দি সিটি অব আটলান্টিস
দি সিটি অব আটলান্টিস, ছবি : ইন্টারনেট

দি সিটি অব আটলান্টিস : হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার আদ্যোপান্ত

শাহরিয়ার ওয়াজেদ হা-মীম: আমাদের পৃথিবী হাজার বছরের পুরোনো। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক সভ্যতাই পৃথিবীর গতর জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে।কিছু সভ্যতা টিকে আছে কাগজে কলমে ও পুরাকৃতি হিসাবে। আবার কিছু সভ্যতার হদিস আজও মিলেনি ।তার মধ্যে দি সিটি অব আটলান্টিস অন্যতম। অনেকে একে দি লস্ট সিটি অব আটলান্টিস বলেও ডাকে।

আটলান্টিস সভ্যতা নিয়ে প্রথমবারের মত কথা বলেছিলেন দার্শনিক প্লেটো। তার ভাষ্যমতে, ‘প্রায় একলক্ষ পোনেরশ বছর আগে আটলান্টিসের উপস্থিতি ছিল। সে সময়কার অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার একটি ছিল এই আটলান্টিস। এর অবস্থান ছিল আটলান্টিক মহাসগারের মাঝে।’ আটলান্টিয়ানরা প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত ছিলো বলেও জানা যায়।

বিভিন্ন ইতিহাসবীদদের মতে, আটলান্টিসবাসী তাদের সাম্রাজ্য আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল থেকে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলো।দিনদিন তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাড়ে নিজস্ব প্রযুক্তির অপব্যবহারও। তবে প্রকৃতির কাছে হেরে যেতে হয় এই আটলান্টিসদের।দ্বীপ রাষ্ট্রটি ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের ফলে সাগারের অতল গহবরে হারিয়ে যায়। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় তাদের অস্থিত্ব। দি সিটি অব আটলান্টিস নিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের গল্প ও গুজব। তবে কিছু কিছু বিষয়ে একে বারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আটলান্টিস নিয়ে মিশরীয় সভ্যতায় অনেক তথ্য পাওয়া যায়

আটলান্টিস নিয়ে মিশরীয় সভ্যতায় অনেক তথ্য পাওয়া যায়, ছবি : ইন্টারনেট

যদিও আটলান্টিস বলে আদৌ কোন সভ্যতা ছিল কিনা এ নিয়ে অনেক তর্ক- বিতর্ক আছে।অনেকেই মনে করেন,
প্লেটো গ্রীকদের ক্ষমতা ও প্রযুক্তি নিয়ে সতর্ক করতে বানিয়ে আটলান্টিসদের গল্প বলেছিলেন।তবে ইতিহাস ঘাটলে আটলান্টিস নিয়ে মিশরীয় সভ্যতার হায়ারোগ্লিফিক্সে অনেক লিখা পাওয়া যায় । সেখান থেকে তা আরেক গ্রীক দার্শনিক সেলোন জানতে পারেন। পরে ধারণা করা হয় সেলোন থেকেই প্লেটো আটলান্টিস সম্বন্ধে ধারণা লাভ করেন।

জাতি হিসাবে আটলান্টিয়ানরা ছিলো অনেক উন্নত। প্রাচীন এ জাতির কাছে অদ্ভুত সব ক্ষমতা ছিলো। কথিত রয়েছে, তাদের কাছে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রন করার মত যন্ত্র ছিল, এমন আধুনিক অনেক অস্ত্র প্রযুক্তিও তাদের কজ্বায় ছিল। তবে তাদের সবচেয়ে বড় আবিস্কার ছিল দিক নির্দেশনা যন্ত্র। এমনকি তাদের কাছে স্ফটিক ছিল, যা দিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের শক্তি অর্জন করতো।যদিও এই বিষয়ে সঠিক কোন ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি।

আটলান্টিস নিয়ে জল্পনা কল্পনা আরো বেড়ে যায় প্লেটোর ‘টিমিয়াস’ ও ‘ক্রাইটিয়াস’ বই দুইটি পুনরুদ্ধার হওয়ার পর। ক্রাইটিয়াসে প্লেটো আটলান্টিস নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন।জানা যায়, তারা বছরে দু’বার কৃষিকাজ করতো। শক্তিশালী নৌ সেনা ও তাদের বৃত্তাকার দূর্গ প্রাসাদ ছিলো এমন বর্ণনাও পাওয়া গেছে তাতে।খোদ প্লেটো কোনো মনগড়া কাহিনী এত বিস্তারিত লিখবেন তা তখনকার ইতিহাসবীদরা বিশ্বাস করেননি। ফলে পুরো আটলান্টিক মহাসাগর চষে বেড়িয়েছেন অনেকে। কিন্তু আটলান্টিসের সন্ধান মেলেনি। একটা সময়ে প্রাচীন এই রহস্যটি ধামাচাপা পরে যায়। কিন্তু ১৯ শতকে হেরোডাটাসের প্রাচীন মানচিত্র আবিষ্কার হলে আটলান্টিস নিয়ে আবারও তোলপাড় শুরু হয়।

