পৃথিবীতে প্রায় দেড় হাজার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে

সক্রিয় আগ্নেয়গিরি : পৃথিবীর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভৌগলিক প্রকৃয়া

আর রহমান: আমাদের গ্রহের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভৌগলিক প্রকৃয়া আগ্নেয়গিরি। মাটির নিচে থাকা গলিত উত্তপ্ত পাথর, ছাই এবং গ্যাস যে পথে বেরিয়ে আসে, সেগুলোই মূলত আগ্নেয়গিরি হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় দেড় হাজার সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে। এবং প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় পঞ্চাশ থেকে সত্তোরটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।

আগ্নেয়গিরি হলো বিশেষ ধরণের পাহাড়। যার ভেতরের কোন ফাঁটল বা ছিদ্র পথ দিয়ে ভূগর্ভস্থ তপ্ত পদার্থ প্রবল বেগে বেরিয়ে আসে। আগ্নেয়গিরি থেকে ভুগর্ভস্থ পদার্থের নির্গমনকে অগ্ন্যুৎপাত বলা হয়। আগ্নেয়গিরির যে পথ দিয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে তাকে বলে জ্বালা মুখ। আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত এইসব পর্দাথ চারপাশে জমা হয়ে মৌচার আকৃতি ধারন করে, তখনই একে আগ্নেয়গিরি বলা হয়।

সাধারণত ভূতলের কোন ফাটঁলের দূবর্ল ছিদ্র পথের নিচে ভূগর্ভের তরল শিলার চাপ বৃদ্ধি পেল অগ্নোতপাত ঘটে। ভূঅভ্যান্তরে জমে থাকা তরল শিলাকে বলে ম্যাগমা। আর যে তরল শিলা ভূপৃষ্টের বাইরে বেরিয়ে আসে তাকে বলে লাভা। এসব লাভা ১২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে।

আগ্নেয়গিরি থেকে প্রচন্ড উত্তপ্ত ছাই ও গ্যাসের মিশ্রণ বের হয়

আগ্নেয়গিরি থেকে প্রচন্ড উত্তপ্ত ছাই ও গ্যাসের মিশ্রণ বের হয়

অনেক সময় আগ্নেয়গিরি থেকে প্রচন্ড উত্তপ্ত ছাই ও গ্যাসের মিশ্রণ বের হয়। একে বলা হয় পাইরোক্লাসটিক ফ্লো। এসব পদার্থ ঘণ্টায় প্রায় একশ ষাট কিলোমিটার গতিতে আগ্নেয়গিরির চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রবাহ চলার পদে সবকিছুকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। অগ্ন্যুৎপাত ফলে বন্যা সুনামি এবং ভূমিকম্পও তৈরি হতে পারে।

আগ্নেয়গিরির জ্বালামূখ থেকে চারদিক থেকে ৩২কিলোমিটার পর্যন্ত বিপদজনক এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৫ কোটি লোক আগ্নেয়গিরি বিপদসীমার মধ্যে বসবাস করেন।

আগ্নেয়গিরি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। লাভা উৎগিরণের উপর ভিত্তি করে আগ্নেয়গিরিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ও লুপ্ত আগ্নেয়গিরি। যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে সবসময় ধোয়া ছাই, গ্যাস বা গলিত লাভা বের হয় তাকে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি বলে। সক্রিয় আগ্নেয়গিরিকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। যেমন সবিরাম আগ্নেয়গিরি ও অবিরাম আগ্নেয়গিরি। সবিরাম আগ্নেয়গিরিতে নির্দিষ্ট সময়ের পরপর অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। আর অবিরাম আগ্নেয়গিরি থেকে প্রতিনিয়ত লাভা নির্গত হতে থাকে।

তানজানিয়ায় থাকা কিলোমানজারো পৃথিবীর সবোর্চ্চ মৃত আগ্নেয়গিরি

তানজানিয়ায় থাকা কিলোমানজারো পৃথিবীর সবোর্চ্চ মৃত আগ্নেয়গিরি

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে থাকা মাউা লোয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। অন্যদিকে যেসব বর্তমানে সক্রিয় অবস্থায় নেই, কিন্তু ভবিষ্যতে লাভা উৎগিরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বলে। জাপারেন ফুজি পর্বত একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। এবং লুপ্ত আগ্নেয়গিরি হলো ভবিষ্যতে যেসমস্ত আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাতের কোন সম্ভাবনা নেই। তানজানিয়ায় থাকা কিলোমানজারো পৃথিবীর সবোর্চ্চ মৃত আগ্নেয়গিরি। কোথাও কোথাও সুপ্ত ও লুপ্ত আগ্নেয়গিরির মুখে পানি জমে নদের সৃষ্টি হয়। একে আগ্নেয়গিরি হৃদ বলে।

সমুদ্রের তলদেশেও এমন অগণিত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ভূপৃষ্টে এবং সাগর তলে থাকা সব আগ্নেয়গিরি এমনসব জায়গায় অবস্থিত যেখানে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো মিলিত। বেশকয়েকটি টেকটোনিক প্লেটের সমন্বিত অবস্থানের ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকে একটি বিশেষ অঞ্চল তৈরি হয়েছে। যাকে বলা হয় রিং অব ফায়ার। পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ আগ্নেয়গিরি এই রিং অব ফায়ারের মধ্যে অবস্থিত। ইন্দোনেশিয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়গিরি দেখা যায়। এই দেশে থাকা ১৪৭টি থাকা আগ্নেয়গিরি মধ্যে ৭৩টিই সক্রিয়। আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পৃথিবীর বহু দ্বীপমালার সৃষ্টি হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়গিরি দেখা যায়

ইন্দোনেশিয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়গিরি দেখা যায়

এছাড়াও আমাদের গ্রহের অনেক পর্বতও মূলত আগ্নেয়গিরি। মৃত আগ্নেয়গিরি কিলিমানজারো আফ্রিকার মহাদেশের সর্বচ্চো পর্বত হিসেবে বিবেচিত। শুধু তাই নয়। একক ভাবে দাড়িয়ে থাকা পৃথিবীর সর্বচ্চো পর্বতও এই কিলিমানজার।