বোটানিক্যাল গার্ডেন
বোটানিক্যাল গার্ডেন

বোটানিক্যাল গার্ডেন : বাংলাদেশের জীবন্ত উদ্ভিদের একমাত্র সংগ্রহশালা

রিয়াজ মাহমুদ : বোটানিক্যাল গার্ডেন বা জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেশি-বিদেশি, দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় এক হাজার প্রজাতির প্রায় ৬৮ হাজার উদ্ভিদ রয়েছে। রয়েছে ৩’শ প্রজাতির গোলাপ, ক্যাকটাস, অর্কিড, আমাজান লিলি, গর্জন, আকাশমণি, পাইন, বাঁশ, পাম, মৌসুমি এবং ঔষধি গাছ। সঙ্গে বনসাইয়ের বিপুল সমারোহ। তাই বোটানিক্যাল গার্ডেন বাংলাদেশের একমাত্র জীবন্ত উদ্ভিদ সংগ্রহশালা হিসাবে পরিচিত।

রাজধানী শহর ঢাকার মিরপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেন স্থাপনের কাজ শুরু হয় ১৯৬২ সালে। সত্তরের দশকে এতে বিদেশি গাছের বীজ, চারা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়। বিচিত্র সব শাপলা, পদ্ম পুকুর, ভেষজ উদ্ভিদের বাগান, বাঁশবাগান, গোলাপ বাগান ইত্যাদি স্থাপনার কাজসহ অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহ করা হয়।

বর্তমানে ৮৪.২ হেক্টর (২০৮ একর) জায়গায় বিরল প্রজাতির গাছপালা নিয়ে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন) এখন একটি জীবন্ত সংগ্রহশালা। এ ছাড়া এই উদ্ভিদ উদ্যানে প্রায় ৬০ প্রজাতির বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের সংগ্রহ রয়েছে। এদের মধ্যে বাঁশপাতা, চন্দন, রাজা অশোক, ক্যামেলিয়া, আমাজান লিলি, আগর, রামবুটাম, তমাল, ভূর্জপত্র, উদল, স্টারকুলিয়া, ক্যাকটাস, অর্কিড অন্যতম।

বোটানিক্যাল গার্ডেন এ আঁকাবাঁকা কৃত্রিম লেক সৃষ্টি করা হয়েছে। লেকের মাঝখানে রয়েছে কৃত্রিম দ্বীপ, তাতে বাহারি উদ্ভিদ বাগান তৈরি করা হয়েছে। শীতকালে বোটানিক্যাল গার্ডেনে দেখতে পাওয়া যায় শ’ শ’ অতিথি পাখি।

২০৮ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা উদ্যানের সীমানা প্রাচীর সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। এতে অর্কিড ঘর, ক্যাকটাস ঘর, গোলাপ বাগান, মৌসুমি ফুলের বাগান, জলাশয়, পদ্মপুকুর, শাপলা পুকুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৬৮ হাজার উদ্ভিদের বাগান।

বোটানিক্যাল গার্ডেন বাংলাদেশের একমাত্র জীবন্ত উদ্ভিদ সংগ্রহশালা

বোটানিক্যাল গার্ডেন বাংলাদেশের একমাত্র জীবন্ত উদ্ভিদ সংগ্রহশালা, ছবি : ইন্টারনেট

আরও পড়তে পারেন-কাপ্তাই লেক: দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট লেক

