টিপু সুলতান

টিপু সুলতান: ভারতীয়দের ‘বীর যোদ্ধা’, ব্রিটিশদের ‘যমদূত’

টিপু সুলতানের মৃত্যুর খবর শোনার পর ভারতের ক্রমসম্প্রসারণশীল বৃটিশ সাম্রাজের পরিচালক রিচার্ড ওয়েলেসলি বলে উঠেন, ‘এখন গোটা ভারতবর্ষই  আমাদের।’ চার শব্দের এই বাক্য দিয়েই স্পষ্ট বোঝা যায় মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতান বৃটিশদের কাছে জমের মত ছিলেন। স্বাধীনচেতা টিপুর দেশাত্মবোধের দৃঢ়তার সঙ্গে খুব ভালোভাবেই পরিচিত ছিল ইংরেজ শাসকরা। তারা মোটেই স্বস্তিতে থাকত না সাহসী বীরযোদ্ধা টিপু সুলতানের ব্রিটিশবিরোধী আচরণে। তার মতো ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে এত ভাবেননি আর কোনো শাসক। তিনি একাধারে ছিলেন প্রচ- ধার্মিক মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল।

যেভাবে ‘মহীশুরের বাঘ’
ভারতের মহিশূর রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন টিপু সুলতান। তিনি শের-ই-মহীশুর নামে পরিচিত ছিলেন। উপাধিটা তখন ইংরেজদেরই দেয়। তার এই বাঘ (শের) হয়ে ওঠার পেছনে মূল কারণ হিসেবে ধরা হয় অসাধারণ ক্ষীপ্রতা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা আর কৌশলপূর্ণ রাজ্য পরিচালনা। বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন টিপু সুলতান। বাবা হায়দার ১৭৪৯ সালে টিপু নামে এক ফকিরের কাছ থেকে দোয়া লাভ করেন। তারপর ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর ঘর আলো করে আসে এক শিশুপুত্র। সেনাপতি হায়দার আনন্দিত হয়ে ওই ফকিরের নামেই ছেলের নাম রাখেন ‘টিপু’। মহীশুরের স্থানীয় ভাষায় ‘টিপু’ শব্দের অর্থ হলো বাঘ। হয়তো তাকে ‘শের-ই-মহীশুর’ ডাকার পেছনে এটাও একটা কারণ ছিল। অত্যধিক সাহসী এই বীর যোদ্ধা ছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধাচারী। তার তীব্র আকাক্সক্ষা ছিল ভারতকে স্বাধীন করার। সে জন্য তাকে ভারতের বীরপুত্রও বলা হয়।

শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরি নদীর একটি ব-দ্বীপে নির্মিত একটি দুর্গ থেকে তিনি রাজ্য শাসন করতেন টিপু সুলতান। বর্তমানে গ্রামটি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মান্ডিয়া জেলার অন্তর্গত। টিপু সুলতানের উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন পন্ডিত পুরণাইয়া। তিনি সামরিক তালিম নেন সরদার গাজী খানের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন বহুভাষায় পারদর্শী এবং প্রচ- ধার্মিক মুসলিম। নিয়মিত প্রার্থনা করতেন। এলাকার মসজিদগুলোর ওপর তার বিশেষ নজরদারি ছিল। তার শাসনকালে তিনি ১৫৬টি হিন্দু মন্দিরে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ দিতেন। বরাদ্দ পাওয়া এ রকম এক বিখ্যাত মন্দির হলো শ্রীরঙ্গপাটনার রঙ্গন অষ্টমী মন্দির।

