সমাজতান্ত্রিক চীন ও দৈব্য আকৃতি অর্থনীতির রহস্য
সমাজতান্ত্রিক চীন ও দৈব্য আকৃতি অর্থনীতির রহস্য, ছবি : ইন্টারনেট

সমাজতান্ত্রিক চীন ও দৈব্য আকৃতির অর্থনীতির রহস্য

আর রহমান

আজকের সমাজতান্ত্রিক চীন পুরো বিশ্বের বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হয়েছে। দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি পশ্চিমা বিশ্বতো বটেই, খোদ আমেরিকার মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী চীনা কোম্পানির প্রচার ও প্রসার এতটাই বিস্তৃত হয়েছে; আমেরিকার মত অর্থনৈতিক পরাশক্তিও টিকতে পাড়ছে না। কার্যত বানিজ্য  যুদ্ধে নামতে হয়েছে। কিন্তু চল্লিশ বছর আগেও চীনের অবস্থা এমন ছিল না। ফলে সমাজতান্ত্রিক চীন ও  দৈব্য আকৃতির অর্থনীতির রহস্য নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

দু’শ বিলিয়ন থেকে  ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি

চীন পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ। এর জনসংখ্যা প্রায় এক’শ আত্রিশ কোটি। বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার এই দেশের অর্থনীতিতে গত আত্রিশ বছরে আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭৮ সালে চীনের জিডিপি ছিল মাত্র ২০০ বিলিয়ন ডলার। তখনকার সময় যা ছিল পৃথিবীর মোট জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ। বর্তমানে চায়নার জিডিপি ১১  ট্রিলিয়ন ডলারের। মানে বিশ্বের মোট জিডিপির ৫০ শতাংশ। বিশাল এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো চীনা পণ্যের সহজলভ্যতার।

সমাজতান্ত্রিক চীন এখন বৈশ্বিক কারখানা

কারিগরি দিক দিয়ে চীন নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে চীনে পণ্যের উৎপাদনের সহলভ্যতা একে বৈশ্বিক কারখানায় রুপান্তরিত করেছে। ঠিক এই মুর্হুতেও আপনি চীনা পণ্য ব্যবহার করছেন। স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবলড যে ডিভাইসটি দিয়ে আপনি রঙ পেনসিলের আর্টিকেলটি পড়ছেন, নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, এটিও চীনে উৎপাদিত। অথবা এর বিশেষ বিশেষ অংশ চীনে তৈরি হয়েছে।

দৈব্য আকৃতির অর্থনীতির পেছনের গল্প

চীনের অর্থনীতির উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। মাওসেতুং এর মৃত্যুর পর চীনের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে আসে ডেং জিও পিং। ডেং ক্ষমতায় আসার পরপরই ব্যাংকক, সিংঙ্গাপুরসহ এশিয়ার উন্নত শহরগুলো পরিদর্শণ করেন। বিভিন্ন দেশের সহযোগিতায় তিনি চীনের জন্য একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা দাঁড় করান। বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার কর্মসংস্থান ও অর্থনেতিক উন্নয়নের জন্য চীনকে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভাগ করেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, চীন সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়া শর্তেও কিছু কিছু খাতকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়। এর ফলশ্রুত চীনে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আসতে শুরু করে। চীনারাও বিদেশীদের স্বাগত জানাতে শুরু করে।

পুরো পৃথিবীর ৫০ শতাংশ জিডিপি চীনের কব্জায়

পুরো পৃথিবীর ৫০ শতাংশ জিডিপি চীনের কব্জায়, ছবি : ইন্টারনেট

চীনের ‘সস্তা শ্রম’ কৌশল ও বিদেশী বিনিয়োগ

আশির দশকের শুরুর দিকে, সমগ্র চীন থেকে দরিদ্র লোকজন কাজের সন্ধানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে আসতে থাকে। কাজের তুলনায় শ্রমিক বেশি হওয়ায় মজুরি কমে যায় ব্যাপক হার। তৎকালিন সময় চীনের শিশু শ্রম এবং সর্বনিন্ম মানের মজুরি নির্ধারনের কোন আইন ছিল না। ফলে বিনিয়োগকারীরা নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময় অনেক শ্রমিক পেতে শুরু করে। এটাকে সুবর্ণ সুযোগ ভেবে বিদেশীরা লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে থাকে চীনে। এভাবেই পুরো দুনিয়ার উন্নত দেশগুলো চীন নির্ভর হয়ে পড়ে।

উৎপাদন বাণিজ্যে চীন বিশ্বের এক নম্বর, ছবি : ইন্টারনেট

উৎপাদন বাণিজ্যে চীন বিশ্বের এক নম্বর, ছবি : ইন্টারনেট

সহজলভ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চীনের আরেকটি কৌশল

শুধু সস্তা শ্রমিকই নয়, চীন পৃথিবীর কারখানা হয়ে উঠার পেছনে আরেকটি অন্যতম কারণ হলো- এর উৎপাদন ব্যবস্থা। শিল্প উৎপাদন কখনো বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বিকশিত হতে পারে না। তাই কাঁচামাল উৎপাদন, কাঁচামাল সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে চীন সরকার। ফলে উৎপাদিত পণ্যের যেকোন কাঁচামাল খুব সহজেই চীনে পাওয়া যায়। এক কথায় বলা যায়, চীনের ব্যবসায় বাস্তুসংস্থান পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।

