শিয়া সুন্নির পার্থক্য, ছবি : ইন্টারনেট

শিয়া সুন্নি পার্থক্য : যতটা না ধর্মীয় ততটাই রাজনৈতিক

রিয়াজ মাহমুদ

শিয়া সুন্নি পার্থক্য প্রকাশ্য ও দীর্ঘদিনের। প্রকৃত পক্ষে ইসলাম ধর্ম কোন ধরনের ভেঁদাভেদ সমর্থণ করে না। তবে এই পার্থক্য  যতটুকু ধর্মীয় তারচেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবীদের বক্তব্য ও কলামে এসব তথ্যই বারবার উঠে এসেছে। সুন্নিরা দাবি করেন, শিয়াদের মতাদর্শ গোড়ামি ও সেচ্ছাচারিতার সামিল। অপরদিকে শিয়াদের বিশ্বাস, খিলাফতের একমাত্র ইমাম হযরত আলী র. এবং মানুষের নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা নেই।

শিয়া সুন্নি পার্থক্য যেভাবে

বিশ্বব্যাপী প্রায় দুইশ কোটি মুসলিম রয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি মতাদর্শের। সুন্নি আরবি শব্দটি এসেছে সুন্নাহ থেকে। সুন্নাহ শব্দের অর্থ, রীতি প্রথা আচারণ ইত্যাদি। সাহাবীরা হযরত মুহাম্মদ স. এর বানী কর্ম ও নির্দেশগুলো সম্পূর্ণরুপে অনুসরণকারীদের সুন্নি বলা হয়। অন্যদিকে শিয়া শব্দটির অর্থ দল। হযরত আলীর অনুসারীরা ‘শিয়াত- ই- আলী’ বা আলীর দল নামে পরিচিত। শিয়া মাজহাব প্রথমে রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। শিয়া মতবাদের মূল ভিত্তি হলো আলী এবং তার বংশধরেরাই খিলাফতের প্রধান দাবীদার। তারা মনে করে নেতৃত্ব নির্বাচনের কোন অধিকার মানুষের নেই। শুধুমাত্র আল্লাহই পারেন মানুষের নেতা নির্বাচন করতে। তাদের ধারণা ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ স. হযরত আলীকে খিলাফতের জন্য মনোনীত করে গিয়েছিলেন।

শিয়া সুন্নি পার্থক্য, ছবি : ইন্টারনেট

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়া অনুসারীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও ইরান ও ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাঘরিষ্ঠ। তাছাড়া বাহারাইন, সিরিয়া ও ইয়ামেনেও অনেক শিয়া অনুসারী বাস করেন।

 

শিয়াদের বিশ্বাস

শিয়াদের আকিদা-বিশ্বাস অনেকটা ইতিহাসকেন্দ্রিক। তাদের যে দল যেভাবে ইতিহাস ব্যাখ্যা করেছে, সেটাই ঐ দলের আকিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মোটাদাগে পাঁচটি মূলনীতিতে তারা একমত।

আলী রা.এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁকেই খেলাফতের প্রথম ও একমাত্র উত্তরাধিকারী মনে করা। এ ব্যপারে সব শিয়ারা একমত। এছাড়া অন্য সব বিষয়, যেমন সাহাবায়ে কেরামের ব্যপারে তাদের অবস্থান, খেলাফত ও রাজনীতি আকিদার অংশ হওয়া এবং তাদের ইমামগণের সংখ্যা ইত্যাদি সকল বিষয়ে তাদের মাঝে রয়েছে মতপার্থক্য।

https://www.businessinsider.com/the-differences-between-shia-and-sunni-muslims-2015-10

অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি মতাদর্শের , ছবি: ইন্টারনেট

আহলে বাইতের সদস্যগণকে শরীয়তের মারজা তথা কেন্দ্রবিন্দু মনে করা। বিশেষ করে তাদের মধ্যে যাদেরকে শিয়ারা ইমাম মানে, তাদের কথা ও কাজকে শরীয়তের অংশ মনে করা। এরফলে সুন্নি এবং শিয়াদের মাঝে হাদিসের সংজ্ঞা নিয়েও রয়েছে দ্বিমত। শিয়াদের কাছে হাদিসের সংজ্ঞা সুন্নিদের চেয়ে প্রসারিত। সুন্নিদের নিকটে হাদিস হচ্ছে শুধু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ এবং বিবৃতি। কিন্তু শিয়াদের কাছে তাদের ইমামগণের কথা এবং কাজও হাদিসের অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলো শরীয়তের অংশ বলে গণ্য।

আহলে বাইতের সাথে গভীর আবেগের সম্পর্ক, তাদের নিদর্শনকে বারাকাত হিসেবে গ্রহণ এবং তাদের পবিত্র স্থানসমূহে স্থাপত্য নির্মাণ। যেমন একটি মজার ঘটনা বলি, আফগানিস্থানের বলখের এক ব্যক্তি স্বপ্ন দেখেন, আলি রাঃ এক ব্যক্তিকে সাদা ঘোড়ায় করে তার এলাকায় পাঠিয়েছেন এবং সে মৃত্যুবরণ করেছে। সে সূত্রে তিনি একটি মাজার গড়ে তোলেন,পরবর্তীতে ঐ এলাকার নাম মাজার-ই- শরীফ হিসেবে পরিচিত হয়।

