বই নকল হলে আইনি প্রতিকার কী?

আবরার মাসুদ

হুবহু বা আংশিক নকল করে এক লেখকের বই আরেক লেখকের নামে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে কম নয়। এ ধরনের কাজ নৈতিকভাবে তো নিন্দনীয় বটেই, একই সঙ্গে আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইনের আদলে বাংলাদেশে ২০০০ সালে যে আইন প্রণীত হয়েছে, তার অধীনে নকল বইয়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা নিয়ে আলোকপাত করা হলো।

খুলনা বি এল কলেজের সাবেক শিক্ষক সুনীল কুমার গোলদার ‘পরিসাংখিক বলবিদ্যা’ নামে একটি বই ১৯৯৯ সালে প্রকাশ করেন। বইটি ২০০৮ সালে নকল করে রংপুর কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ মোকসেদ আলী তা নিজের নামে প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় সুনীল কুমার গোলদার বাদী হয়ে ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে কপিরাইট আইনে মামলা করেন। মামলার বাদী সুনীল কুমার গোলদারের অভিযোগ, ‘তার বইটির ৯৫ ভাগ নকল করে কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ নিজের নামে ২০০৮ সালে প্রকাশ করেন।’

গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের প্রয়াত এক শিক্ষকের পরিবার দাবি করে, ওই শিক্ষকের লেখা একটি মৌলিক বই নকল করে নিজের নামে বই প্রকাশ করেছেন তারই সহকর্মী আরেক শিক্ষক। দেশের বেশকিছু সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়। ইদানীং নকল বইয়ের এ প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে একশ্রেণির অসাধু প্রকাশক ও লেখক বেশ কয়েকটি বই সামনে রেখে নিজের নামে একটি বই প্রকাশ করে ফেলছে। অথচ সেখানে নেই কোনো মৌলিকত্ব, নেই মূল লেখকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। এভাবে অন্যের বই নকল করাটা নৈতিক দিক থেকে তো অপরাধ বটেই, আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যের কপিরাইট লঙ্ঘন করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কপিরাইট নিয়ন্ত্রিত হয় প্রধানত দুটি আইনের মাধ্যমে প্রথমটি ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্রেড রিলেটেড আসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস (ট্রিপস)’ আর দ্বিতীয়টি ‘বার্ন কনভেনশন, ১৮৮৭’। বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে এ দুটি আইনে স্বাক্ষর করে এবং আন্তর্জাতিক আইন দুটির আদলে ২০০০ সালে কপিরাইট আইন প্রণয়ন করে। আমরা এখন দেখব, অন্যের বই নকল করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া হলে আমাদের কপিরাইট আইন কী সুরক্ষা প্রদান করে।

বাংলাদেশের কপিরাইট আইনে কোনো বই নকল করা হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে হলে প্রথমত ওই বইয়ের কপিরাইট নিবন্ধিত হতে হবে এবং বইটি যদি মৌলিক কোনো কাজ হয়, তবেই তার নিবন্ধন পাওয়া যাবে। অর্থাৎ কোনো বই কপিরাইট আইনের অধীনে কপিরাইট নিবন্ধকের কাছে গিয়ে নিবন্ধন না করা হলে সে বই অন্য কেউ নকল করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া যাবে না। কপিরাইট আইনের ৫৫ থেকে ৬১ ধারায় কপিরাইট নিবন্ধনের যাবতীয় বিধিবিধান দেয়া আছে। সুতরাং কপিরাইট আগে থেকে নিবন্ধন করা না থাকলে আপনি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারছেন না। বাংলাদেশের কপিরাইট আইনের এটি একটি দুর্বলতা। কারণ বার্ন কনভেনশনের ৫(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে কপিরাইট আইনের সুরক্ষা পাওয়ার জন্য নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই, কোনো বই কেবল প্রকাশিত হলেই তার কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে নিবন্ধনকে শর্ত করা হয়েছে।

