লালবাগ কেল্লা : মুঘল ঐতিহ্যের সঙ্গে অভিশপ্ত সুড়ঙ্গের কল্পকাহিনী

আর. রহমান
লালবাগ কেল্লা পুরান ঢাকায় কয়েকশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে । মুঘল ঐতিহ্যের কারুকাজ ও সৌন্দর্য এর গতর জুড়ে। যদিও স্থানীয়রা কেল্লার রূপ-জৌলুসের চেয়ে এর রহস্যময় সুড়ঙ্গ নিয়ে চর্চা করতে বেশি পছন্দ করে। এই সুড়ঙ্গ ঘিরে প্রচলিত আছে শতবছরের কল্পকাহিনী। সুড়ঙ্গটি মূলত লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ-পূর্ব দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত। এখন সুড়ঙ্গের মুখে লোহার গেটে তালা লাগানো হয়েছে। শুধু সুড়ঙ্গই নয়, কেল্লাটি ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত রহস্যগুলোর কুল কিনারা আজও পাওয়া যায়নি।

লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গ

কয়েক বছর আগে দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, লালবাগ কেল্লার নিচে রয়েছে অনেকগুলো সুড়ঙ্গ। এগুলো সুবেদারদের আমলে তৈরি। বিপদের সময় পালানোর জন্য এসব সুড়ঙ্গপথ। তবে একটি সুড়ঙ্গ এখনো বিদ্যমান, যার ভিতরে কেউ ঢুকলে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ কেউ এই সুড়ঙ্গের ভিতর প্রবেশ করলে সে আর ফিরে আসে না। পরীক্ষা করার জন্য একবার দুটি কুকুরকে শেকলে বেঁধে সেই সুড়ঙ্গে নামানো হয়েছিল। শেকল ফেরত এলেও কুকুর দুটো কিন্তু ফিরে আসেনি।

 

 

লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গ

লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গ

লোকমুখে লালবাগ কেল্লা

লোকমুখে শোনা যায়, এই সুড়ঙ্গ দিয়ে পাশেই বুড়িগঙ্গা নদীতে যাওয়া যেত। সুড়ঙ্গমুখ থেকে বেরিয়েই নৌকায় উঠে যাওয়া যেত জিঞ্জিরা প্রাসাদে। আবার নদীর বাতাস অনুভবের জন্য ওই সময়ের সেনাপতিরা এই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করতেন। তবে এসব কথাকে কল্পকাহিনী বলে দাবি করেছে লালবাগ কেল্লার কাস্টোডিয়ান কার্যালয়। তারা দাবি করেন, এসব কথার কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে যুদ্ধের সময় মুঘল সেনারা যখন বুঝতেন পরাজয় কাছাকাছি, তখন তারা এই সুড়ঙ্গ দিয়ে দুর্গের দেয়াল পেরিয়ে যেতেন। সুড়ঙ্গপথের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আজ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ হয়নি। তাই এটি ঢাকার আদি বাসিন্দাদের কাছে এখনো রহস্যেও নাম।

লালবাগ কেল্লার ইতিহাস

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, আগে ঢাকার সুবেদারদের থাকার জন্য স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে সুবেদার আযম শাহ ১৬৭৮ সালে ঢাকায় সুবেদারদের স্থায়ী প্রাসাদদুর্গ করার প্রথম উদ্যোগ নেন। তিনি অত্যন্ত জটিল একটি নকশা অনুসরণ করে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন। এরপর দুর্গের নামকরণ করেন কিল্লা আওরঙ্গবাদ। কিন্তু পরের বছর সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লি ফেরত পাঠান। এ সময় একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গ নির্মাণের কাজ থেমে যায়।

সুবেদার হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা আসেন শায়েস্তা খাঁ। শায়েস্তা খাঁর মেয়ে পরী বিবির সঙ্গে শাহজাদা আযম শাহর বিয়ে ঠিক ছিল। আযম শাহ হবু শ্বশুরকে লালবাগ দুর্গের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য অনুরোধ করেন। শায়েস্তা খাঁ দুর্গের কাজ পুনরায় শুরু করেন। কিন্তু ১৬৮৪ সালে তার অতি আদরের মেয়ে পরী বিবির আকস্মিক মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে অশুভ মনে করে দুর্গের প্রায় ১২ শতাংশ সম্পন্ন করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন শায়েস্তা খাঁ। এর পরিবর্তে নির্মাণ করেন চিত্তাকর্ষক পরী বিবির মাজার বা পরী বিবির সমাধিসৌধ। দুর্গের নিয়ম অনুযায়ী একটি ভূগর্ভস্থ পথও নির্মাণ করা হয়। আত্মরক্ষা কিংবা প্রয়োজনে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সাধারণত এ পথ ব্যবহূত হয়।

দুর্গের দক্ষিণ-পূর্বের সুড়ঙ্গটিই এ পথ। হাম্মামখানা, একটি পুকুর খনন, তিনটি সুদৃশ্য তোরণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে দুর্গ প্রাচীরের নির্দিষ্ট দূরত্বে একটি করে পলকাটা তোপ মঞ্চ নির্মাণ করে এটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ১৯১০ সালে লালবাগ দুর্গের প্রাচীর সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়।

লালবাগ কেল্লা ও বর্তমান অবস্থা

 

লালবাগ কেল্লা, ছবি : ইন্টারনেট

কেল্লার প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকে একটু সামনে গেলেই চোখে পড়ে পরী বিবির সমাধি। সমাধিসৌধের বিভিন্ন অংশ নির্মাণ করা হয় ফুলেল নকশাখচিত জালি ও ফলক দিয়ে। পরী বিবি ছাড়াও রহমত বানু নামও ছিল তার। পরী বিবির পাশে আরেকটি কবর রয়েছে। এটি শায়েস্তা খাঁর কথিত ছোট মেয়ে সামশাদ বানুর। পেছনের সামাধি হলো শায়েস্তা খাঁর বিশ্বস্ত সহ-সেনা অধিনায়ক খোদাবক্সের। অর্থাৎ মির্জা বাঙালির। এখনো দেশি-বিদেশি অগণিত মানুষ দেখতে আসেন মুঘল স্মৃতিবিজড়িত এই লালবাগ কেল্লা।