 

স্মৃতিচারণ ও দুঃস্মৃতির প্রচার

 

আহলে বাইতের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক জুলুম হয়েছে, তার স্মৃতিচারণ। এই যে স্মৃতিচারণ, একে সুন্নিদের পক্ষে বুঝা অসম্ভব। কেননা রাজনৈতিক জুলুমকে সুন্নিরাও স্মরণ করে, তবে, অতিক্রম করতে চায়। শিয়ারা চায় দুঃখ-স্মৃতির চিরন্তনকরণ। শিয়াদের নানা প্রতিষ্ঠানও আছে, যার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হচ্ছে দুঃস্মৃতির প্রচার। বিশেষ দুঃখ-স্মৃতিচারণ কীভাবে গড়ে উঠল, এ নিয়ে নানা অভিমত আছে ; পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব বা প্রাক ইসলামি চিন্তার প্রভাব বা রাজনৈতিক জুলুমের দুঃস্মৃতি দিয়ে বর্তমান ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা!

শিয়ারা চায় দুঃখ-স্মৃতির চিরন্তনকরণ, ছবি : ইন্টারনেট

শিয়ারা চায় দুঃখ-স্মৃতির চিরন্তনকরণ, ছবি : ইন্টারনেট

সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে নবী কারিম স. এর অসিয়তের বিরুদ্ধাচারণের অপবাদ। তবে এই বিষয়ে শিয়াদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যা আছে। তবে কিছু সংখ্যক শিয়ারা মনে করেন , সাহাবাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মানে ইসলামের বিরুদ্ধেই অভিযোগ, তাই কোন সূত্র পেলেই এর থেকে তারা বের হয়ে যান। যেমন, জাইদিয়ারা মনে করে, যোগ্যতম ব্যক্তি থাকা সত্বেও অপেক্ষাকৃত কমযোগ্য ব্যক্তি খলিফা হতে পারে।

মূলত শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে আকীদাগত এবং বিভিন্ন রীতি-রেওয়াজগত মতভেদ রয়েছে তা সত্য। তবে তাদের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ঝগড়া-ফ্যাসাদ এবং তর্কের সৃষ্টি করে তা কোনো আকীদাগত এবং ইবাদতগত বিষয় নয়। বরং তা হচ্ছে রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সংক্রান্ত বিষয়।

 

শিয়া সুন্নি পার্থক্য প্রকাশ্যে

 

হযরত মুহাম্মদ স. হিজরতের পর মক্কার ইহুদীরা খুশি হলেও মদিনার ইহুদীরা বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। মদিনার ইহুদীদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তখন থেকেই মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করতে থাকে। মহানবী স. পরলোক গমনের পর ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্বে প্রশ্নে মুসলীমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল নেতা হিসাবে চেয়েছিল আবু বকরকে। অন্যদলে সমর্থন ছিল হযরত আলীর প্রতি। অধিকাংশ মুসলমানের সমর্থণের ভিত্তিতে হযরত আবু বকর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন।

এরপর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইহুদীদের চক্রান্তে ফিরোজ নামের এক আততায়ির হাতে নিহত হোন। এরপর তৃতীয় খলিফা হিসাবে নির্বাচিত হোন হযরত ওসমান।তৎকালীন ইহুদী নেতা সাবার ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা মুসলীমদের গোপন খবর পাওয়ার জন্য লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণ করে। পরিকল্পনা মত তিনি নিজেকে অতিব ধর্মপ্রাণ মুসলীম হিসাব প্রকাশ করতে থাকে। সেই প্রথম প্রচারণা শুরু করে যে মুহম্মদ স. এর আপন আত্মিয় হিসাবে হযরত আলী খেলাফতের সবেচেয় বেশি যোগ্য। সেই সঙ্গে তিনি ইসলামের প্রথম তিন খলিফা হযরত আবু বকর, হযরত আবু ওমর এবং হযরত ওসমানের বিরুদ্ধে কুৎসা সরাতে থাকেন। অপপ্রচারের ফলে একপর্যায়ে তৎকালীন খলিফা হযরত ওসমানকেও হত্যা করা হয়। এরপর হযরত আলীর অনুসারীরা দাবী করতে লাগলো তিনি যেনো খলিফা হোন। প্রথমে আলী খলিফা হতে রাজি হোননি। পরবর্তীতে নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে তিনি ফিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ স. এর জীবদশা পর্যন্ত ইসলামে শিয়া সুন্নি বলে কোন শাখা ছিল না। ইসলাম ধর্মে অনুপ্রবেশকারী কিছু ব্যক্তি রাজনীতি ও ক্ষমতা চর্চার জন্য ধর্মের নামে এ ভেঁদাভেদ তৈরি করে।