হেরোডাটাস ছিলেন গ্রীক পন্ডিত। তিনি পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র তৈরি করেন। তার তৈরিকৃত মানচিত্রে সাহারা মরুভূমির সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় আটলাস পর্বতের কাছে একটি জায়গাকে আটলান্টিস হিসেবে চিহ্নিত করা আছে। অদ্ভুতভাবে ঐ এলাকায় মরুভূমির মাঝে বৃত্তাকারা দূর্গ প্রাচীরের অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়।রহস্যপ্রেমীরা দ্বিধায় পড়ে যান।কেননা আটলান্টিসকে ধারণা করা হতো দ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে এবং ইতিহাসবীদদের মতে আটলান্টিস আটলান্টিক মহাসাগরেই তলিয়ে গেছে। তবে এই সাহারা মরুভূমির মাঝে হঠাৎ এর আগমন ঘটলো কি করে? সত্যি বলতে এর তেমন কোনো স্বীকৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার একটি ছিল এই আটলান্টিস

অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার একটি ছিল এই আটলান্টিস, ছবি : ইন্টারনেট

তবে ধারণা করা হয় ১১৫০০ বছর আগে আফ্রিকার অনেকাংশ আটলান্টিক মহাসাগরের নিচে ছিল এবং তারই মাঝে একটা দ্বীপ ছিল আটলান্টিস। ভয়ংকর সুনামি বা প্লাবনের কারণে আটলান্টিস সমুদ্রে তলিয়ে যায়। পরে কোন এক ভুমিকম্পের কারণেই আফ্রিকার এই অংশটা সমুদ্র তলদেশ থেকে উঠে আসে। এ তত্ত্বকে সমর্থন করে নানা প্রমাণও দেখানো হয়। যেমন আফ্রিকার এ তপ্ত মরুভূমির মাঝেও নীল তিমি বা বিভিন্ন সামুদ্রিক জীবের কংকাল পাওয়া যায়। যা থেকে ধারণা করা হয় এ অংশটি এককালে সমুদ্রের নিচে ছিলো।তবে কেউ কেউ আজও ধারণা করেন আটলান্টিস, আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশেই আছে।

জিব্রাল্টার প্রণালির কাছে বামিনি নামক জায়গায় দি সিটি অব আটলান্টাস-্এর অবস্থান বলে অনেকে মতবাদ দেন। সেখানে সমুদ্রের নিচে মানুষ তৈরি রাস্তা (দ্য বামিনি রোড) এর চিহ্ন পাওয়া গেছে তাই বেশির ভাগেরই ধারণা এটিই আটলান্টিসের ধ্বংসাবশেষ।

আটলান্টিস নামটি নিয়েও জল্পনা কল্পনার শেষ নেই।কেউ কেউ বলেন আটলান্টিকে এর অবস্থান হওয়ায় একে আটলান্টিস বলা হয়। কেউ বা বলেন আটলাস পর্বতের কাছে এর অবস্থান হওয়ায় একে আটলান্টিস ডাকা হয়। তবে প্লেটোর মতে, গ্রীক মিথোলজিতে দেবতা জিউস, সমুদ্রের দেবতা পোসাইডনকে আটলান্টিসের শাসনভার দেন।আটলান্টিস তার ছেলে আটলাসকে এর রাজা বানান।যিনি প্রায় অর্ধ শতাব্দী আটলান্টিস শাসন করেন। তার নামানুসারে একে আটলান্টিস ডাকা হয়।

আটলান্টিসকে ঘিরে প্রতিটি তত্ত্বই রহস্যময় ও একে নিয়ে জল্পনা কল্পনারও শেষ নেই।আজও অনেকে আটলান্টিসের খোঁজে ঘুরে বেড়ান। আবার অনেকে একে মিথ হিসেবে ভাবতেই ভালোবাসেন।হয়তো এমন একদিন আসবে, সেদিন দি সিটি অব আটলান্টিস নিয়ে বিস্তর জানা যাবে।