যৌন নিপীড়ক যখন স্বামী কিংবা বন্ধু

উমর ফাঈলাসূফ

স্ত্রীর ওপর যৌন নিপীড়কের ভূমিকায় একজন স্বামীও যে অবতীর্ণ হতে পারেন, আমাদের সমাজে বহু মানুষের কাছে সেটা হাস্যকর ঠেকতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর বহু দেশের আইনে দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর সম্মতির বাইরে স্বামী যদি তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, সেক্ষেত্রে স্বামীর বিরুদ্ধে অনায়াসেই ধর্ষণের মামলা দায়ের করা যেতে পারে।

আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণায় ‘ধর্ষণ’ বলতে আমরা সচরাচর ঘরের বাইরে ‘অচেনা ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ’ বুঝে থাকি। নির্জন রাস্তায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে ওঁত পেতে থাকা ধর্ষকের অপকর্মের কথা শুনে শুনেই হয়ত আমরা বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু ধর্ষণ যে সবসময় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দ্বারাই সংঘটিত হতে হবে, ব্যাপারটি কিন্তু তা নয়। ধর্ষণ বলতে শুধু অচেনা ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণই বুঝায় না, বরং ঘরের ভেতরে নিরাপদ পরিবেশে চেনা ব্যক্তিদের দ্বারাও একইভাবে ধর্ষিত হতে পারে নারীরা। এখানে আমরা সেরকম কিছু অপরাধ ও তার শাস্তির বিধান সম্পর্কে জানব, যা ধর্ষণের প্রচলিত ধারণার থেকে কিছুটা আলাদা এবং যেখানে অপরাধী নারীর পূর্ব পরিচিত, কখনো আত্মীয়, কখনো বন্ধু, এমনকি কখনো নিজের স্বামী।

প্রথমে আমরা দেখে নেই দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের ব্যাপারে কী বলা হয়েছে। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে দন্ড বিধির ধারা (৩৭৫) তে এবং পরবর্তী ধারায় বর্ণিত আছে শাস্তির বিধান। তবে বর্তমানে ধর্ষণের শাস্তির ক্ষেত্রে দন্ড বিধির ধারাটি (৩৭৬) প্রচলিত নেই, এটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ এর ধারা ৯ ধারা দ্বারা। ১৮৬৭ সালের দন্ড বিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের মূল সংজ্ঞাটি দেয়া হয়েছে এভাবে, ‘যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক, (১) যা নারীর ইচ্ছা বা সম্মতি ব্যতিরেকে হয়েছে, অথবা, (২) জখম বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক করা হয়েছে, কিংবা (৩) প্রতারণার মাধ্যমে সম্মতি নেয়া হয়েছে তার প্রতিটিই ধর্ষণের আওতায় পড়বে। এছাড়া মেয়েটির বয়স যদি ১৪ বছরের নিচে হয়, সে ক্ষেত্রে সম্মতি থাকুক আর না থাকুক, শারীরিক সম্পর্ক মাত্রই আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।

বৈবাহিক ধর্ষণ: উপরে প্রদত্ত সংজ্ঞাতে আমরা দেখেছি ধর্ষণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা বা শর্ত বর্ণিত হয়েছে, কেবল সেই কাজগুলো সংঘটিত করলেই আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তিকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে। কিন্তু এই কাজগুলো যদি কোনো স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর ওপর সংঘটিত হয়, উদাহরণস্বরূপ, স্বামী যদি প্রহার বা অন্যান্য শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে স্ত্রীকে সহবাসে বাধ্য করে, তখন তাকে বলা হয় ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’। আমরা একে ‘স্ত্রী-ধর্ষণ’ও বলতে পারি। পাশ্চাত্যে এটি ‘ম্যারিটাল রেইপ’ হিসেবে পরিচিত।

