নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত, ছবি : ইন্টারনেট
নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত, ছবি : ইন্টারনেট

নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত: রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বিশ্লেষণ

আর. রহমান

হিমালয়ের উত্তর অংশে সমুদ্র পৃষ্ট থেকে হাজার হাজার ফুট উচুতে অবস্থিত নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত। এর রাজধানী লাসায় বহুকাল বহিরাগত মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সে থেকেই এটি  নিষিদ্ধ দেশ হিসাবে পরিচিত হয় বিশ্বব্যাপি। ভারত ও চিনের মত দুটি প্রাচীন সভ্যতার মাঝে অবস্থিত হলেও তিব্বতের আছে নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি। বর্তমানে তিব্বত চীনের একটি শায়ত্বশাষিত অঞ্চল। তবে অনেক তিব্বতী এই অঞ্চলকে চীনের অংশ হিসাবে মানতে নারাজ।

 

তিব্বতের গড় উচ্চতা ১৫ হাজার ফুট

 

তিব্বতের আয়োতন এক লক্ষ দুই হাজার আটানব্বই বর্গ কিলোমিটার। উত্তরে নেপাল ও ভারত এবং দক্ষিণে হিমালয় পর্বতমালা অবস্থিত। তিব্বতের অন্যদিকগুলো বিশাল বিশাল পর্বত দাড়া পরিবেষ্টিত। সমুদ্র পৃষ্ট থেকে এর গড় উচ্চতা প্রায় ১৫ হাজার ফুট। এতো উচ্চতায় প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকাটাই তিব্বতবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিব্বতে রয়েছে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য, ছবি: ইন্টারনেট

তিব্বতে রয়েছে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য, ছবি: ইন্টারনেট

তিব্বতের সংস্কৃতি ধর্ম কেন্দ্রিক

 

তিব্বতের ইতিহাস মূলত তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ট ভাবে যুক্ত। তিব্বতের শাষকদের পৃষ্ঠপোষকায় তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের সূচনা হয়। এরপর থেকেই তিব্বতে ধর্ম কেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠে।

আনুমানিক ৬০০ খৃষ্টাব্দে ইয়ারলুং উপত্যাকার ‘গ্লাম রি স্রোং’ নামের এক গোষ্ঠিপোতি তিব্বত মাল ভূমির বিভিন্ন গোষ্টিকে একত্রিত করেন। ৬২৯ খৃ. তার পুত্র ‘সগামপো’ তিব্বতকে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। এরপর ‘গ্রোমেগান ছোস’ নামের এক ধর্ম শিক্ষক তিব্বতের ধর্ম ও রাষ্ট্রকে এক সূত্রে গাঁথে।

 

তিব্বত কেন নিষিদ্ধ দেশ

 

তিব্বত নিষিদ্ধ দেশ হিসাবে পরিচিতি পাওয়ার অন্যতম কারণ রাজধানী ‘লাসা’। ‘লাসা’ শব্দটির অর্থ ‘ল্যান্ড অব গড’ বা দেবতাদের বাসভূমি। তিব্বতীরা পায়ে হেঁটে শত শত মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে লাসার জখম মন্দিরে তীর্থ যাত্রা করেন। লাসা প্রাকৃতিক ভাবে অত্যন্ত দূর্গম।

এর ঠিক এক’শ কিলোমিটার দুরে গোবি মুরুভূমি। সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ১৬ হাজার ফুট উচুতে মুরুভূমি ভয়ানক পরিবেশ এই অঞ্চলকে বাইরের জগত থেকে বহুকাল আলাদা করে রাখে।

 

চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সমস্যা

 

তিব্বত বহুবার চীনের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। তিবব্বতের সম্পত্তি লুট ও এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে বেশ কয়েকবার আক্রমণও করেছে চীন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিব্বতীর সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে বৌদ্ধ ধর্ম। তাই প্রতিবারই আক্রমণের সময় চীনারা তিব্বতের মন্দির ভেঙ্গে ফেলে। এরমধ্যে ঐতিহ্যবাহী বেশ কয়েকটি মন্দিরও ছিল।চীনাদের আগ্রাসণ ঠেকাতে ত্রয়োদশ দালাইদামা ‘থুক  বস্তান গ্যা মতস’ তিবব্বতে বাইরের জগতের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে।

