শাওলিন কুংফু
শাওলিন কুংফু

শাওলিন কুংফু : দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর মার্শাল আর্ট

রিয়াজুর রহমান রায়হান : চীন দেশের এক বিখ্যাত জায়গা শাওলি মন্দির। দেড় হাজার বছর ধরে এখানে চর্চা হচ্ছে বিশেষ ধরনের কুংফু। যা শাওলিন কুংফু নামে পরিচিত। শাওলিন কুংফুর মূল ধারনা হলো মানব দেহকে শক্তিশালী ও প্রাণনাশক অস্ত্রে পরিণত করা। ২০০০ সালে শাওলিন মঠের সুউচ্চ কাঠের পেগোডা বিশ্ব ঐহ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

চীনা গুংফু বা কুংফু শব্দের অর্থ হলো ধর্য ও শক্তি সহকারে কোন কিছু অধ্যায়ন করা। বিশ শতক থেকে কুংফু শব্দটি মূলত চীনা যুদ্ধ বিষয়ক শিল্পকলার ক্ষেত্রেই ব্যবহার হতো। প্রচলিত ভূল ধারনা হলো আমরা কুংফু ও কারাতে একই জিনিস মনে করি। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। কুংফু হলো চাইনিজ। আর কারাতে হলো জাপানিজ। কারাতে শব্দের অর্থই হলো খালি হাত। অন্যদিকে কুংফু খালি হাতেও হতে পারে। আবার বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করেও হতে পারে। কুংফু কারাতে ছাড়াও জুডো তাইকোর মতো আরও নানান ধরনের মার্শাল আর্ট রয়েছে। এদের প্রত্যেকটিরই আছে নিজেস্ব বৈশিষ্ট্য।

চীনা ও জাপানিজ সব মার্শাল আর্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো কুংফু। কুংফুর আবার যতগুলো ধরন আছে তার মধ্যে, সবচেয়ে ভয়ংকর শাওলিন কুংফু। শাওলিন কুংফুর যাত্রা শুরু হয়েছিল বুদ্ধভদ্র নামের একজন ভারতীয় সন্ন্যাসীর হাত ধরে। ভারত থেকে বুদ্ধভদ্র ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে চীনের হেনান প্রদেশের অসং পর্বতের গুহায় তপস্যা করতে শুরু করেন। তখন স্থানীয় লোকজন বুদ্ধভদ্রের র্শীষত্ব গ্রহণ করতে শুরু করেন। এমনকি তৎকালীন সম্রাট জিয়াওয়েন তার গুণমুগ্ধ ছিলেন। সেখান থেকেই বুদ্ধ ধর্মের চান বা জেন শাখার উৎপত্তি হয়। চান বা জেন শব্দ দুটি সংস্কৃত ধ্যান শব্দ থেকে এসেছে। এই মতাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, ধ্যান বা আত্ম অনুসন্ধানের মাধ্যমেই এটি লাভ করা সম্ভব।

মার্শাল আর্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো কুংফু

মার্শাল আর্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো কুংফু

বুদ্ধভদ্র যাতে চীনে স্থায়ী ভাবে থেকে যায় সে জন্য ৪৭৭ সালে সম্রাট জিয়াওয়ন শান পর্বতমালায় একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। যাকে বর্তমানে সারা বিশ্ব শাওলিন টেমপল নামে জানে। শাওলিন মঠ প্রতিষ্ঠার পর বুদ্ধভদ্র ঈশ্বর সাধনার পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিক শক্তি সাধনের চেষ্টা করেন। তখন তিনি তার দুই প্রধান শির্ষের সহায়তায় ভারতীয় মার্শাল আর্টের সঙ্গে চীনের মার্শার আর্টের মিশেলে জন্ম দেন এক অবিশ্বাস্য শিল্প। যার নাম শাওলিন কুংফু। তারপর থেকেই শাওলিন একটি বৌদ্ধ মঠ হওয়া শর্তেও পৃথিবীর সর্ব বৃহত্ত এবং সবচেয়ে ঐহিত্যবাহী মার্শলআর্ট স্কুল হিসাবে খ্যাতি অর্জন করে।

