বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, ছবি : ইন্টারনেট

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প : শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক ও বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বি

টি চৌধুরী: পাহাড় সমান সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিস্ময়কর ভাবে প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে দিনকে দিন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বি হওয়ার পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক দেশ হিসাবেও আর্বিভূত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ১৬০ দেশে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানি করছে। এশিয়া, আফ্রিকার পর এখন ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও জেঁকে বসেছে বাংলাদেশের ওষুধ।

বিশ্বের ৪৮টি ওষুধ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান। দেশের ২৫৭টি কোম্পানি বছরে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে। প্রতিবছর এসব কারখানায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদিত হয়। তাছাড়া এই শিল্পের কারণে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে শিগগিরই চালু হচ্ছে ওষুধ শিল্প পার্ক।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশীয় ৪৬টি কোম্পানির প্রায় ৩০০ প্রকারের ওষুধ বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়। এরমধ্যে মিয়ানমার, জার্মানি, ব্রাজিল, শ্রীলংকা, পানামা, ডেনমার্ক, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, কেনিয়া, ইউক্রেন, স্পেন, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স ও দক্ষিণ আফ্রিকা। রপ্তানির তালিকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন দেশ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ধারনা করা হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যেই এ খাত থেকে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বৈশ্বিক বাণিজ্যের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বৈশ্বিক বাণিজ্যের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি, ছবি : ইন্টারনেট

এখানেই শেষ নয়। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব ছাড় ১৭ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প খাতে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত মেধাস্বত্ব ছাড় পাওয়া গেছে।

২০১৮ সালে দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী ২০৪টি কোম্পানির ওষুধের বিক্রি ও ধরন নিয়ে একটি জরিপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউভিআইএ’। সংস্থাটির জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ওষুধের বাজারের ছিল ২০ হাজার ৫১২ কোটি টাকা।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য মতে, গেল কয়েক বছরে দেশ থেকে ওষুধ রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১১ সালে ওষুধ রপ্তানি হয় ৪২৬ কোটি টাকার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছে ১০ কোটি ৪৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ০৩ শতাংশ বেশি। আরেক তথ্যমতে, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের আকার ছিল ১৭০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে শুধু বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের বাজার ছিল ১৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার।

আরও পড়তে পারেন – বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প: ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার হাতছানি

দেশীয় ওষুধ বাজারের ৬৮ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ ১০ কোম্পানি। আর যেসব ওষুধের ওপর ভর করে বাজার বড় হচ্ছে, তার প্রথমেই রয়েছে অ্যান্টিআলসারেন্ট বা অ্যাসিডিটির ওষুধ। সর্বাধিক বিক্রি হওয়া ওষুধের তালিকায় এরপরই আছে অ্যান্টিবায়োটিক।

চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বাংলাদেশের অবদান কম নয়

চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বাংলাদেশের অবদান কম নয়, ছবি : বাংলাদেশ

ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানির পাশাপাশি চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বাংলাদেশর বিস্ময়কর অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. রফিকুল ইসলাম ডায়েরিয়া নিরাময়ের জন্য খাবার স্যালাইন (ওরাল স্যালাইন) আবিষ্কারের জন্য বিশ্বে এক নামে পরিচিত। বিখ্যাত ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ এই আবিষ্কারকে ‘চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার’ হিসেবে ঘোষণা করে।

বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম কিডনি তৈরি করেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী শুভ রায়। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসামান্য কীর্তি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সহযোগী অধ্যাপক শুভ রায় তার সহকর্মীদের নিয়ে কৃত্রিম কিডনি তৈরির কাজ শুরু করেন। চলতি দশকের গোড়ার দিকে দলটি ঘোষণা দেয়, তারা কৃত্রিম কিডনি তৈরি করে তা অন্য প্রাণীর দেহে প্রতিস্থাপন করে সফল হয়েছেন।

ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক

ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক, ছবি : ইন্টারনেট

তাছাড়া সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু আলী ইবনে সিনার একটি উদ্ভাবন ক্যানসার পরীক্ষার ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য এনেছে। ২০১৮ সালে উদ্ভাবিত নতুন এই পদ্ধতিতে কেবল রক্ত ও টিস্যু পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এই পরীক্ষাটি একটি বিশেষ ধরনের ডিএনএ পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে করা হয়। এর মাধ্যমে জীনগত বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। ফলে শরীরে কোন ধরনের ক্যানসার বাসা বেঁধেছে নির্ণয় করা যায়। এর অর্থ হলো, যত দ্রুত ক্যানসার নির্ণয় করা যাবে, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ইবনে সিনা কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে মহামারি রুপ নেওয়া কভিড ১৯ বা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়েও গবেষনা করছে বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড।

এক কথায় বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে দিনকে দিন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছে। বাংলাদেশের এমন সাফল্যে ইর্ষান্বিত হয়ে ভারতের র্শীষস্থানীয় বাংলা পত্রিকা আনন্দ বাজার ২০১৬ সালের ২৪ আগষ্ট ‘প্র্যাখ্যানের ‘বদলা’! এখন দুনিয়া দাপাচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প’ নামের একটি প্রতিবেদন করতে একরকম বাধ্য হয়।