বাংলাদেশের রিকশা
বাংলাদেশের রিকশা, ছবি : গেট্টি ইমেজ

বাংলাদেশের রিকশা : ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় একটি বাহন

টি. চৌধুরী : সব দেশেই নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী বাহন থাকে। এর মধ্যে দিয়ে একটি দেশের দীর্ঘদিনের বয়ে চলা ঐহিত্য ও আভিজ্যাতের প্রকাশ পায়। স্থানীয়দের মধ্যেও বাহনটি ব্যবহারে থাকে যথেষ্ট আগ্রহ। সেই মানদন্ডে বাংলাদেশের রিকশা অন্যসব বাহন থেকে অনেকটাই এগিয়ে।তিন চাকার এই বাহনে চড়ে প্রতিদিনই জন্ম নেয় অসংখ্যা প্রেমনামা।শুধু কি তাই? রিকশা চালিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষের সংসারও চলে। মোদ্দা কথা, বাহনটি যেমনি ঐতিহ্য বহন করেন, তেমনি এর রয়েছে অর্থণৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। সে অর্থে রিকশা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় একটি বহানও বটে।

রিকশার উদ্ভব হয় ১৮৬৫ থেক ১৮৬৯ সালের মাঝে। পালকির বিকল্প হিসেবে এর উত্থান। জানা যায়, জোনাথন স্কোবি নামের একজন মার্কিন নাগরিক ১৮৬৯ সালে রিকশা উদ্ভাবন করেন। তিনি থাকতেন জাপানের সিমলায়। ১৯০০ সাল থেকে কলকাতায়ও এর ব্যবহার শুরু হয়। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯১৯ কিংবা ১৯২০ সালের দিকে মিয়ানমার হয়েই রিকশার আগমন ঘটে। তবে ঢাকায় রিকশা কিন্তু রেঙ্গুন থেকে আসেনি, এসেছে কলকাতা থেকে। নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের পাট ব্যবসায়ীদের কল্যাণে। তারা তাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে ঢাকায় রিকশা নিয়ে আসেন। কোনো কোনো সূত্রমতে ঢাকাতে প্রথম রিকশার লাইসেন্স দেয়া হয় ১৯৪৪ সালের দিকে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে জাপানে রিকশার প্রচলন ব্যাপক বেড়ে যায়। যদিও এখন আর জাপানে রিকশা দেখা যায় না, জাদুঘর ছাড়া।

রিকশা চালিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষের সংসারও চলে

রিকশা চালিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষের সংসারও চলে, ছবি : ইন্টারনেট

আরও পড়তে পারেন- লালবাগ কেল্লা : মুঘল ঐতিহ্যের সঙ্গে অভিশপ্ত সুড়ঙ্গের কল্পকাহিনী

রিকশার নগরী হিসেবে রাজধানী ঢাকার খ্যাতি বা পরিচিত বেশ পুরনো! বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর ক্লান্ত চলাচল চোখে পড়ে। চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, মালোয়েশিয়া, ইউরোপের ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে রিকশা ঘুরতে দেখা যায়। দেশ ভেদে রিকশার আকার, গঠন প্রকৃতি ভিন্ন হয়। আবার বিভিন্ন দেশে এর নামও রয়েছে পৃথক। রিকশা চীনে সানলুঞ্চে, কম্বোডিয়ায় সীক্লো, মালোয়েশিয়ায় বেকা, ফ্রান্সে স্লাইকো নামে পরিচিত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি পেডিক্যাব নামেও পরিচিত। প্রাচীনকাল থেকে জাপানেই রিকশার অস্তিত্ব জানা যায়। সেই রিকশাগুলো অবশ্য তিন চাকার ছিল না। একজন মানুষ রিকশাটি ঠেলে নিয়ে যেত। এ ধরনের রিকশাকে বলা হয় হাতে টানা রিকশা।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে রিকশা চিত্রগুলো আমাদের গর্বের বিষয়। এটিকে চিত্রকলার একটি ধারাও বলা চলে। রিকশা চিত্র বলতে উজ্জ্বল রঙে আঁকা কিছু চিত্রকে বোঝানো হয়। সাধারণত বাংলাদেশ এবং ভারতেই রিকশার পেছনে এ ধরনের চিত্রকলা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞরা একে ফোক আর্ট, পপ আর্ট বা, ক্র্যাফটের মর্যাদাও দিয়ে থাকেন। ১৯৫০ এর দশকে বাংলাদেশের রিকশা চিত্রের প্রচলন শুরু হয়। রিকশাচিত্রে ফুল-ফল, পশু-পাখি, নদী-নালা, প্রকৃতি এমনকি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের ছবিও আঁকানো হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে রিকশা জনপ্রিয়তার কারণে রাপা প্লাজার কাছে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের শুরুতেই স্থাপিত হয়েছে সম্পূর্ণ শিকল দিয়ে তৈরি একটি রিকশা, এর চালক এবং এর যাত্রীদের নিয়ে সুন্দর এক ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি মৃণাল হকের তৈরি। ভাস্কর্যটির নাম ইস্পাতের কান্না।

ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় একটি বাহন

ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় একটি বাহন, ছবি : ইন্টারনেট

১৯৮০ সালে সারা বিশ্ব প্রায় ৪০ লাখের মত রিকশা ছিল। ১৯৪১ সালেও ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭ টি। ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১ টিতে। বর্তমানে ঢাকাতেই শুধু ৩ থেকে ৭ লাখ রিকশা রয়েছে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুসারে, ঢাকায় কমপক্ষে ৫ লক্ষাধিক রিকশা চলাচল করে এবং ঢাকার ৪০ শতাংশ মানুষই রিকশায় চলাচল করে। ২০১৫ সালে এটিকে বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে তাদের বইয়ে স্থান দেয়।

২০১১ সালে বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনের সময়ও বাংলাদেশের রিকশা-র ঐতিহ্য বেশ ভালভাবে পৃথিবীবাসীর সামনে তুলে ধরা হয়। সেখানে প্রতিটি দলের অধিনায়করা রিকশায় করে মাঠে উপস্থিত হন। বিষয়টি বেশ প্রশংসিত হয়।