ভোগান্তিতে নতুন নাট্যনির্মাতারা

নাটক পরিচালনায় এসে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নতুন নির্মাতারা। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসে তারা দুচোখে অন্ধকার দেখেন। সহযোগিতার পরিবর্তে সইতে হয় বঞ্চনা। কেউ কেউ দুয়েকটি নাটক নির্মাণের পর নিরাশ হয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন এই পথ। যারা টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, নানা সমস্যায় কাটছে তাদের দিন। প্রযোজক না পাওয়া, বাজেট সংকট, শিল্পীদের শিডিউল নিয়ে তালবাহানা, সিডিউল ফাঁসানো, নতুন বলে পাত্তা না পাওয়া, লোকসানে নাটক প্রচারসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয় নতুন নির্মাতাদের।

জনপ্রিয় শিল্পীদের অনেকেই নবীন নির্মাতাদের সহজে শিডিউল দিতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার নাটক নির্মাণের পর টিভি চ্যানেলগুলোর দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে অনেক নবীন নির্মাতাই ক্লান্ত। চ্যানেল কৃর্তপক্ষের স্ক্রিপ্টে কাজ করার পরও প্রচারে না আসা তাদের হতাশ করে। টিভিতে নিজের সৃষ্টি দেখার জন্য এসব নির্মাতার কেউ কেউ লোকসান দিয়ে টিভি চ্যানেলের কাছে নাটক বিক্রি করেন। এদিকে নাটক প্রচারের পরে আবার চ্যানেলগুলো সঠিক সময়ে বিল দেয় না বলেও শোনা যায় নির্মাতাদের কাছ থেকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যকলা বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করে নির্মাণে এসেছেন নতুন নির্মাতা নবাব নাসির। তার নির্মাণে একাধিক নাটক প্রচার হয়েছে টিভি চ্যানেলে। অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘নতুন বলে কেউ পাত্তাই দিতে চান না। অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। কিছু দিন আগে একটি মিউজিক ভিডিওর জন্য অনেক কষ্টের পর পরিচিত দুইজন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে চূড়ান্ত করি। শুটিংয়ের দিন নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর অভিনেত্রী সেটে আসেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় বিশ্রামের পর জানান স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন করতে হবে। কলকাতা থেকে আসা কোরিওগ্রাফার তার পছন্দ নয়। তাই তার সঙ্গে সে কাজ করবেন না। অনেক বোঝানোর পরেও কাজ না হওয়াতে কোরিওগ্রাফার ছাড়াই কাজ শুরু করি। স্ক্রিপ্টও কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। একদিনে শুটিং শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও সম্ভব হয় না। দ্বিতীয় দিন ফের শুটিং করতে হয়। দ্বিতীয় দিন সেটে আসার কথা ছিল সকাল ১০টায় কিন্তু ওই অভিনেত্রী আসেন সন্ধ্যার আগে। বাধ্য হয়ে কয়েকটি সিকু্যয়েন্স বাদ দিয়ে কাজটি শেষ করতে হয়। ঈদের আগে প্রতিষ্ঠিত একটি চ্যানেলের এক খন্ড নাটক করেছিলাম। তাদেরই স্ক্রিপ্টে নাটকটি নিমাণ করা হয়। নাটকটি প্রচারের জন্য তারা কথাও দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় নাটকটি জমা নিয়েও ওই চ্যানেল প্রচার করেননি। বাধ্য হয়ে আমি অন্য একটি চ্যানেলে ৩০ হাজার টাকা লোকসানে নাটকটি ছেড়ে দিই। নতুন এ নির্মাতা জানান, নতুনরা তাদের নাটক চ্যানেলে প্রচার করতে পারবে কি না তাতে ভরসা পান না প্রযোজকরা। বরাবরই নতুনদের দিয়ে নাটক করাতে আগ্রহী হন না প্রযোজকরা। নবাব নাসিরের মতো এমন হতাশা ও ক্ষোভের কথা জানান আকাশ নিবির, সাজ্জাদ হোসেন, মাকসুদুল হক ইমু, ইমতিয়াজ মেহেদী হাসানসহ অনেক নতুন নাট্যনির্মাতা।

এ নিয়ে বিশিষ্ট অভিনেতা ড. ইনামুল হক বলেন, নতুন নির্মাতাদের হতাশার কথা আমিও জেনেছি। তাদের সঙ্গে নাট্যসংশ্লিষ্ট অনেকেই খারাপ ব্যবহার করেন। এক প্রকার নির্যাতনের শিকার হন। এই সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে এজেন্সি ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর কারণে। টিভি চ্যানেলগুলোও নতুনদের সঠিক বাজেট দেয় না।

অনেক সময় দেখা যায়, নতুন নির্মাতাদের কেউ কেউ নিজের পকেটের টাকা খরচ করেও নাটক নির্মাণ করছে। নতুনরা সহযোগিতা ও উৎসাহ না পেলে এগিয়ে আসবে কিভাবে? সবার উচিত নতুনদের সহযোগিতা করা। কাজের সুযোগ করে দেয়া। তারা পারে কিনা তা দেখা। অন্যদিকে নতুন নির্মাতাদেরও ভালো কিছু করে প্রমাণ করতে হবে তোমরাও পার। প্রত্যেককেই শুরুর দিকে কষ্ট করতে হয়। কষ্ট করেই প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। হতাশায় না ভোগে পরিশ্রম করতে হবে। নিজেদের বেকগ্রাউন্ড জানাতে হবে, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের সহকারী হিসেবে কাজ করতে হবে। নিজেকের স্মার্ট হতে হবে। কথাবার্তা চালচলনেও স্মার্টনেস হতে হবে। যাতে করে অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক কিংবা চ্যানেল কর্তৃপক্ষ মনে করেন নতুন হলেও একে দিয়ে কাজ হবে। তাদের মনে ভরসা তৈরি করতে হবে।’

নাটক সংশ্লিষ্টরা বলেন, নাটকের বাজেট সংকট, জনপ্রিয় শিল্পীদের শিডিউল সমস্যা, চ্যানেলগুলোর অনিয়ম ও এজেন্সি এবং বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর শিল্পী নির্বাচন দীর্ঘদিন থেকে দেখা যাচ্ছে। এভাবে কোনো একটি ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না। নাটকের সংগঠন ও টিভি চ্যানেলগুলোকে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রম্নত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।