ব্ল্যাকহোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়, ছবি : ইন্টারনেট

ব্ল্যাকহোল: বিজ্ঞানীদের কাল্পনিক তত্ব নাকি বাস্তবতা?

 তানজীম হাসান নিবির 

মহাজাগতিক বস্তুসমূহের এক অন্যতম বিস্ময় ব্ল্যাকহোল। আমাদের সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে ব্ল্যাকহোল কিছুতেই অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কারণ এমন কিছুর অস্তিত্ব মানুষ কখনোই সরাসরি প্রত্যক্ষ করেনি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ব্ল্যাকহোল, কাল্পনিক তত্ব নাকি বাস্তবতা?

 

ব্ল্যাকহোল অদ্ভুত ও বিস্ময়কর

 

ব্ল্যাকহোল মহাকাশের এক অদ্ভুত বিস্ময়কর উপাদান। বাংলায় একে বলা হয় কৃষ্ণগহ্বর। ব্ল্যাকহোল মহাকাশের এমন এক অঞ্চল যেখানে মহাকর্ষ বল অত্যন্ত প্রবল। আমরা জানি মহাবিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম সত্তা আলো। সেই আলো পর্যন্ত ব্ল্যাকহোলের পথ ছিন্ন করতে পারে না। এরফলে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো আলো এসে আমাদের চোখে পড়া সম্ভব না। তাই ব্ল্যাকহোল কখনো দেখাও সম্ভব নয়। ব্ল্যাকহোলের নামে যা দেখা সম্ভব তা হলো এর চারদিকের সীমানা। ব্ল্যাকহোলের সীমানাকে বলা হয় Event Horizon বা ঘটনা দিগন্ত। কোনো বস্তু এই সীমানা অতিক্রম করার সাথে সাথে তা ব্ল্যাকহোলের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। ঘটনা দিগন্তের মধ্যবর্তী স্থান থেকে কোনো বস্তু কখনো ফিরে আসতে পারে না।

 

যেভাবে ব্ল্যাকহোলের ধারণা এলো

 

বিংশ শতক পর্যন্ত ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। ১৯১৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ কার্ল শোয়ার্জশিল্ড আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ব ব্যবহার করে হিসাব করেন যেকোনো ঘর ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে যদি তাকে যথেষ্ট সংকুচিত করা যায়। এই তত্ত্বের মাধ্যমেই ব্ল্যাকহোলের ধারণা মানুষের সামনে আসে।

দীর্ঘদিন এই আলোচনা শুধু তত্ত্বের পর্যায়ে ছিল। ১৯৭১ সালে এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ আমাদের সামনে হাজির হয়। তৎকালীন জ্যোতির্বিদেরা Constellation Cygnus বা বক মণ্ডল পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ব্ল্যাকহোল আবিষ্কার করেন। মহাবিশ্বে এত বিপুল পরিমাণ ব্ল্যাকহোল ছড়িয়ে আছে যা বিজ্ঞানীদের ধারণারও বাইরে!

 

আরও পড়তে পারেন: সমাজতান্ত্রিক চীন ও দৈব্য আকৃতির অর্থনীতির রহস্য

 

বিভিন্ন ধরনের ব্ল্যাকহোল

 

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের ব্ল্যাকহোলের ধারণা প্রদান করেছেন। স্টেলার ব্ল্যাকহোল এবং সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল এরমধ্যে সবচেয়ে পরিচিত। যখন অতি বৃহৎ তারকার মৃত্যু ঘটে তখন তা স্টেলার ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়। এরা সাধারণত আমাদের সূর্যের ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বড় হয়ে থাকে। মহাবিশ্বে এরকম বহু ব্ল্যাকহোল বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। শুধুমাত্র Milky Way Galaxy বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই ১০ লক্ষের বেশি স্টেলার ব্ল্যাকহোল রয়েছে।

ধারনা করা হয় আমাদের সৌরজগতেও একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল রয়েছে, ছবি : নাসা

ধারনা করা হয় আমাদের সৌরজগতেও একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল রয়েছে, ছবি : নাসা

সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল

 

এখন বলা যাক সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের বিষয়ে। এর নাম থেকেই প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। এরা আকারে অতি বৃহৎ্। একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল আমাদের সূর্যের চেয়ে কয়েক বিলিয়ন গুণ বড় হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এদের সম্পর্কে শুধু ধারণাই করতে পারেন। এদরে সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান মানুষের নেই। তবে প্রত্যেক ছায়াপথের কেন্দ্রে অন্তত একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল রয়েছে। এমনকি আমরা যে ছায়াপথের বাসিন্দা সেই আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রেও সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব রয়েছে। আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের নাম Sagittarius A। ধারণা করা হয় এই কৃষ্ণগহ্বরের ভর আমাদের সূর্যের ভরের ৪০ লক্ষ গুণ বেশি। ব্যাস আমাদের পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের সমান।

 

ব্ল্যাকহোল সম্পূর্ণ অদৃশ্য

 

ব্ল্যাকহোলের সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো এগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য! এখনো পর্যন্ত যতগুলো চিত্র বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন তাঁর সবই বিজ্ঞানীদের কল্পনা আর শিল্পীদের বিশেষ দক্ষতায় তৈরি করা। অতিকায় এ মহাজাগতিক বস্তু চোখে দেখা না গেলেও এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই্। কারণ ব্ল্যাকহোলের আশেপাশের মহাজাগতিক বস্তুসমূহ থেকে এর অস্তিত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্ল্যাকহোলের প্রতিবেশী মহাজাগতিক বস্তুসমূহের ওপর তাদের প্রভাব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে গবেষণার উপাত্ত সংগ্রহ করেন। এমনই একটি আলামত হলো Accretion Disk।