 

আরও পড়তে পারেন : সাহারা মরুভূমি : টেথিস সাগর থেকে মরু হওয়ার গল্প

 

দালাই লামার ক্ষমতা ও ধর্মবিশ্বাস

 

দালাই লামা হলো তিব্বতের প্রধাণ ধর্মগুরুর নাম। ১৩৯১ সালে ‘গেনদুন ফ্রপ’ সর্বপ্রথম দালাই লামা হিসাবে আবির্ভূত হোন। লাইলামা একাধারে তিব্বতের আধ্যাত্বিক ও শাষনতন্ত্রেরও প্রধান। তিব্বতীরা মনে করে দালাই দালামা বুদ্ধের অবতার। ‘লাসা’ শহরে অবস্থিত বিলাস বহুল পোতালা প্রাসাদে দালাই লামা বসবাস করেন। তবে বর্তমান চৌদ্দতম দালাই লামা ‘তেনজিন গিয়াতসো’ ভারতের ধর্মশালায় রাজনৈতিক আশ্রয় রয়েছেন।

তিব্বতীদের দালাই লামার উপর রয়েছে অগাত আনুগত্য, ছবি: ইন্টারেনেট

তিব্বতীদের দালাই লামার উপর রয়েছে অগাত আনুগত্য, ছবি: ইন্টারেনেট

তিব্বতীদের রয়েছে দালাই লামার প্রতি শর্তহীন ভক্তি ও আনুগত্য। এমনকি অতীতে একসময় দালাই লামার শুকনো বিষ্ঠা থেকে অসুস্থ্য তিব্বতীদের জন্য ওষুধ তৈরি হতো। তিব্বতীরা দালাই লামার ছবি সবসময় তাদের সঙ্গে রাখে। কোন বিদেশী ভ্রমণকারী দালাই লামার ছবি রাখলে তিব্বতীদের কাজ থেকে অধিক সমাধর পেয়ে থাকে।

 

বিস্ময়কর  ‘পোতালা প্রাসাদ ‘

 

বিখ্যাত ‘পোতালা প্রাসাদ’ বহির্বিশ্বের মানুষ সর্বপ্রথম দেখতে পায় ১৯০৪ সালে আমেরিকার ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ পত্রিকায়। এটি নির্মাণ করা হয় দালাইদামার বসাবাসের জন্য। সম্রাট ‘সগেন পো’ এর প্রতিষ্ঠাতা। ৬৪১ সালে তিনি একটি বিরাট জলাশয় ভরাট করে প্রাসাদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিব্বতের বিভিন্ন মন্দিরের ভেতরে সোনার তৈরি বড় বড় প্রদীপ মাখন দিয়ে জ্বালানো থাকে। চার হাজার ভরি ওজনের একটি প্রদীপও সেখানে আছে।

 

তিব্বতের অদ্ভুত যত রীতিনীতি

 

তিব্বতীদের জীবন ব্যবস্থা ও সামাজিক রীতিনীতি তিব্বতকে আরো রহস্যময়ী করে তুলেছে। তারা দালাইলামা নির্বাচন করে এক অদ্ভুত রীতিতে। কোনো দালাইলামা মারা গেলে বাকী লামারা ধ্যানে বসে। তাদের মধ্যে প্রধান লামা তাঁর অলৌকিক অভিজ্ঞতায় একটি ছবি আঁকেন। এরপর কয়েকজন লামা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সেই ছবির অনুরূপ একজন শিশু অবতার খুঁজেন। মজার ব্যাপার হলো তিব্বতীরা সহজে গোসল করে না। তারা শুকনা থাকতে পছন্দ করেন।

তিব্বতীদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হচ্ছে উকুন। তারা নিজের গায়ে উকুনের বাসা বাধিয়ে তা খেয়ে ফেলে। তিব্বতিদের সৎকার ব্যবস্থা যথেষ্ট ভয়ংকর। তারা সৎকারের জন্য প্রথমে মৃতদেহকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিচ থেকে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে ছোট ছোট টুকরা করে। সর্বশেষে মাংসের টুকরাগুলো শকুন দিয়ে খাওয়ায়। আর যেখানে সেখানে পরে থাকে বীভৎস কঙ্কাল। এ প্রক্রিয়ার বর্বরোচিত দৃশ্যটি শুধু পরিবারের সদস্যদেরই দেখার নিয়ম আছে।