কপিরাইট নিবন্ধন করা হলে ওই বইয়ের মালিক তার জীবদ্দশায় এবং তার মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত তার পরিবার সেই বইয়ের কপিরাইট ভোগ করবে। বইয়ের ক্ষেত্রে কপিরাইটের মালিক কে হবেন, তা নিবন্ধনের সময় স্পষ্ট করতে হবে। সাধারণত লেখকই কপিরাইটের মালিক হন। কিন্তু কখনো কখনো প্রকাশকও এ মালিকানা নিতে পারেন। আবার কোনো পত্রিকা, ম্যাগাজিনে কর্মরত কোনো লেখক বিশেষ চুক্তির অধীনে কোনো বই লিখে দিলে সেই পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের কর্ণধার সে বইয়ের কপিরাইট পেতে পারেন। যিনি বইয়ের কপিরাইট পাবেন, বইটির ব্যাপারে তার কিছু অর্থনৈতিক অধিকার তৈরি হবে। যেমন বইটির বাণিজ্যিক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তার একচ্ছত্র অধিকার থাকবে, তার অনুমতি ছাড়া সে বইয়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার কেউ করতে পারবেন না। তবে যে ক্ষেত্রে লেখকের কাছে কপিরাইট থাকে না, সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক একচ্ছত্র অধিকার তিনি ভোগ না করলেও কিছু নৈতিক অধিকার তিনি সে বইয়ের ওপর রাখেন। যেমন বইটির লেখক যে তিনি, তা দাবি করার অধিকার তার থাকে। সুতরাং, কোনো লেখককে দিয়ে অন্য কোনো প্রকাশক কোনো বই লিখিয়ে নিলে বইটির ওপর একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অধিকার প্রকাশকের থাকলেও তিনি ইচ্ছা করলে বইটির লেখক হিসেবে অন্য কারো নাম চালিয়ে দিতে পারবেন না। একইভাবে লেখকের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও তার লেখা বই যদি কপিরাইটের মালিক ইচ্ছামতো বিকৃত বা সম্পাদনা করেন যাতে সেই লেখকের সুনাম বিনষ্ট বা মানহানি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে লেখক আদালতের মাধ্যমে এর প্রতিকার চাইতে পারেন। বাংলাদেশের কপিরাইট আইনের ৭৮ ধারায় এ বিশেষ অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। সুতরাং বইয়ের কপিরাইট প্রসঙ্গে দুই ধরনের অধিকার থাকে একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করেন কপিরাইটের মালিক, যার নামে কপিরাইট নিবন্ধিত হয়েছে; আর নৈতিক অধিকার ভোগ করেন বইটির লেখক। বইয়ের কপিরাইট লেখকের না থাকলেও কিংবা কপিরাইটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এ নৈতিক অধিকার থেকে যায়।

কপিরাইট-সংক্রান্ত অধিকারের লঙ্ঘন হলে বাংলাদেশের কপিরাইট আইন অনুসারে দুই ধরনের প্রতিকার পাওয়া যায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি। দেওয়ানি মামলা করতে চাইলে ডিস্ট্রিক্ট জাজের আদালতে মামলা করতে হয়। বাদী যেখানে বসবাস করেন, সেখানকার আদালতে কিংবা যে স্থানে তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে সেখানকার আদালতে মামলা করতে হবে। দেওয়ানি মামলার মধ্য দিয়ে কপিরাইট লঙ্ঘনে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাদীর, তার ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়। কপিরাইট আইনের ৭৫ থেকে ৮১ ধারায় মামলার বিস্তৃত বিধান বলা হয়েছে।

কপিরাইটের লঙ্ঘন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা যায়। কপিরাইট আইনে কপিরাইট লঙ্ঘনকে আমলযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে। সুতরাং কপিরাইটের লঙ্ঘন হলে পুলিশ ইচ্ছা করলে ম্যাজিস্ট্রেটের ওয়ারেন্ট ছাড়াও অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। কপিরাইটের লঙ্ঘনে আদালত অপরাধীকে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড সাজা দিতে পারবে। একই সঙ্গে নকল বইয়ের কপি এবং বই নকল করার সব উপকরণ বাজেয়াপ্ত করতে পারবে আদালত। কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে কপিরাইটের লঙ্ঘন করলে আদালত তুলনামূলক কম সাজা দিতে পারবে।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া সৎ বিশ্বাসে অন্যের কপিরাইট করা বই ব্যবহার করলে আইনের দৃষ্টিতে তা অপরাধ হবে না। সুতরাং কেউ যদি প্রকৃতই শিক্ষার উদ্দেশ্যে অন্যের বইয়ের সীমাবদ্ধ ব্যবহার করে, কারো বইয়ের সারাংশ লিখে তাহলে এ ধরনের কাজকে কপিরাইটের লঙ্ঘন বলা যাবে না। কপিরাইট আইন, ২০০০-এর ৭২ ধারায় এ ধরনের ১৪টি কাজের তালিকা দেয়া আছে, যেগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে কপিরাইটের লঙ্ঘন মনে হলেও সেগুলো আসলে আইনের দৃষ্টিতে লঙ্ঘন নয়।