মানুষ মারার এমন কৌশল বন্ধ হোক!

নাদিম মাহমুদ

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গত ৭ এপ্রিল জাপান সরকার সরকার দেশটির মোট জিডিপির ২০ শতাংশ (১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দেয়। এই বরাদ্ধকৃত অর্থের অন্যতম একটি অংশ ব্যয় হবে ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য কার্যকরী অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ ‘অ্যাভিগান’ তৈরিতে। প্রায় ২০ লাখ অ্যাভিগান ট্যাবলেট উৎপাদনের ঘোষণা সেদিনই দেয়া হয়।

ওইদিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যেসব দেশ কভিড-১৯ আক্রান্ত সেই দেশে অ্যাভিগান বিনামূল্য সরকার দেবে।

এরই ধারাবাহিকতায় সরকার সিদ্ধান্ত নেন যে অন্তত ২০ টি দেশে প্রাথমিকভাবে ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে অ্যাভিগান সরবরাহ করা হবে। এর সাথে আরো ১০ লাখ মার্কিন ডলার ওই দেশগুলোতে দেয়া হবে।

বিষয়টি অদ্ভুত শোনালেও সত্য যে, জাপান সরকার তাদের মানবিক সাহায্যে তহবিলের অংশ হিসেবে, মানবিক বিপর্যয়ে অ্যাভিগান সারা বিশ্বে ‘আপাতত’ বিনামূল্যে সরবরাহ করবে বলে ঘোষণা দেয়। অ্যাভিগানের কোন বাজার মূল্য নির্ধারণ হয়নি। জাপান সরকার সিদ্দান্ত নেন যে, তাদের অনুমতি ব্যতিত অ্যাভিগান তথা বিশ্বের কোন দেশেই বিক্রি কিংবা সরবরাহ করা হবে না বলে ২৭ মার্চ অ্যাভিগানের প্রস্তুতকারক কোম্পানি ফুজিফিল্ম একটি বিবৃতি দেয়।

এরই অংশ হিসেবে ফুজিফিল্মের তয়োমা ফার্মাসিউটিক্যালস ইতিমধ্যে অ্যাভিগানের উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল পজিটিভ হওয়ার সাথে সাথে জাপান সরকার ঔষধটি বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করবে।

মানুষের জীবন বাঁচাতে জাপান সরকার যখন উদারতা দেখাচ্ছে, বিনামূল্যে ঔষধটি প্রদানের অঙ্গিকার করছে, ঠিক তখনই আমাদের দেশে একদল মানুষ এই ঔষধটি বাজারে বিক্রির জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ইনবক্সে পাওয়া একটি ছবিতে দেখলাম ‘ফেভিপিরা ২০০’ নামের একটি ঔষধের প্যাকেটে মূল্য ৮০০০ টাকা রাখা হয়েছে। মানুষের পকেট কাটার এমন প্রচারণা ধিক্কারযোগ্য।

যে ঔষধের প্যারেন্ট কোম্পানিই বিক্রি করার অনুমতি পায়নি, যে ঔষধটি এখনো ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে উত্তীর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, সেই ঔষধ নিয়ে ব্যবসা করার প্রায়তারা নোংরামি ছাড়া কিছুই নয়। মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করার অধিকার তারা কোথায় থেকে পেল, তা আমার বোধগম্য নয়।

২০১৪ সালের মার্চে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কেবল জরুরি ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণে ঔষধটি ব্যবহার করা যাবে বলে অনুমোদন দিলেও সেই সময় তারা অ্যাভিগানের তিনটি ঝুঁকির কথা উল্লখ করেন, এগুলোর মধ্যে একটি গর্ভবর্তী মায়েদের ঝুঁকি আর দ্বিতীয়ত পুরুষের সিমেনের মান খারাপ হয়ে যাওয়া।

এইসব ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে, অ্যাভিগান কভিড-১৯ মাইল্ড উপসর্গধারীদের সেবনের পরামর্শ আসছে।

ফ্যাভিপিরাভিরের এই ঔষধটি যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশে বাজারে বিক্রি হতে শুরু করে, তাহলে সেটি হবে মারাত্মক ঝুঁকি। স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত ঔষধটির এখনো কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল নেই, কিংবা এর গুণগত মানের সাথে অ্যাভিগানের সম্পর্ক কেমন তাও জানা নেই।

সেটাই যদি হতো, তাহলে অ্যাভিগানের পরিবর্তে অন্য কোম্পানির ঔষধ নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সুযোগ মেলতো। বিশ্বের বাঘা বাঘা ঔষধ কোম্পানি, ফুজিফিল্মের দিকে না তাকিয়ে উৎপাদন শুরু করে দিতো।

তাই বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ করবো, মানবিক এই সংকটকে পুঁজি করে যারা ব্যবসায় নাসছে তাদের বিষয়ে সতর্ক হোন। কোটি কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়ে ঔষধ কেনে জনগণকে দেয়ার আগে এই ঔষধটির কার্যকারিতা নিয়ে ভাল করে পরীক্ষা করুন।

আমি আগেও বলেছি, আবারও বলেছি, কূটনৈতিক তৎপরতায় আপনারা অনায়াসে অ্যাভিগান বাংলাদেশে পেতে পারে। মুষ্টিময় কিছু ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য, গোটা বাংলাদেশের বিপদ যেন না হয়। দয়া করে, মানুষের এই বিপদময় মুহুর্তে কাউকে জীবন নিয়ে খেলা করতে দিবেন না।

লেখক : পিএইচ ডি ছাত্র, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

(লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া)