পৃথিবী বিখ্যাত এই মন্দিরে প্রায় ৫০০ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু নিয়মিত বসবাস করেন। তাদের মধ্যে প্রায় একশ শিক্ষার্থী যোদ্ধা হিসাবে প্রশিক্ষীত হয়। এই শিক্ষার্থীদের কাছে কুংফু কেবল মাত্র সমরবিদ্যা নয়। এখান থেকে উস্তাদ হয়ে বের হতে হলে একজনকে শুধু কুংফু জানলেই হবে না। সেই সাথে বৌদ্ধ ধর্মের জ্ঞান আত্মস্থ করতে হবে।

শাওলিন মঠের শুরুর দিকে কয়েকশ বছর সন্যাসীদের এক হাজারটি কুংফু শৈলী অভ্যাস করতে হতো। এরপর তারা সেরা একশটি শৈলী বেছে নিয়ে র্চচা করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে সে গুলোর মধ্য থেকে ১৮টি কুংফু শৈলী গ্রহণ করে। প্রাণী জগৎ থেকে অনুপ্রাণীত হয়ে এসব পদক্ষেপ উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাঘ, ভাল্লুক , ঈগল, সাপ, বেজী, বানর বা কাল্পনিক ড্রাগনের আক্রমন শত শত বছর পর্যবেক্ষণ করে সেগুলো কুংফুতে অন্তভক্ত করা হয়েছে। এসব প্রাণীরা যেমন বিদ্যুত গতিতে আক্রমন করে মুহুর্তের মধ্যে শত্রুর নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে, কুংফুর উদ্দেশ্যও ঠিক তাই। একেকটি শৈলী রপ্ত করতে হলে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়।

শিক্ষার্থীদের কাছে কুংফু কেবল মাত্র সমরবিদ্যা নয়

শিক্ষার্থীদের কাছে কুংফু কেবল মাত্র সমরবিদ্যা নয়

নবীন শিক্ষার্থীদের প্রথমেই পেশী ও হাড় শক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একজন আদর্শ শাওলিন শিক্ষার্থী দশ থেকে বিশ বছর সাধারণ কুংফু শেখেন। তারপর আরও সাধনা করার ইচ্ছে থাকলে তখন শুরু হয় তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ। তেমনই একটি বিদ্যা হলো ইজিনজিং। বাহ্যিক কাঠামোর সাথে শরীরের ভিতরের অঙ্গ প্রতঙ্গকেও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা ইজিংজিং’র মূল উদ্দেশ্য। এড়ারাও শরীরের দুর্বল অংশেও তীব্র আঘাত সহ্য করার প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রশিক্ষণের জন্য ধ্যানের কোন বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন: মিশরীয় পরাক্রমশালী রানীর সাগরতলে গুপ্ত রাজপ্রাসাদ

বৌদ্ধ ধর্মের চান শাখার সন্নাসীরে মতে আত্মরক্ষা ও দেশ রক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে হয়। সেজন্য দেশ ও ধর্মের বিপদে তারা বহুবার যুদ্ধেও নেমেছে। ৬১০ সালে কয়েকশ ডাকাতের ভয়াবহ আক্রমন তারা ঠেকিয়েছে। এরপর ৬২১ সালে তৎকালীন স¤্রাট ওয়েনের পক্ষে বিশাল পেশাদার বাহিনীকে তারা অনায়েশে হারিয়ে দেয়। প্রতিদিন ভোর চারটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম ও দুর্দান্ত কসরতের ফলে অনেকেরই শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। সেজন্য ৮০০ বছর আগে শাওলিন মন্দিরে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল। শারীরিক বিভিন্ন আঘাত সারিয়ে তুলতে নানা ধরনের ভেষজ উপাদান ব্যবহার করে। সূদীর্ঘকাল ধরে সন্ম্যাসীদের ব্যবহারিক ফলাফলের উপর ভিত্তিকরে এনসব ঔষধ প্রস্তুত করা হয়। তাদের কিছু ঔষধে প্রায় ২হাজার ভেসজ উপাদান থাকে। এসব ঔষধী উদ্ভিদ শাওলিন মন্দিরের আশেপাশেই চাষ করা হয়।
যদিও মার্শাল আর্টের এই কেন্দ্রটির কথা পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে খুব বেশিদিন আগে নয়। ১৯৭৮ সালে হংকং একটি চলচ্চিত্র প্রকাশ হওয়ার পর সারা বিশ্বে শাওলিন কুংফু বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।