ফরাসি শোষণের শেষ কোথায়?

রঙ পেনসিল ডেস্ক:  বিশ্বে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পরিচয় শিল্পকলা, চলচ্চিত্র আর সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে। এই পরিচয়ের ছিটেফোঁটাও সাবেক ফরাসি অবশ্য উপনিবেশগুলোর ভাগ্যে জোটেনি। সেই সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা। যারফলে বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই দেশটির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছে। একইসঙ্গে ফরাসি পণ্য বয়কটেরও ডাক দিয়েছে।

আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে প্রায় দুই শতাব্দীর ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকালে ফ্রান্স মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে, তৎকালীন ইন্দোচীন বলে পরিচিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায়।

উপনিবেশগুলোর মানুষের জীবনমান ও অগ্রসরতা নিয়ে উদ্বেগ না থাকলেও অবশ্য ফ্রান্স এখনও বহু দরিদ্র আফ্রিকান দেশকে কর ও ভাড়া দিতে বাধ্য করছে। এর মাঝে ১০টি দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে শিক্ষা হার পুরো বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে কম।

প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষাহারসহ হতভাগ্য দেশগুলোর মধ্যে ৮টি দেশের দিকে নজর দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এই ৮ দেশ হলো; বেনিন (৪০%), বুর্কিনা ফাসো (২৬%), চাদ (৩৪%), আইভরি কোস্ট (৪৯%), গায়ানা (২৯%), মালি (২৩%), নাইজার (২৯%) এবং সেনেগাল (৪২%)।

দেড়শো বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনে এটাই সবচেয়ে চমকপ্রদ ফলাফল!

শিক্ষা নিয়ে আরেক বঞ্চনার উদাহরণ নমুনা দেওয়া যেতে পারে। দেড়শো বছর পর ১৯৬০ সালে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র যখন ফ্রান্স থেকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা লাভ করে তখন পর্যন্ত সে দেশটির মাত্র একজন ব্যক্তি পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করতে পেরেছিলেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত ফ্রান্স ন্যাক্কারজনক অবস্থা রেখে গেছে তার আফ্রিকান কলোনিগুলোয়। আর এই অনগ্রসরতার সুযোগ নিয়ে এখনও এই ইউরোপীয় প্রভু আফ্রিকাকে সাংস্কৃতিক নির্ভরতা আর আর্থিক শোষণের বেড়াজালে বন্দি রাখতে পারছে।

আইভরি কোস্টে বিদ্রোহীদের ঠেকাতে মোতায়েন করা কিছু সেনা সদস্যএসব দেশে গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণহত্যা অধিকাংশ সময়েই ঔপনিবেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধনে সংগঠিত হয়। ফ্রান্স এখনও এসব দেশে ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত সরকারি ভবন ও স্থাপনার ভাড়া আদায় করে। খবর সিজিএস গ্লোবের।

এই প্রেক্ষিতে এখন ধরে নেওয়া যাক, স্বাধীনতার পরেও যুক্তরাষ্ট্রকে হোয়াইট হাউজের ভাড়া যুক্তরাজ্যকে দিতে হচ্ছে। কিংবা প্রাক্তন সোভিয়েত আমলে তৈরি করা পূর্ব ইউরোপের আবাসিক ভবনগুলোর ভাড়া আদায় করছে রাশিয়া!

অবিশ্বাস্য এবং অবাস্তব এই শোষণ কিন্তু আফ্রিকার বাস্তবতা। প্রাকৃতিক সম্পদও অবাধে উত্তোলনের সুযোগ পায় ফরাসি কোম্পানিগুলো। নিয়ন্ত্রণ করে অনেক দেশের মুদ্রানীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ।

আরেকটি পরিসংখ্যান জেনে রাখা দরকার। ১৯৯০’এর দশকে যখন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন প্রত্যেকটি দেশেই শতভাগ শিক্ষার হার ছিল। একটি দেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

শুধু শিক্ষাহার নয় সোভিয়েত শাসনামলের অবসান হওয়ার সময় এদেশগুলোতে ছিল হাজার হাজার সুপ্রশিক্ষিত চিকিৎসক আর প্রকৌশলী। সোভিয়েতরা তৈরি করেছিল মানসম্মত বহু বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, আবাসন এলাকা। একই কথা বলা যেতে পারে যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামো স্থাপনের ক্ষেত্রে।

পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত আমলে তৈরি করা এক আবাসন কমপ্লেক্স
স্বাধীনতা লাভের দুই দশক পর আজও পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন, অন্যান্য অবকাঠামো সেই সোভিয়েত আমলেই তৈরি করা হয়।

সেই তুলনায় মুক্তবিশ্বের সংস্কৃতিমনা নক্ষত্র ফ্রান্সের অবদান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাই নয় কি?