বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প,
বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প, ছবি : ইন্টারনেট

বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প: ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার হাতছানি

টি. চৌধুরী : বাংলাদেশের ভারী শিল্পের মধ্যে জাহাজ নির্মাণ শিল্প অন্যতম। এ শিল্পটি অনেক আগে থেকেই রপ্তানিকারকের তালিকায় যোগ হয়েছে। বিগত দশ বছরে এই খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ের মধ্যে রপ্তানিকৃত জাহাজের সংখ্যা ৪০টি। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। ১০-১৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সেটা ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নিত হতে পারে।

বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প-এ সবচেয়ে বেশি অবদান ওয়েস্টান মেরিনের। এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক জাহাজ নির্মাণ করেছে। রপ্তানির মধ্যেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে ওয়েস্টান মেরিন। গত অর্থবছরের পরিসংখ্যান মতে এই খাতের রপ্তানি আয়ের ৮৯ শতাংশই ওয়েস্টান মেরিনের।

বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মত এই অঞ্চলে তেমন কেউ নেই। সাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এমনটি বলছি। তাহলে একটু খুলেই বলা যাক – জাহাজ নির্মাণকারী হিসাবে এই অঞ্চলে যেসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রতিযোগী হিসাবে দাঁড়াতে পারতো তার মধ্যে সাউথ কোরিয়ান ডিওএ ও সামসাং অন্যতম। অবাক করার বিষয় হচ্ছে এসব বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের কোন প্রতিযোগিতা তো নেই, বরং নিকট ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এর নেপথ্য কারণ হলো, তারা নির্মাণ করছে হেভি ভেসেল বা বড় জাহাজ। আর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো বেছে নিয়েছে ছোট ও মাঝারি সাইজের জাহাজ।

দক্ষিণ কোরিয়ান ও জাপানি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে ৫০ হাজার ডি ডব্লু টি বা হেভি ওয়েট টনেসের ভারী জাহাজ নির্মাণ করছে সেখানে আমরা মনোযোগ দিয়েছি ১২ হাজার ডিডব্লুটির কম ওজনের জাহাজ তৈরিতে। ফলে আমাদের শীপবিল্ডিং জায়েন্টদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার প্রয়োজন হচ্ছে না। এবং মার্কেটে ক্রেতা পেতেও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে না।

এরইমধ্যে বিশ্বের নামিদামি সব অর্থনীতিবীদ বাংলাদেশকে জাহাজ নির্মাণ শিল্পীর আগাম বার্তা দিয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশ আগামী পাঁচবছরে এই সেক্টর থেকে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে সক্ষম। পাশাপশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করা হলে বিশ্বে ছোট ও মাঝারি ভেসেল নির্মাতাদের জন্য অপ্রত্যাশিত প্রতিযোগী হিসাবে আর্বিভূত হবে বাংলাদেশ জাহাজ শিল্প।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ জাহাজ রপ্তানি করে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ জাহাজ রপ্তানি করে, ছবি: ইন্টারনেট

বাংলাদেশি শীপয়ার্ডগুলোর হাতে বর্তমানে বড় সংখ্যক জলজান নির্মাণের অর্ডার রয়েছে। যার বেশিরভাগই দেশিয় সংস্থার। এছাড়াও বড় সংখ্যায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে জাহাজ ক্রয়ের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিগত দশ বছরে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড, জার্মানি, ভারত, পাকিস্তানসহ মোজাম্বিক ও জাম্বিয়ার মত আফ্রিকান দেশেও জাহাজ রপ্তানি করেছে।

আরও পড়ুন – বাংলাদেশি মুদ্রা : সরকার কেন চাইলেই বেশি বেশি ছাপাতে পারে না?

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ জাহাজ থেকে সাগরের জলরাশিতে তেল মিশে যাওয়া। এ জন্য ক্রেতারা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন জাহাজের দিকে ঝুঁকছেন। আশার কথা হলো বাংলাদেশও এদিকে নজর দিচ্ছে। লিকুইড ন্যাচারেল গ্যাস তথা এলএমজি জালানি হিসাবে ব্যবহার করে এমন একটি জাহাজের অর্ডার আমাদের দেশিয় শিপয়ার্ডের হাতে রয়েছে।

ধারনা করা হয় ২০২৬ নাগাদ বিশ্বে ছোট ও মাঝারি জাহাজ শিল্পের আয়ের পরিমাণ হবে ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা কিন্তু চাইলেই এই বিশাল মার্কেটে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারি। আনন্দ শীপইয়ার্ডের চেয়ারম্যান জনাব আনন্দর মতে, ‘সরকার এই খাতে সুযোগ সুবিধা দিলে বাংলাদেশ কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্ববাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।’

বাংলাদেশের বিভিন্ন শীপয়ার্ডে প্রায় ৩০ হাজার লোক কাজ করছে। শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাতা ও ইস্টান মেরিনের চেয়ারম্যান আশরাফুল আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই সংখ্যা পরবর্তী পাঁচ বছরে ৫০ হাজারের উন্নিত হবে। ১৫ বছরের মধ্যে এক লক্ষে উন্নিত হবে।’

বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প বিশ্ববাজারে গিয়ে যাচ্ছে

বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প বিশ্ববাজারে গিয়ে যাচ্ছে, ছবি : ইন্টারনেট

জাহাজ নির্মাণ শিল্প অনেক আগে থেকেই এশিয়ায় ছিল। পরবর্তীতে বিট্রিশ ও ইউরোপিয়ানদের হাতে চলে যায়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা নানা ভাবে বাঁধা দিয়েছে এশিয়ার কোন দেশ যাতে এই শিল্পে উন্নতি করতে না পারে। যদিও বাংলার তৈরি জাহাজ নিয়েই জন নিলসন নেপোলিয়নদের নৌবহরকে পরাভুত করেন। বর্তমানে এই শিল্প আবারও আমাদের হয়েছে। যদিও এই খাতের সর্ববৃহত্ত বাজার এখন দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চাইনিজদের দখলে। কিন্তু উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আবারও আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে আমাদের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো টুরিস্ট ভেসেল, কন্টেনার ও বেসামরিক জাহাজ নির্মাণ করে থাকে। আর সামরিক জাহাজ গুলোর মধ্যে রয়েছে এন্টিসাবমেরিন ওয়ার ফেয়ার ভেসেল, লার্জ পেট্রোল ক্রাফ্ট ও ল্যান্ডিং কার্পট। এছাড়াও বাংলাদেশ বর্তমানে ভারী ফ্রিগ্রেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের বিষয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তাই আশাকরা যায় বাংলাদেশের তৈরি অনেক ভারী ভারী যুদ্ধ জাহাজ বাংলাদেশ নেভির বহরেও যোগ হবে।