বাংলাদেশি মুদ্রা, ছবি : ইন্টারনেট
বাংলাদেশি মুদ্রা, ছবি : ইন্টারনেট

বাংলাদেশি মুদ্রা : সরকার কেন চাইলেই বেশি বেশি ছাপাতে পারে না?

আর. রহমান
টাকা এমন একটি বস্তু, যা ছাড়া জীবন প্রায় অচল। যেটা পাওয়ার জন্য মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরে। মানুষের কাছে এর চাহিদা কখনোই শেষ হয় না। মুদ্রা ছাপানো নিয়ে সাংবিধানিক বা আন্তর্জাতিক কোন বিধি নিষেধও নেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কেন বেশি বেশি বাংলাদেশি মুদ্রা ছাপাতে পারে না?

বিস্তারিত ঘটনায় যাওয়ার আগে একটি টিভি সিরিজের ঘটনা বলি। কয়েক বছর আগে লাপাসাতে একটি টিভি সিরিজ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল। এতে, একদল ডাকাত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ঢুকে সেখানকার লোকজনদের জিম্মি করে ডলারের জন্য। তবে তাদের লুট করার পদ্ধতি সবাইকে অবাক করে। এই দলটি ব্যাংকের মুদ্রা লুট না করে, ব্যাংক থেকে মুদ্রা প্রিন্টির যন্ত্র লুট করে। যার মাধ্যমে তারা বানিয়ে নিয়েছিল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এটি প্রচার হওয়ার পথ থেকেই বেশির ভাগ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, সরকার যদি নিজেই বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা ছেঁপে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেয়, তাহলেই তো সব ধরনের আর্থিক সমস্যা মিটে যায়। যদিও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি দেশের আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য বেশি বেশি টাকা ছাপানো মানে, নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা। যার বাস্তব উদাহরণ জিম্বাবুয়ে ও হাঙ্গেরির মত দেশ।

 

কিসের ভিত্তিতে মুদ্রা ছাপানো হয়?

 

এবার ফিরে আসি পুরনো কথায়। সাধারণত একটি দেশের টাকা মুদ্রণের দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের হাতে। এখন আরও একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, ব্যাংক কিসের ভিত্তিতে টাকা ছাপে। যদিও টাকা উৎপাদনের কোন আবশ্যক নিয়ম নেই। সাধারণত একটি দেশের সরকারের যত ইচ্ছা টাকা প্রিন্ট করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে কোন দেশই যত ইচ্ছে টাকা প্রিন্ট করে না। টাকা প্রিন্ট করার হয় সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে ভারষম্য রেখে। টাকা ছাপার আগে বিবেচনা করতে হয়, দেশের মানুষের উপার্জন ক্ষমতা, চাহিদা এবং দেশের সম্পদ। এর বেশি টাকা ছাপলেই দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা।

 

আরও পড়তে পারেন- ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয়-রোজগার কেমন?

 

ধরা যাক, একটি দেশের মোট সম্পদ বলতে রয়েছে কেবল দশটি আম। আর সেই দেশ বছরে বিশ টাকা প্রিন্ট করে। পরিবহন খরচ, খুচরা মুল্য পাইকারি মূল্য ইত্যাদি জটিলতা বাদ দিয়ে ধরে নেই প্রতিটি আমের মূল্য দুই টাকা। তাহলে দেশের মোট সম্পদ আর মোট কারেন্সি ভারসম্য বজায় থাকলো। পরের বছর এই দেশ সর্বমোট ৪০ টাকা প্রিন্ট করলো। কিন্তু মোট সম্পদ বলতে দশটি আমই রইলো। যেহেতু দেশে নতুন কোন সম্পদ নেই সুতরাং ওই দশটি আম কেনার বরাদ্দ হলো ৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি আমের দাম দ্বিগুন হয়ে গেলো। এভাবেই দেশের মোট সম্পদের চেয়ে বেশি টাকা প্রিন্ট করলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। টাকার দাম বা ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় একে মুদ্রাস্ফ্রিতি বলে। তাই প্রতিটি দেশের কেন্দ্রিয় ব্যাংককে রীতিমত গবেষনা করে চাহিদা নির্ধারণ করে টাকা প্রিন্ট করতে হয়।