আমাদের দেশের প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিবাহের পর স্ত্রীর ইচ্ছা বা সম্মতি ছাড়া অথবা জোরপূর্বক যেভাবেই সহবাস করা হোক, তাকে ধর্ষণ বলে মনে করা হয় না। কিন্তু ধর্ষণ যেভাবে নারী নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ঘরের বাইরে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, ঠিক সেভাবে স্বামী কর্তৃক জোরপূর্বক সহবাস ঘরের ভেতরেও নারীদেরকে সমানভাবে নিপীড়নের মুখোমুখি করছে, এই অভিযোগের বিপরীতে সত্তরের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রথমবারের মতো উৎপত্তি হয়েছিলো বৈবাহিক ধর্ষণের ধারণার। সেখান থেকে ধর্ষণের এই বিস্তৃত সংজ্ঞা পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশের আইনে গৃহীত হয়েছে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে ধর্ষণজনিত যত অভিযোগ সারা বছর নথিভুক্ত করা হয়, তার ভেতর প্রায় ৭০ শতাংশই বৈবাহিক ধর্ষণজনিত অপরাধ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের আইনে বৈবাহিক ধর্ষণকে এখনো সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সেখানে বেশ পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে, উপরিউক্ত সংজ্ঞা কোনোভাবেই পূর্ণবয়স্কা বিবাহিত স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। প্রায়শই অভিযোগ করা হয় যে, এর মাধ্যমে আইনে বিবাহকে ধর্ষণের অভিযোগ এড়ানোর একটা উপায় হিসেবে রেখে দেয়া হয়েছে। নির্যাতনের উদ্দেশ্যে যখন কোনো নারীকে সহবাসে বাধ্য করা হয়, তখন ‘বৈবাহিক সম্পর্ক’ এর অজুহাত হতে পারে না। তবে এ ধরনের অপরাধকে নিরুৎসাহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত আইনগতভাবে একে সংজ্ঞায়িত করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ সরকারের তরফ থেকে নেয়া হয়নি।

অভিসার ধর্ষণ: যখন কোনো নারী এমন পুরুষের দ্বারা ধর্ষিত হয়, যার সঙ্গে সে সামাজিকভাবে পরিচিত, তখন তাকে বলা হয় অভিসার ধর্ষণ (ডেইট রেইপ)। প্রেমিক কর্তৃক ধর্ষণ বুঝাতে সচরাচর এই শব্দটি ব্যাবহার করা হয়, তবে এখানে উল্লেখ্য যে, ‘অভিসার’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও ধর্ষকের সঙ্গে ভিকটিমের প্রেমের সম্পর্ক থাকাতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বন্ধু, সহকর্মী বা পূর্বপরিচিত কেউ যদি ব্লাকমেইলের মাধ্যমে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে সেটিও অভিসার ধর্ষণের আওতায় পড়বে।

দেশের আইনে প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী অভিসার ধর্ষণ প্রচলিত ধর্ষণের আওতার ভেতরে পড়ে, তাই ধর্ষণের শাস্তির বিধানসমূহ অভিসার ধর্ষণের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ৯(৩) অনুযায়ী, ধর্ষণজনিত অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও জরিমানা। আর ধর্ষণজনিত কারণে যদি নারী বা শিশুর মৃত্যু হয় তাহলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দিতে হবেন এবং সঙ্গে অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদন্ড গুনতে হবে। আর যদি ধর্ষণ না হয়ে শুধু যৌনপীড়ন বা শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়, সে ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ হতে পারে তিন থেকে দশ বছর মেয়াদে কারাদন্ড এবং সমপরিমাণ অর্থদন্ড। এ সকল মামলার ক্ষেত্রে বিচারকার্য ১৯০ দিনের ভেতর শেষ করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈবাহিক ও অভিসার ধর্ষণ দুটোই বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে ঘরের ভেতর নারী নিপীড়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই আইনে ধর্ষণের প্রদত্ত সংজ্ঞাকে সংশোধন করে বৈবাহিক ও অভিসার ধর্ষণের সংযুক্তি এবং শাস্তির ব্যাপারে যুগোপযোগী ধারা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।