রুয়ান্ডার গণহত্যা
রুয়ান্ডার গণহত্যা

রুয়ান্ডার গণহত্যা : সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও লাশের মিছিল

আব্দুল্লাহ আল মাদানী :  রুয়ান্ডার গণহত্যা । ১৯৯৪ সালের ৭ এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাটি। মাত্র এক’শ দিনে ৫-৮ লক্ষ রুয়ান্ডান নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। হত্যাকান্ডে ব্যবহার করা হয় চাপাতি ও গুলি। এর খবর ও আলোকচিত্র আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে এলে পুরো পৃথিবীর মানুষ নড়ে চড়ে বসে।

নব্বই দশকের বিভীষিকাময় এ ঘটনার ফিরিস্তি জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ৭৮ বছর পেছনে, ১৯১৬ সালে। সে বছর বেলজিয়ান সেনাবাহিনী পূর্ব আফ্রিকার ছোট দেশ রুয়ান্ডানকে দখল করে নেয়। রুয়ান্ডার গণহত্যা ঘটার অন্যতম কারণ এটি। যদিও আগে থেকেই রুয়ান্ডার দুইটি সম্প্রদায়, তুতসি এবং হুতুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল।তবে বেলজিয়ানরা এই দ্বন্দ্বের আগুনে তুষের যোগান দেয় তুতসিদের সমর্থন দিয়ে।অপরদিকে সংখ্যার বিচারে হুতুরা ছিলো সংখ্যাগুরু। রুয়ান্ডার মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ। চাল-চলন, আচার-আচরণ এবং সংস্কৃতিতে তুতসি এবং হুতুরা একই ছিলো। একই এলাকায় থাকতো, একই ভাষায় কথা বলতো। শারীরিক গঠনটা কেবল একটু ভিন্ন ছিলো। তুতসিরা দেখতে কিছুটা লম্বা এবং চিকন গড়নের।

বেলজিয়াম ক্ষমতা দখলের পরপরই দুই সম্প্রদায়কে আলাদা করে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়পত্র তৈরি করে। জাতিগত এবং ভৌগলিক পরিচয়ে তারা অভিন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বেলজিয়ামরা তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তুতসি’ এবং ‘হুতু’ তে বিভক্ত করে। তারওপর বেলজিয়ানরা তুতসিদেরকে হুতুদের চাইতে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতো এবং বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করতো। তাদের আনুকূল্যে তুতসিরা এগিয়ে গেলেও সেটা পরে কাল হয়ে দাড়ায় তুতসিদের জন্য। তুতসিদের প্রতি হুতুদের রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা আরো বেড়ে যায়। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫৯ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। সে দাঙ্গায় হুতু-তুতসি মিলে প্রায় বিশ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এর তিন বছর পর ১৯৬২ সালে বেলজিয়ান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে হুতুরা গদি দখল করে নেয়। অনেক তুতসি প্রতিবেশি দেশ বুরুন্ডি, উগান্ডা এবং তানজানিয়ায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে, পালিয়ে যাওয়া তুতসি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু মডারেট হুতুরা সংঠিত হয়ে ‘রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট’ নামে একটা বিদ্রোহী দল গঠন করে। যার নেতৃত্বে ছিলো বর্তমান রুয়ান্ডান প্রেসিডেন্ট পল কাগামে।

রুয়ান্ডার গণহত্যা: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও লাশের মিছিল

রুয়ান্ডার গণহত্যা: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও লাশের মিছিল, ছবি : BBC