বাংলাদেশি মুদ্রা, ছবি : ইন্টারনেট

বাংলাদেশি মুদ্রা, ছবি : ইন্টারনেট

মোট জিডিপির ২-৩ শতাংশ মুদ্রা প্রিন্ট করতে হয়

 

সাধারণ একটি দেশের মোট জিডিপির দুই থেকে তিন শতাংশ পরিমাণ মুদ্রা প্রিন্ট করে থাকে। তবে উন্নয়নশীল দেশে এই হার আরেকটু বেশি। এই কারণে আমাদের সরকার ইচ্ছামত টাকা তৈরি করতে পারে না।কেউ যদি ইচ্ছেমত টাকা ছাপিয়ে মার্কেটে ছেড়ে যায় তাহলে মুদ্রাস্ফিতির ফলে দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে যাবে। দেশের সঞ্চয়ের দাম কমে যাবে। দেখা গেলো, একটি চিপস দশ টাকা দিয়ে না কিনে ব্যাংকে জমা রাখলাম। দুই দিন পর চিপসের দাম বিশ টাকা হয়ে গেলো। তখন মানুষ টাকা সঞ্চয় করতে চাইবে না। এতে বিপাকে পড়বে দেশের ব্যাংকগুলো। তাছাড়া দেশে মুদ্রাস্ফিতি হলে অন্য দেশের সঙ্গে মুদ্রার মানও কমে যায়। আর এ জন্য ইচ্ছা করলেই সরকার বাংলাদেশি মুদ্রা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়তে পারে না।

 

বাংলাদেশি মুদ্রা তৈরিতে  খরচ কত

 

অর্থনীতির প্রধান বাহন টাকা। এই টাকা তৈরি করতেও প্রয়োজন টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এক টাকার একটি কয়েন তৈরি করতে ৯৫ পয়সা খরচ হয়। দুই টাকার কয়েন তৈরি করতে ১.২০ পয়সা খরচ হয়। আর পাঁচ টাকার একটি কয়েন তৈরিতে খরচ পড়ে ১.৯৫ পয়সা। কয়েনের মান বেশি হলেও সেই তুলনায় খরচ অনেক কম পড়ে। বাজারে প্রচলিত সবচেয়ে বড় নোট এক হাজার টাকা। এই মূল্যমানের একটি নোট তৈরি করতে প্রায় ৭ টাকা খরচ হয়। ৫০০ টাকার নোট ছাপাতে খরচ পড়ে ৬ টাকার মত। ১০০ টাকার নোট ছাপাতে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে ৪টাকা। এছাড়া ৫০ টাকা ২০ টাকার একটি নোট ছাপাতে আড়াই টাকা ও ১০ টাকার একটি নোট ছাপাতে খরচ পড়ে ২টাকা বিশ পয়সা । এবং পাঁচ টাকার নোট ছাপাতে খরচ হয় দুই টাকার মত। আর দুই টাকার নোট ছাপাতে খরচ পড়ে দেড় টাকা।

 

আরও পড়তে পারেন- নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত: রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বিশ্লেষণ

 

কাগজের নোটগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান টাকসাল বা দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন লি. এ ছাপানো হয়। এই টাকশাল গাজীপুরে অবস্থিত। টাকা ছাপানো যাবতীয় কাগজপত্র, রং ও নিরাপত্তা সূতা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রায় নিরাপত্তাজনিত সূতা ব্যবহার করা হয় না। তবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি ব্যবহার করা হয়। ফলে খরচ বেশি হয়। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছরই টাকা তৈরির খরচ বাড়ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।