বর্তমানে ১৩৪ উদ্ভিদ পরিবারভুক্ত ১১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে উদ্যানে। এগুলোর মধ্যে ৩০৬ প্রজাতির ৩৩ হাজার ৪১৩টি বৃক্ষ, ২০১ প্রজাতির ১৩ হাজার ৯২টি গুল্ম, ৬২ প্রজাতির ১ হাজার ১৯০টি লতা জাতীয় গাছ আছে। অস্ট্রেলিয়ার সিলভার ওক, জাকারান্ডা ও ট্যাবে বুইয়া, জাপানের কর্পূর, মালয়েশিয়ার ওয়েল পাম, থাইল্যান্ডের রামবুতাম তো আছেই। পাশাপাশি বোটানিক্যাল গার্ডেন- এ দেখা যায় কর্পূর, ম্যাগনোলিয়া, শ্বেত চন্দন, গিলরিসিডিয়া, ফার্ন কড়ই, তুন, কেশিয়া নড়ুসা, ট্যাবেবুইয়া ও চেরি গাছ। আরও দেখা যায় ওল্ডম্যান, ফিশহুক ক্যাকটাস, ম্যামিলারিয়া, ক্ষেপালিয়া, মেলো ক্যাকটাস, গোল্ডেন ব্যারেল, সিরিয়াম হেক্সোজেনাস, র্যাট টেইল, আপাংসিয়া সিডাম, হাওয়ার্থিয়া, পিকটোরিয়া রাখা হয়েছে স্বচ্ছ কাচঘরে। উদ্যানের গোলাপ বাগানের ভেতর শান বাঁধানো জলাধারে আছে ব্রাজিলের জলজ উদ্ভিদ আমাজান লিলি।

৫৭টি সেকশনে বিভক্ত এ উদ্যানে আছে বিচিত্র প্রজাতির উদ্ভিদ। উদ্যানের মধ্যে রয়েছে ৩ দশমিক ৫ একর এলাকায় ২০০ প্রজাতির গোলাপের বাগান, পাইন বাগান, দেশি এবং বিদেশি প্রজাতির ফলগাছের বাগান। বাঁশ বাগানে আছে ২২ প্রজাতির বাঁশ। আছে পামগাছের বাগান, মৌসুমি বাগান, ওষুধি গাছের বাগান, পদ্মপুকুর, শাপলা পুকুর, ক্যাকটাস হাউসে সংরক্ষিত আছে ৪০ প্রজাতির ক্যাকটাস, দুর্লভ প্রজাতির অর্কিড হাউস এবং ঘরে পালনযোগ্য গাছের জন্য আছে নেট হাউস। এরমধ্যে ডালিয়া, মর্নিং গ্লোরিসহ ৫২ প্রজাতির বিদেশি ফুল ছাড়া বাগানের চারপাশে আঁকাবাঁকা কৃত্রিম ক্যানেল যেন এ বাগানের সৌন্দর্য আরও বর্ধিত করেছে।

আছে নান্দনিক এক উদ্ভিদের জাত। নাম নাগলিঙ্গম। এর পরাগচক্র দেখতে সাপের মতো। অন্যরা ফোটে গাছের শাখায়, আর এই ফুল কান্ড ফুঁড়ে ছড়ার মতো বের হয়। বর্ষায় ফুলভর্তি গাছ দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে, কেউ বুঝি গাছের কান্ড ফুটো করে ফুলগুলোকে গেঁথে দিয়েছেন।
দ্বিজেন শর্মা তার শ্যামলী নিসর্গ বইয়ে লিখেছেন, আপনি বর্ণে, গন্ধে, বিন্যাসে অবশ্যই মুগ্ধ হবেন। তবে ফলের মতোই নাগলিঙ্গম গাছটির উচ্চতা ৩০ থেকে ৩৫ ফুট। সেখান থেকে আসে ঝাঁজালো গন্ধ। ফ্রান্সের উদ্ভিদবিদ জে এফ আবলেট ১৭৫৫ সালে এ গাছের বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেন। উদ্ভিদবিদরা বলেন, নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়।

আছে দুষ্প্রাপ্য ও বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহ

আছে দুষ্প্রাপ্য ও বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহ, ছবি : ইন্টারনেট

নাগলিঙ্গমের ভেষজ গুণও অনন্য। ফুল, পাতা ও বাকলের নির্যাস থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি হয়। অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহার করা হয় এর নির্যাস। এই গাছ থেকে তৈরি ওষুধ পেটের পীড়া দূর করে। পাতার রস ত্বকের নানা সমস্যায় কাজ দেয়। ম্যালেরিয়া রোগ নিরাময়ে নাগলিঙ্গমের পাতার রস ব্যবহূত হয়।

বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম বেশ দুর্লভ। ঢাকায় জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ছাড়াও রমনা উদ্যান, কার্জন হল, বলধা গার্ডেন, নট’র ডেম কলেজ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট ও হবিগঞ্জে দু-একটি গাছ এখনো দেখতে পাওয়া যায়।