১৯৯৩ সালে বিদ্রোহী এবং সরকারী দলের মধ্যে বেশ কয়েকটা পাল্টা-পাল্টি হামলার পর একটা শান্তিচুক্তি হয়। কিন্তু সেটা খুব বেশি কাজে দেয়নি। অস্থিরতার মাত্রা একটুও কমাতে পারেনি চুক্তিটি।পরের বছরই ঘটে রুয়ান্ডার ইতিহাস তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসেরও রেকর্ড গণহত্যা।
১৯৯৪ এর ৬ই এপ্রিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানাকে বহনকারী বিমানে মিসাইল হামলা করে হত্যা করা হয়। ঐ বিমানে প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানা ছাড়াও বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট এবং কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ছিলো। স্বাভাবিকভাবেই এই হামলার দায় দেয়া হয় তুতসি বিদ্রোহীদেরকে। তারপরের দিন ৭ই এপ্রিল, হাবিয়ারিমানা সমর্থিত হুতু বাহিনী, হুতু রাজনৈতিক নেতা এবং হুতু ব্যবসায়ীসহ ৩০,০০০ সদস্যের বাহিনী তুতসিদের উপর গণহত্যা চালায়। যদিও তুতসিদের বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যার অভিযোগ সুপ্রমাণিত ছিলোনা। এই গণহত্যায় সরকারী সেনাবাহিনীও অংশ নেয়। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এবং গুলি করে তুতসিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রতিবেশীর হাতে প্রতিবেশী নিহত হয়। ভয়ে যেসব তুতসি চার্চে আশ্রয় নিয়েছিলো, হুতুদের হাত থেকে বাদ যায়নি তারাও। ৭ এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের ১৫ তারিখ পর্যন্ত চলা এই গণহত্যায় নিহত হয়েছিলো পাঁচ থেকে আট লক্ষ তুতসি। পাশাপাশি প্রায় আড়াই থেকে পাঁচ লক্ষ তুতসি নারী ধর্ষনের স্বীকার হয়েছিলো। আর হুতু সম্প্রদায়ের নিহত হয়েছিলো এক হাজারের কিছু বেশি।

হত্যাকান্ডে ব্যবহার করা হয় চাপাতি ও গুলি

হত্যাকান্ডে ব্যবহার করা হয় চাপাতি ও গুলি, ছবি : ইন্টারনেট

রুয়ান্ডার গণহত্যা পৃথিবীর প্রায় সব দেশকে স্তম্ভিত করলেও রহস্যজনকভাবে সেটা বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেউই। হুতু-তুতসির এই গৃহযুদ্ধে হুতুদের সহায়তা করেছিলো ফ্রান্স এবং আফ্রিকান কিছু দেশ। আর তুতসিদের পাশে ছিলো উগান্ডা। জাতিসংঘের ফরাসী শান্তিরক্ষী বাহিনীকে যুদ্ধ থামানোর দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হলেও তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়। অভিযোগ উঠে ফ্রান্স উল্টো এই গৃহযুদ্ধে অনুঘটকের কাজ করেছিলো। অনেক বেসামরিক হুতুকে ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনী হত্যাকান্ডে প্ররোচিত করেছে এবং সহায়তা করেছে। যদিও ফ্রান্স সরাসরি এই অভিযোগ নাকচ করে দেয়। এখানে রহস্যজনক ছিলো জাতিসংঘের ভূমিকাও। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সচিত্র প্রতিবেদন এবং আরো বহু প্রমাণ থাকা স্বত্বেও জাতিসংঘ এই হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা স্বীকৃতি দিতে ছিলো নারাজ।

আরও পড়তে পারেন – ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব : পশ্চিমা মদদে শতবছরের মুসলিম নিধন

গৃহযুদ্ধে সর্বমোট পঞ্চাশ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে

গৃহযুদ্ধে সর্বমোট পঞ্চাশ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, ছবি : BBC

১৯৫৯ এবং ১৯৯৪ সাল। এই বছরগুলো ছিলো রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধ নামক সাগরে বড় বড় দুটি স্রোত মাত্র। পরবর্তিতে এই নৃশংসতা বন্ধ হলেও ২০০৩ সাল পর্যন্ত চলা রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে সর্বমোট পঞ্চাশ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটা হুতু-তুতসিদের নিজেদের মধ্যকার দন্ধের ফলাফল মনে হলেও এর দায় কি বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো এড়াতে পারে? বেলজিয়ানদের দ্বারা রুয়ান্ডানদের স্পষ্ট দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ করে ফেলা, দুইটা ন্যাটিভ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে একটিকে অবজ্ঞা করে আরেকটিকে সকল ধরণের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দেয়া, হত্যা থামাতে আসা ফ্রান্সের হুতুদের পক্ষাবলম্বন করা এবং পরবর্তিতে জাতিসংঘের ভূমিকা? কেবল ‘ভিক্টিম রিমেম্বারেন্স ডেই’ দিয়েই কি এসব এড়াতে পারে? থাক সেসব কথা। শেষ করি জোনাথান গ্লোভারের হিউম্যানিটিঃ অ্যা মোরাল হিস্টোরি অব টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি বইয়ের একটা উদৃতি দিয়ে।

“The genocide (in Rwanda) was not a spontaneous eruption of tribal hatred, it was planned by people wanting to keep power. There was a long government-led hate campaign against the Tutsis ‘’