মৃতদেহ সৎকারের এ প্রথা নিষ্ঠুর মনে হলেও বৌদ্ধ ধর্মের ধারণা চেতনা থেকেই এই প্রথা এসেছে। বৌদ্ধধর্মে মৃতদেহ সংরক্ষণকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়। তিব্বতে হাজার বছর ধরে চলে আসছে মৃতদেহ সৎকারের এই প্রথা। আজও তিব্বতের শতকরা ৮০ ভাগ বৌদ্ধ সৎকারের জন্য এই প্রথা বেছে নেয়।

আর পড়তে পারেন : এল ডোরাডো: খুঁজে না পাওয়া এক সোনার শহর

তিব্বতের রহস্যময় প্রকৃতি

 

তিব্বতের রহস্যের পেছনে এর প্রকৃতি ও দুর্গম পরিবেশ অনেকাংশে দায়ী। এর নিষ্ঠুর ও কষ্টদায়ক পরিবেশ এসব এলাকার মানুষকে কাছে আনতে নিরুৎসাহিত করে। তিব্বতের বেশির ভাগ ভূ-ভাগ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ হাজার ফুটেরও ওপরে অবস্থিত হওয়ায়, সেখানে বসবাস করা পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের চেয়ে বেশি কষ্টকর। তিব্বতের স্থলভাগ বছরের প্রায় আট মাস তুষারে ঢেকে থাকে। তিব্বতের চতুর্দিকে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য পাহাড় ও গুহা। সেই পাহাড়ি গুহাগুলোতে বাস করেন বৌদ্ধ পুরোহিত লামারা। প্রকৃতির পাশাপাশি তিব্বতের মানুষের জীবন যাপন নিয়েও বর্হি:বিশ্বে কৌতূহলের শেষ নেই।

 

তিব্বতীরা প্রেতাত্মা ভীতু

 

তিব্বতের লামা ও সাধারণ মানুষেরা প্রেতাত্মাকে খুবই ভয় পায়। অধিকাংশ তিব্বতির ধারণা, মানুষের মৃত্যুর পর দেহের ভেতর থেকে প্রেতাত্মারা মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ওই প্রেতাত্মা লাশ সৎকার হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষের ক্ষতি করার জন্য ঘুরে বেড়ায়। তারা কখনো মানুষের ওপর ভর করে, কখনো পশু-পাখি কিংবা কোনো গাছ অথবা পাথরের ওপরও ভর করে। প্রেতাত্মাদের হাত থেকে বাঁচতে ও প্রেতাত্মাদের খুশি রাখতে তিব্বতীরা পূজা করে থাকে।

 

নিজস্ব ভাষা ও সমাজ ব্যবস্থা আছে তিব্বতের

 

তিব্বতে সরকারি ভাষা হিসেবে চীনা ভাষার প্রচলন থাকলেও তিব্বতিদের ভাষার রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। তাই চীনের বেশ কিছু প্রদশ এবং ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানে তিব্বতি ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। তাছাড়া তিব্বতের সামাজিক অবস্থার কথা বলতে গেলে বলতে হয় এমন এক সমাজের কথা, যা গড়ে উঠেছিল আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে। তখন পীত নদীর উপত্যকায় চীনারা ‘জোয়ার’ (এক ধরনের শস্য) ফলাতে শুরু করে। অন্যদিকে আরেক দল রয়ে যায় যাযাবর। তাদের মধ্যে থেকেই তিব্বতি ও কর্মী সমাজের সূচনা হয়। তবে বিশ্ব দিন দিন আধুনিক হতে থাকলেও তিব্বত বিশ্বে রহস্যময় এক জায়গা হিসেবেই রয়েগেছে।

 

সূত্র :

১। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল

২। হিস্টোরি অরিজিনাল

৩।উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন পত্রিকা