বিশ্বে চীনা পণ্যের দাপট

বর্তমান চীনে উৎপাদিত প্রযুক্তি পণ্যের একছত্র আধিপত্য রয়েছে বিশ্বব্যাপি। চীনের গুয়াং ডং প্রদেশের শেনজেনকে বিশ্বের প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের রাজধানী বলা হয়। বিশ্বে উৎপাদিত সকল ইলেকট্রনিক পণ্যের ৯০ শতাংশ এখান উৎপাদিত হয়। মাইক্রোসফট,সনি, সামসং, অ্যাপোল, ক্যানননের মত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য শেনজেনেই উৎপাদন করে।

ভবিষ্যতের নিশ্চিত পরাশক্তি  সমাজতান্ত্রিক চীন

চীন বর্তমানে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধশালী দেশ। চীন যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হবে। এ কারণে পশ্চিমা বিশ্ব এ নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ্ব ব্যবস্থায় পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে দিয়েছে। চীন যেভাবে অর্থনীতিতে উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এভাবে উন্নতি করতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে চীন অর্থনীতিতে বিশ্বে এক নম্বর দেশ হবে। চীন তার অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে সাহায্য ও ঋণ দান করে বন্ধু রাষ্ট্র বাড়িয়ে নিচ্ছে। এরইমধ্যে চীন তার মুক্তবাণিজ্যের উদ্দেশ্যে গঠন করে FTAAP (Free Trade Agreement of Asian Pacific)। এই চুক্তির অন্তর্গত দেশগুলোর মধ্যে চীন মুক্তবাণিজ্য চালু করেছে। চীন এর ধারাবাহিকতায় এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে একক আধিপত্য বজায়ের জন্য One Belt One Road কর্মসূচির দিকে এগুচ্ছে।

 আরও পড়তে পারেন – চীন পারলো, আমেরিকা কেন পারলো না

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এর পাল্টা জবাবে গঠন করেছে TTP যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভুক্ত দেশগুলোতে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্দেশ্যের পেছনে আছে চীনের অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করা। চীন যেভাবে অর্থনীতিতে উন্নতি করছে। এভাবে উন্নতি করলে চীন এক সময় যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ছাড়িয়ে যাবে। এসব নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে তাদের পণ্যে পাল্টাপাল্টি বাড়তি শুল্কারোপের মাধ্যমে।

বন্ধু দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীন

এরই মধ্যে চীন ১১২টি দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হয়েছে। এর বেশিরভাগই অবকাঠামোকেন্দ্রিক। পাওয়ার প্লান্ট, স্থল বন্দর, সমুদ্র বন্দরসহ অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো সংক্রান্ত প্রজেক্টে দেশটি হয় বিনিয়োগ করেছে, না হয় অনুদান কিংবা লোন দিয়েছে। দেশটি শুধু বিনিয়োগ করেই বসে থাকেনি। অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে আছে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। কারণ, এতদিনে তারা নিজেদের মাটিতে কাজ করে সঞ্চয় করেছে অভিজ্ঞতা এবং তৈরি করেছে দক্ষ মানবসম্পদ, যা এখন তারা কাজে লাগানো শুরু করছে দেশের বাইরেও। একদিকে তারা যেমন বিনিয়োগ করছে, তেমনি তারা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তাদের লোকদের কাজ করার সুযোগের পাশাপাশি তৈরি করে দিচ্ছে বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা।
মোদ্দা কথা, যেখানেই তাদের অর্থে কাজ হচ্ছে, প্রায় সব জায়গায় কাজ করছে তাদের শ্রম শক্তি এবং সেখানেই গিয়ে হাজির হচ্ছে চীনা কোম্পানিগুলো। এমন না যে, চাইলেই অন্য দেশের কোম্পানিও সেখানে প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ পাচ্ছে। নির্দিষ্ট চুক্তি ও শর্তের আওতাতেই এসব কিছু হচ্ছে।

পরাশক্তি হওয়া পথে চীন

পরাশক্তি হওয়ার পথে চীন, ছবি : ইন্টারনেট

 সামরিক খাতে দাপট দেখাচ্ছে সমাজতান্ত্রিক চীন

এক দশক ধরে চীন আফ্রিকায় সক্রিয় ছিল মূলত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে, কিন্তু সম্প্রতি তারা ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ খ্যাত ছোট আফ্রিকান দেশ জিবুতিতে তাদের প্রথম সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। জিবুতি হলো এই মহাদেশের অন্যতম প্রবেশপথ এবং বিশ্বের ২০টি সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি। ঠিক সেখানেই চীনের এই অবস্থান এখন আমেরিকার জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে ভবিষ্যতে আফ্রিকায় আরও কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারে দেশটি। চীনের জন্য মহাদেশটি সহজ লক্ষ্য ছিল, কারণ অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার কারণে পশ্চিমাদের পাশাপাশি আমেরিকাও এখানে অর্থ খরচের ব্যাপারে গা বাঁচিয়ে চলে। আর এই সুযোগ লুফে নিয়ে আফ্রিকায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধীরে ধীরে জোরালো করছে এশিয়ার দেশটি। বাণিজ্যিক সহযোগিতার পাশাপাশি চীনের সামরিক উপস্থিতি প্রমাণ করে, পরাশক্তি হওয়ার দৌড়ে তারা বেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

 

সূত্র :  প্রথম আলো,  বিবিসি বাংলা, সিএনএন, নিউওয়র্ক টাইমস