগরের গভীরে পাওয়া যায় প্রাসাদের অস্তিত্ব। মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে ক্লিওপেট্রা তার সৌন্দর্য, মোহনীয়তা, ক্ষমতা আর প্রচন্ড উচ্চাভিলাষী জীবন যাপন নিয়ে প্রাচীন মিশরের আলোচিত এক নাম ছিল। তাকে সর্বকালের সেরা নারী শাষকদের অন্যতম বলেও দাবী করেন কেউ কেউ। ফলে নারী শাষককে নিয়ে মিথ আর লোককথার ফুলছড়ি হরহামেশায় শোনা যায়। সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাদ সেই মিথের অংশ কিনা, সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় দেড় হাজার বছর।

মিসর কাঁপানো এই ক্ষমতাধরকে নিয়ে ইতিহাস বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার তাকে ঘিরে লিখেছেন হাজার হাজার পৃষ্ঠা। মঞ্চে উঠেছে তার ট্র্যাজেডি। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্র’, জর্জ বার্নাড শর ‘সিজার ক্লিওপেট্রা’, জন ড্রাইডেনের ‘অল ফর লাভ’, হেনরি হ্যাগাডের ‘ক্লিওপেট্রা’। শুধু তার সময়েই নয়, এখনো ইতিহাস কাঁপানো এ কিংবদন্তী নারী বহু পুরুষের কাছেও আকাঙ্খিত।
অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫১ অব্দে রোম সম্রাট টলেমি অলেতিস মারা যান। এই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার কে হবেন সে নিয়ে চারদিকে আলোচনা শুরু হয়। অবশেষে তিনি বেছে নেন ক্লিওপেট্রা ও তার পুত্র টলেমিকে। ক্লিওপেট্রার রাজ্য শাসন নিয়ে স্পষ্ট করে অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়নি।

ক্লিওপেট্রার বুদ্ধিমত্তা আর সৌন্দর্যের কথা তখন রাজ্য থেকে রাজ্যে ছড়িয়ে গেছে। লোকমুখে সে কথা অ্যান্টনির কানেও পৌঁছেছিল। অ্যান্টনি চাইলেন যে কোনোভাবেই হোক ক্লিওপেট্রার সঙ্গে দেখা করবেন। রোম থেকে অ্যান্টনি এলেন ক্লিওপেট্রার রাজকীয় প্রাসাদে। এ মিথ কে না জানে, প্রথম দেখাতেই ক্লিওপেট্রার মন জিতে নেন অ্যান্টনি। অবশ্য কারও কারও মতে মিসর আক্রমণ করতে এসে ক্লিওপেট্রার প্রেমে পড়ে যান রোমান বীর অ্যান্টনি। সে যাই হোক, প্রেমের আগুনে তখন পুড়ছেন দুজনেই। এদিকে হিসাব বেশ পাল্টে গেছে। ক্লিওপেট্রা শুধু প্রেমই পেলেন না, সঙ্গে মুফতে পেয়েছেন সিংহাসন রক্ষায় এক পরাক্রমশালী বীরের সমর্থন।

একদল ডুবুরি হঠাৎ করেই পেয়ে যান ক্লিওপেট্রার প্রাসাদ ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ

একদল ডুবুরি হঠাৎ করেই পেয়ে যান ক্লিওপেট্রার প্রাসাদ ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ

ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে সেই কৌতূহলের শেষ নেই আজও। এখনো আগ্রহীরা খোঁজ করেন তার চিহ্নটুকু। ক্লিওপেট্রা এবং তার শাসন পদ্ধতি সবই যেন রহস্যময়। ক্লিওপেট্রার প্রাসাদ এবং সাম্রাজ্যের বড় অংশ এখন ঘুমিয়ে আছে ভূমধ্যসাগরের নিচে। গ্রিক ঐতিহাসিক স্ত্রাবোর লেখায় জানা যায় ক্লিওপেট্রার প্রাসাদ ছিল মিসরের অ্যান্তিরহোদোস দ্বীপে। এই দ্বীপের অস্তিত্ব বহুদিন আধুনিক পৃথিবী জানতে পারেনি। শেষতক জানা গেল, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প এবং সুনামিতে ক্লিওপেট্রার প্রাসাদসহ এই দ্বীপটিকে গ্রাস করে নিয়েছে ভূমধ্যসাগর। প্রায় এক হাজার ছয়শ বছর আগে ভূমিকম্প ও সুনামিতে তলিয়ে যায় আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত বাতিঘরও।তখনই নিশ্চিত হওয়া যায় রানীর সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাস ছিল না। এটা কালের পরিক্রমায় ধ্বংস হয়েছে। সাগর তলে ডুবে গেছে।

সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ

সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার একদল ডুবুরি হঠাৎ করেই পেয়ে যান ক্লিওপেট্রার প্রাসাদ ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। এই ডুবুরি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সের প্রত্নতত্ত্ববিদ ফ্র্যাঙ্ক গর্ডিও। ১৯৯০ থেকে তারা সাগর চষে বেড়ান শুধু ক্লিওপেট্রার হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের খোঁজে। ১৯৯১ সালের ২৩ জানুয়ারি ভূমধ্যসাগরের গভীরে পাওয়া যায় ক্লিওপেট্রার প্রাসাদের অস্তিত্ব। কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে বলা হলো, এই প্রাসাদ তৈরি হয়েছিল রানীর জন্মেরও ৩০০ বছর আগে। দেখা গেল পানির অতলে ঘুমিয়ে আছে প্রাচীন নগরী, লাল রঙের মিসরীয় গ্র্যানাইটে তৈরি দেবী আইসিসের মূর্তি ক্লিওপেট্রার পরিবারের সদস্যদের মূর্তি প্রচুর অলঙ্কার বাসনপত্র এবং স্ফিংক্সের দুটি মূর্তি। রয়েছে সে সময়ের মুদ্রা থেকে শাসকদের মূর্তি। ডুবুরিরা তুলেও এনেছেন মিসরের শেষ রানী ক্লিওপেট্রার রাজ্যের অনেক মূর্তি, মুদ্রা ইত্যাদি। প্রত্নতত্ত্ববিদ গর্ডিও ও তার দল ক্লিওপেট্রা এবং তার প্রেমিক জুলিয়াস সিজারের ছেলে সিজারিয়ানের মাথার পাথরের মুকুট উদ্ধার করে। সাগরের নিচে প্রায় এক হাজার ৪০০ বছরের বালি আর কাদা মাখা ইতিহাসের অমূল্য এই দলিলের বেশ কিছু নিদর্শন তুলে আনা হয়েছে জনসমক্ষে। কিন্তু প্রতিকূলতার জন্য বেশির ভাগই রয়ে গেছে পানির নিচে।