প্রিন্সেস ডায়ানা
প্রিন্সেস ডায়ানা

প্রিন্সেস ডায়ানা, দাপুটে রাজবধূর রহস্যময় মৃত্যু

টি চৌধুরী: প্রিন্সেস ডায়ানা ইংল্যান্ডের রাজবধূ তো বটেই, ছিলেন তৎকালীন ফ্যাশন আইকনদের অন্যতম। পাশাপাশি দেশ থেকে দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তার পরকীয়া ও গোপন প্রেমের গুজব। নাম, খ্যাতি, জশ ও বদনাম নিয়ে হঠাৎ একদিন প্রাণ হারান প্রিন্সেস অব ওয়েলস। তার কোটি ভক্ত ও অনুরাগিরা এখনো ডায়নার মৃত্যুকে স্রেফ দুর্ঘটনা মানতে নারাজ। এর নেপথ্য কারণও আছে। ফলে ডায়নার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা রহস্য। যার কুলকিনারা বের করা আজও সম্ভব হয়নি।

ডায়ানাকে দেখে প্রেমে পড়েননি এমন বোধহয় কমই ঘটেছে। রাজপুত্র চার্লসের ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। আর রাজপুত্রকে কে ফিরিয়ে দেবে? তারই সূত্র ধরে ইংল্যান্ডের রাজপরিবারে বাজে বিয়ের ঘণ্টা। রাজবধু হয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করেন ডায়ানা। ইতিহাস বলে, ৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রিন্সেস ডায়ানা হলেন প্রথমজন যিনি রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে সরাসরি বিয়ে করলেন। প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে তার বিয়ের দৃশ্য ৭৪টি দেশে সম্প্রচার করা হয়। যা ৭৫০ মিলিয়ন মানুষ উপভোগ করেন।

প্রিন্স চার্লস আর ডায়ানা প্রণয়ের পর রাজকীয় জাহাজ ব্রিটানিয়াতে চড়ে হানিমুন করলেন তারা। এরপর দিন পেরোতে থাকল। কিন্তু সময় চলতে চলতে সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা দিল। শুরুর দিকে মানিয়ে চলা তারপর বাড়ল তিক্ততা। কেউ কেউ বলতে থাকল ভালো নেই এই দম্পতি। প্রিন্স চার্লস নাকি আজকাল ডায়ানাকে সময় দেন না। এ নিয়ে ভিতরে ভিতরে কলহ বাধছিল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকল। প্রিন্সেস চার্লসের দিকে যখন অপরাধী হওয়ার আঙ্গুল ওঠে, তখন ডায়ানাকে জড়িয়েও কথা ওঠে। দুজনেই দুজনকে সন্দেহ করতে থাকলেন। এভাবে কেটে যায় প্রায় সাত বছর। দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম আর হ্যারির জন্মের পর তিক্ততা আসে তাদের সম্পর্কে।

প্রিন্সেস ডায়ানা প্রথমজন যিনি রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে সরাসরি বিয়ে করেন

প্রিন্সেস ডায়ানা প্রথমজন যিনি রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে সরাসরি বিয়ে করেন, ছবি : ইন্টারনেট

১৯৮৯ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। সাইরিল রিনান নামে এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা এবং জেন নরগোভ নামে আরেকজন মিলে গোপনে আড়ি পেতে ডায়ানা ও জেমস গিলাবের কথাবার্তা রেকর্ড করেন। গিলাব ছিলেন ডায়ানার বিয়ে-পূর্ব জীবনের বয়ফ্রেন্ড। আর এই কথোপকথনটি ওই সময়ের। ক্যাসেট প্রকাশের পর সারা বিশ্বে আলোড়ন ওঠে। কেঁপে ওঠে রাজপ্রাসাদও। তবে উল্টো প্রিন্স চার্লস নিজেও একেবারে অভিযোগহীন ছিলেন না। তাকে ঘিরেও কেলেঙ্কালি ছড়ায়। স্ত্রীকে পাশে রেখেই চুটিয়ে প্রেম করে যাচ্ছিলেন দীর্ঘদিনের বান্ধবী ক্যামিলা পার্কারের সঙ্গে। বিষয়টি টের পেয়েছিলেন ডায়ানা। ডায়ানা গিলাবে সংলাপের দুই সপ্তাহ আগের ঘটনা এটি। ডায়ানা গিলাবের সংলাপ ছিল প্রেমাকুতিতে ভরা। কিন্তু চার্লস আর ক্যামিলার কথোপকথন ছিল যৌনাবেদনে ভরপুর।

এসব নিয়ে সংসার আর চলছিল না। ঘরে অশান্তির, বাইরে মিডিয়ার বাড়াবাড়ি। সব মিলিয়ে তাদের একসঙ্গে সংসার করা কঠিন হয়ে ওঠে। ১৯৯২ সালের ৯ ডিসেম্বর ডায়ানা ও চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকার ঘোষণা দেন।বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটানোর পর ডায়ানার সঙ্গে এক মিসরীয় ধনকুবেরের প্রেমের কথা জানাজানি হয়। তাদের ছুটি কাটাতে গিয়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব মিডিয়া। মিসরীয় ধনকুবেরের নাম দোদি আল ফাহাদ। পাপারাজ্জিদের তাড়া খেয়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়ানার সঙ্গে দোদি আল ফাহাদও মারা যান।

ক্যামেরার চোখ সব সময় খুঁজত ডায়ানাকে। যেখানেই যেতেন সেখানেই ওতপেতে তাকা ক্যামেরাম্যানদের আলোর ঝলক চোখ ধাঁধিয়ে দিত ডায়ানা। এই ক্যামেরা অত্যাচার চালাত পাপারাজ্জিরা। তারাই ডায়ানার ব্যক্তিগত জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন। বছরের পর বছর ডায়ানাকে তাড়া করে ফিরছিলেন তারা। বিয়ের পর ডায়ানা কার সঙ্গে প্রেম করছেন, তার ব্যক্তিগত জীবনের ছবি তুলতে মরিয়া হয়ে ওঠে পাপারাজ্জির দল। পাপারাজ্জিদের চোখ ফাঁকি দিতে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার চেষ্টা ছিল ডায়ানার। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।

ডায়ানা ছিলেন তৎকালীন ফ্যাশন আইকনদের অন্যত ‍

ডায়ানা ছিলেন তৎকালীন ফ্যাশন আইকনদের অন্যত ‍, ছবি : ইন্টারনেট

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট পাপারাজ্জিদের তাড়া খেয়ে পালানোর চেষ্টা করেন ব্রিটেনের সুন্দরী রাজপুত্রবধূ ডায়ানা ও তার প্রেমিক। ডায়ানা ও দোদি কালো রঙের মার্সিডিজ এস২৮০ গাড়িতে ছিলেন। প্যারিসের রিজ হোটেল থেকে বের হয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি ছোটান গাড়ি চালক। গাড়িটির চালকের আসনে ছিলেন হোটেলটির নিরাপত্তা বিভাগের উপ প্রধান হেনরি পল। প্যারিসের পন্ট-ডি-আলমা রোড টানেল পাড় হওয়ার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। দোদি-ডায়ানাকে বহনকারী মার্সিডিজ গাড়িটি ঘণ্টায় ৬৫ মাইল বেগে আঘাত করে টানেলের ১৩তম স্তম্ভকে। কংক্রিটের এ স্তম্বের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পরিণামে গাড়িটি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রিন্সেস ডায়ানা, তার বন্ধু দোদি ও গাড়িচালক হেনরি পল।

ডায়ানার মৃত্যুর পরই নানা রহস্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণ বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বন্ধু দোদি আল-ফাহাদসহ তার মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে আসা কিছু তথ্য বলছে, হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন আলোচিত এই রাজবধূ। বিবিসি, গার্ডিয়ান, টেলিগ্রাফ এ ধরনের ইঙ্গিত দেয় এমন বেশ কয়েকটি খবর প্রকাশ করে। দোদির বাবা মোহাম্মদ ফায়েদও চেষ্টা করেছিলেন ওই দুর্ঘটনাটিকে হত্যাকান্ড বলে প্রমাণের। ফরাসি পুলিশ দাবি করেছিল, গাড়ি চালক হেনরি পল মাত্রাতিরিক্ত মদ খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তবে সে অভিযোগের বিপক্ষে দাঁড়ায় দোদির পরিবার।

এ ছাড়াও প্রশ্ন রয়েছে  নানা বিষয়ে। যেমন রহস্যজনকভাবে কখোনই মার্সিডিজ কোম্পানি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটির ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করেনি। মারাত্মকভাবে আহত ডায়ানাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিতে ৭৫ থেকে ৯৫ মিনিট লেগেছে। প্যারিসের ব্যস্ত মুহূর্তে দুর্ঘটনাস্থল থেকে এ হাসপাতালে পৌঁছাতে বড়জোর ১১ মিনিট লাগার কথা। তাছাড়া মৃত্যুর কয়েক মাস আগে বিবিসির প্যানোরমা অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন ডায়ানা। তার সঙ্গে এই দুর্ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে কিনা এমন সংশয় পোষণ করেন অনেকে। তবে এ সবই ধারণাপ্রসূত আশঙ্কা। ডায়ানার মৃত্যু হত্যা নাকি নিছকই দুর্ঘটনা তা আজও রহস্যই রয়ে গেছে। ডায়ানার মৃত্যুর পর ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এই রহস্যের সমাধান হয়নি।

আরও পড়ুন- হিলারি ক্লিনটন : আমেরিকানরা যাকে ইতিহাস গড়তে দেয়নি

কিছু তথ্য বলছে, হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন  ডায়ানা

কিছু তথ্য বলছে, হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন ডায়না, ছবি : ইন্টারনেট

বিয়ের আগে প্রিন্সেস ডায়ানাকে অনেকে লেডি ডায়ানা নামেও ডাকতেন। তখন তার আসল নাম ছিল ডায়ানা ফ্রান্সেস স্পেন্সার। এরপর তাকে ‘হার রয়াল হাইনেস দ্য প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ বলে ডাকা হয়। কিন্তু রাজপুত্রের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর রানীর একান্ত অনুমতিতে তাকে শুধু দ্য প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডাকা হয়। তার অন্তেষ্টিক্রিয়ার সম্প্রচারে ২.৫ বিলিয়ন দর্শকের নজর ছিল।