Accretion Disk হলো বিভিন্ন ধরনের নাক্ষত্রিক ধ্বংসাবশেষ যা ব্ল্যাকহোলের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে এক ধরনের বলয় তৈরি করে। এরা সেই সমস্ত গ্যাস ও মহাজাগতিক বর্জ্য যা অল্পের জন্য ব্ল্যাকহোল গ্রাস করে নিতে পারেনি। এরা ব্ল্যাকহোলের ভেতরেও যায়নি আবার ব্ল্যাকহোলের টান অস্বীকারও করতে পারেনি।

Super Massive Blackhole এর আরেকটি শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হলো Quasar। Quasar কে আপাত নক্ষত্রও বলা হযে থাকে। এরা অতি উজ্জ্বল তড়িৎ চৌম্বকীয় শক্তি। এদের উজ্জ্বলতা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সমান কয়েক হাজার ছায়াপথের উজ্জ্বলতার চেয়েও বেশি। উল্লেখ্য যে ১০০ বছরের বেশি সময় নিয়ে ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করা হলেও এর প্রকৃত কোনো ছবি বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না।

 

 আরও পড়তে পারেন:  নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত: রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বিশ্লেষণ

 

অবশেষে এলো মাহেন্দ্রক্ষণ

 

২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল মহাকাশ গবেষণার এক অবিস্মরণীয় দিন। কারণ এদিন প্রথমবারের মতো কোনো কৃষ্ঞগহ্বরের ছবি তোলা সম্ভব হয়।     এই সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলটি অতি বৃহৎ ছায়াপথ Messier 87 এর কেন্দ্রে অবস্থিত। এর অধিক উজ্জ্বল অংশের আলো আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং এর অন্ধকার অংশ আমাদের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এই আলোকোজ্জ্বল অংশে রয়েছে বিশেষ ধরনের আয়নিক গ্যাস। যাকে বলে প্লাজমা। একে পদার্থের চতুর্থ অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল অত্যন্ত সক্রিয়। অর্থাৎ এই ব্ল্যাকহোল তার Accretion Disk থেকে অসংখ্য মহাজাগতিক বস্তু গ্রাস করে নিচ্ছে। এর Quasar কমপক্ষে ৫০০০ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর একটা পাশ সরাসরি আমাদের দিকে তাক করে আছে। সেজন্য আমরা এর আলোর গতিপথ দেখতে পাচ্ছি না। প্রায় ২০০ জন বিজ্ঞানীর ২০ বছরের নিরলস পরিশ্রমের পর এর দেখা পেয়েছেন।

 

দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের এই ছবিটি তুলেছেন, ছবি : ইন্টারনেট

দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের এই ছবিটি তুলেছেন, ছবি : ইন্টারনেট

কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ছবি অস্পষ্ট কেন?

 

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত চেষ্টার পরেও ব্ল্যাকহোলের ছবি অস্পষ্ট কেন? এর কারণ অতিবৃহৎ এই ব্ল্যাকহোল আমাদের থেকে বহু দূরে অবস্থিত। এর ভর আমাদের সূর্যের চেয়ে সাড়ে ৬ বিলিয়ন গুণ (প্রায় ৬৫০ কোটি গুণ) বেশি এবং অন্ধকার অংশ আমাদের সম্পূর্ণ সৌরজগতের সমান!

ব্ল্যাকহোলটি এত বড় আকৃতির বস্তু হলেও এর অবস্থান আমাদের থেকে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। এ কারণে ছবিটি এত ছোট আর অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এমনকি এই অস্পষ্ট ছবি দেখার জন্যও আমাদের পৃথিবীর সমান একটি টেলিস্কোপের দরকার ছিল! মানুষের পক্ষে যেমন পৃথিবীর সমান এত বড় টেলিস্কোপ বানানো সম্ভব নয় তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ৮টি টেলিস্কোপের সাহায্যে পৃথিবীর সমান এক টেলিস্কোপের ছদ্মবেশ ধারণ করা হয়েছে। এই টেলিস্কোপের নাম দেওয়া হয়েছে Event Horizon Telescope।

 

টেলিস্কোপগুলো প্রতিনিয়ত নিজেদের সমৃদ্ধ তথ্য জোড়া দিয়ে ছবি তুলতে সক্ষম হয়। Event Horizon Telescope এর সাহায্যে Messier 87 ছায়াপথের ব্ল্যাকহোল ছাড়াও আমাদের নিজেদের ছায়াপথের ব্ল্যাকহোল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু নানান জটিলতার কারণে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলো এখনো সম্ভব হয়নি। সেজন্য বিজ্ঞানীদের অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু সময়।

প্রায় ৪০০ বছর আগে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও সর্বপ্রথম টেলিস্কোপ আবিষ্কারের মাধ্যমে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।

তারপর থেকে জ্যোতির্বিদ্যার বহু অগ্রগতি হলেও মহাকাশের অতি সামান্য রহস্যই আমরা উদঘাটন করতে পেরেছি। অসীম এই অজানাকে জানার যাত্রায় যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ যে কয়টি যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে হাবল টেলিস্কোপ তার মধ্যে অন্যতম।

 

-নাসার ওয়েব সাইট ও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে