পানির নিচে কতক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব
পানির নিচে কতক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব, ছবি : ইন্টারনেট

পানির নিচে, কতক্ষণ ও কিভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব

পানির নিচে অক্সিজেন ছাড়া একজন মানুষ কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে? ধরুন কোন একটি দুর্ঘটনায় কেউ যদি পানিতে ডুবে যায় তাহলে সে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবে? সাধারণত আমরা দেখি, পানিতে ডুবে গেলে বেশ দ্রুত অর্থাৎ কয়েক মিনিটের মধ্যেই মানুষটি মারা যায়। কিন্তু এর ব্যতিক্রম কি হতে পারে? এমনকি কখনো হয়; কেউ কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত পানির নিচে বেঁচে আছে!

২০১৫ সালে ইতালির ১৪ বছরের এক কিশোর তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি ব্রিজের উপর থেকে পানিতে লাফ দেয়। সবাই পানির উপরে ওঠে আসলেও মাইকেল নামের কিশোরকে আর দেখা যায়নি। পানির নিচে যাওয়ার পর কিছু একটার সংঙ্গে তার পা আটকে যায়। ফলে সে আর উপড়ে ওঠে আসতে পারেনি। তাকে উদ্ধার করতে ডুবুরিদের পাঠানো হয়। প্রায় ৪২ মিনিট সময় লাগে তাদের মাইকেলকে উদ্ধার করতে। তাকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন সে ছিল অচেতন। কিন্তু এই ঘটনার পর তাকে একমাস লাইফ সার্পোটে থাকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সে সুস্থ্য হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের এনবিসি নিউজের তথ্য মতে ২০১৫ সালে মিজরিয়োতে এক কিশোর পা ফসকে একটি লেকে পড়ে যায়। সেই লেকের পানির ছিল খুবই ঠান্ডা। সে কিশোর পানির নিচে ১৫ মিনিট ছিল। যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তখন তার কোন পাল্স রেট ছিল না। চিকিৎসকরাও তার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে বেঁচে যায়।

পানির নিচে অনেকেই দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে

পানির নিচে কতক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব, ছবি : ইন্টারনেট

অস্ট্রিয়ার হার্ভাটনিশে একজন বিশ্ব রের্কডধারী মুক্ত ডুবুরি বা ফ্রি ডাইভার যিনি ডুব দেওয়ার সময় নিজের সঙ্গে প্রচলিত শাষ-প্রস্বাসের কোন সরংঞ্জাম রাখেন না। তিনি একটানা ৯ মিনিটের জন্য তার শ্বাস বন্ধ রাখতে পারেন। এবং তার রেকর্ড ডাইভটি ২৫৩ মিটারের চেয়ে গভীর ছিল। যেটা ৭০ তলা আকাশচুম্বী অট্টালিকার সমান। বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তিনি তার ফুসফুসের ক্ষমতা ১৪ লিটার পর্যন্ত বাড়িয়েছেন বলে জানা গেছে। যেখানে একজন সাধারণ মানুষের ফুসফুসের ক্ষমতা গড়ে ৬ লিটার থাকে।

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে বালু বোঝাই একটি নৌযান বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষায় ডুবে যায়। সে ঘটনায় নৌযানের ইঞ্জিন চালক সোহাগ হাওলাদার নিখোঁজ ছিলেন। তার মৃতদেহ খোজার জন্য স্বজনরা ডুবুরি ভাড়া করেন। ৩০ ঘন্টা পর ডুবুরি দল সোহাগ হাওয়লাদারকে জিবিত অবস্থায় উদ্ধার করে।

সুস্বাস্থ্যের অধিকারী একজন মানুষ পানির নিচে প্রায় দুই মিনিট পর্যন্ত নি:শ্বাস ধরে রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চর্চা করলে এই সময় আরেকটু বাড়ানো যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, আপনি যদি শরীরকে অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত রাখেন তাহলে এর খারাপ প্রতিকৃয়া হতে পারে।

আরও পড়তে পারেন- বাংলাদেশের জাহাজ শিল্প: ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার হাতছানি

বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে লাইফ সায়েন্স ম্যাগাজিন বলেছেন একজন ব্যক্তি যখন ডুবে যায় তখন তার মধ্যে একটি মানসিক প্রকৃয়া কাজ করতে পারে। এটাকে মেডিক্যাল সায়েন্সের ভাষায় বলা হয় ‘ডাইভিং রিফ্লেক্স’। এই প্রকৃয়ার মাধ্যমে মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসের প্রকৃয়াটি ভিন্নভাবে কাজ করে। বিশেজ্ঞরা বলছেন, শরীরে যতটুকু অক্সিজেন সঞ্চিত থাকে সেটি মস্তিস্ক এবং হৃদ যন্ত্রে চাহিদা অনুযায়ি সরবরাহ করা হয়। সিল মাছ, ডলফিন এবং ভোদরের মধ্যে এ ধরনের প্রকৃয়া দেখা যায়। তবে এ বিষয়টি মানুষের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো ঘটতে পারে।

পানির নিচে সাধারণ দুই মিনিট বেঁচে থাকা সম্ভব

পানির নিচে সাধারণ দুই মিনিট বেঁচে থাকা সম্ভব, ছবি : ইন্টারনেট

একজন মানুষ যখন পানিতে ডুবে যায় তখন তার রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়। এবং হৃদ যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যায়। তখন শরীরের যেসব জায়গায় বেশি প্রয়োজন সেসব জায়গায় রক্ত সঞ্চালন আগে হয়। এটি সাভাবিক নিয়মেই ঘটে। সে ক্ষেত্রে মস্তিস্ক এবং হৃদযন্ত্র এমনকি কিডনি প্রাধান্য পায়।

২০১৫ সালে চীনের ইয়াংজু নদীতে চার’শ যাত্রী নিয়ে একটি প্রমোদতরী ডুবে গিয়েছিল। তখন ডুবন্ত জাহাজের তৈরি এয়ার পকেট থেকে কয়েকজন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে পানির নিচে এয়ার পকেটে একজন ব্যক্তি কতক্ষণ বেঁেচ থাকবেন সেটি নির্ভর করছে এয়ার পকেটটি কত বড় তার ওপর। এয়ার পকেটটি যদি ছোট হয় তাহলে নিশ্বাসের সঙ্গে কাবর্নডাই অক্সাইড বের হতে হতে জায়গাটি একসময় বিষাক্ত হয়ে উঠবে। সেখানে অবস্থানকারী ব্যক্তি দ্রুত মারা যাবেন। আর যদি বড় এয়ার পকেট হয় তবে বেশি সময় বেঁচে থাকা যাবে। তখন সেখানে অনেকক্ষণ ধরে নিশ্বাস নিলেও সোনে কোন হবে না।

২০১৩ সালে নাইজেরিয়ার একজন ব্যক্তি ছোট একটি ট্রাকবোড নিয়ে সমুদ্রে যান। এক পর্যায়ে সেটি ডুবে যায়। সে ব্যক্তিটি বোডের বাথরুমে আটকা পড়েন। সেখানে একটি এয়ার পটেক তৈরি হয়েছিল। ফলে এখানে ৩ দিন পর্যন্ত আটকে ছিলেন তিনি। পরে ডুবুরিরা তাকে সেখান থেকে জিবন্ত উদ্ধার করেন।

মূল: আকবর হোসেন (সাংবাদিক, বিবিসি)
শ্রুতিলিখন : রঙ পেনসিল ডেস্ক