টিপু সুলতানের ছিল বাঘের প্রতি ভালোবাসা

ছোটবেলা থেকেই টিপু, বাঘের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। বাবাই তাকে বাঘের গল্প শোনাতেন। কিশোর বয়সে টিপু সুলতান বাঘ পুষতে শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যখন সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন বাবার পুরনো সিংহাসনটি তিনি পছন্দ করলেন না। তাই তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কারিগর দিয়ে কাঠের ফ্রেমের ওপর সোনার পাত বসিয়ে তাতে মণিমুক্তা ও রত্নখচিত একটি সিংহাসন বানিয়ে নিলেন। আট কোণা ওই আসনটির ঠিক মাঝখানে ছিল একটি বাঘের মূর্তি। ৮ ফুট চওড়া আসনটির রেলিংয়ের মাথায় বসানো ছিল সম্পূর্ণ স্বর্ণে তৈরি দশটি বাঘের মাথা, আর ওপরে ওঠার জন্য ছিল দুধারে রূপার তৈরি সিঁড়ি। আর পুরো ব্যাঘ্রাসনটাই ছিল বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। সুলতানের রাজ্যের প্রতীক ছিলো বাঘ। এই বাঘ ছিল তার অনুপ্রেরণার মতো। তার রাজ্যের পতাকায় কানাড়ি ভাষায় লেখা ছিল ‘বাঘই ঈশ্বর’। তিনি সিংহাসনে বসে মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘ভেড়া বা শিয়ালের মতো দুই শ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দুইদিন বেঁচে থাকাও ভালো’ তার সমস্ত পরিধেয় পোশাক ছিল হলুদ-কালো রঙে ছাপানো আর বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। তিনি যে তলোয়ার ব্যবহার করতেন, তার গায়েও ছিল ডোরা দাগ। হাতলে খোদাই করা ছিল বাঘের মূর্তি। তার ব্যবহৃত রুমালও ছিল বাঘের মতো ডোরাকাটা। তার রাজ্যের সমস্ত সৈনিকের পোশাকে থাকত বাঘের ছবি। সৈন্যদের ব্যবহার্য তলোয়ার, বল্লম, বন্দুকগুলোর নল, কুদো, হ্যামারেও আঁকা থাকত বিভিন্ন আকারের বাঘের প্রতিরূপ কিংবা মূর্তি। এমনকি তিনি তার রাজ্যের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে, বাড়ির মালিকদের বাড়ির দেয়ালে বাঘের ছবি আকার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তখনো তার বাঘ পোষার বাতিক যায়নি। রাজবাড়িতে বেশ কয়েকটি পোষা বাঘ ছিল। ঘরের দরজার সামনে কিছু বাঘ বাঁধা থাকত।

পদে পদে সাহসীকতা দেখিয়েছেন

একবার এক ফরাসি বন্ধুর সঙ্গে টিপু সুলতান সুন্দরবনে গেলেন শিকারে। হঠাৎ বাঘের সামনে পড়ে যান তারা। ঠিক সেই সময়েই হাতে থাকা বন্দুকটি আর কাজ করছে না। অন্য কেউ হলে এমন পরিস্থিতিতে হয়তো ভড়কে যেত কিন্তু টিপু সুলতান ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। হাতে থাকা ছোট্ট ছোরা দিয়েই বাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর বাঘটি হত্যা করে দুজনেই প্রাণে রেহাই পেলেন। এমন বীরত্ব তিনি যুদ্ধের ময়দানেও দেখিয়েছেন। টিপু সুলতানের মতো আর কোনো শাসক মহীশুর রাজ্যকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেনি। সব সময় তিনি পরিকল্পনা করতেন কীভাবে ব্রিটিশ শাসন থেকে রাজ্যকে বাঁচানো যাবে। তাই তো যুদ্ধাস্ত্রে হয়েছিলেন সমৃদ্ধ। ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনি যেসব হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন তা ছিল অত্যন্ত আধুনিক মানের এবং ব্যতিক্রমী। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম রকেট লাঞ্চার প্রযুক্তি ব্যবহার করেন টিপু সুলতান। ১৭৮৬ সালে টিপু সুলতান ৭২ কামানের ২০টি যুদ্ধজাহাজ এবং ৬২ কামানের ২০টি রণতরী দিয়ে তার নৌবাহিনীকে সুসজ্জিত করেন। ১৭৮৯ সালের মধ্যেই টিপু সুলতানের প্রায় সব জাহাজই তামার পাটাতনে উন্নীত করা হয়। ১৭৯০ সালে তিনি কামালুদ্দিনকে তার ‘মীর বাহার’ পদে নিযুক্ত করেন এবং জামালাবাদ এবং মাজিদাবাদে সুবিশাল ডকইয়ার্ড নির্মাণ করেন।

টিপুর মৃত্যু ও ব্রিটিশদের আনন্দ

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধ করেন ‘মহীশুরের বাঘ’ টিপু সুলতান। কিন্তু এক সেনাপতি মীর সাদিকের বিশ্বাসঘাতকতায় ব্রিটিশদের কাছে টিপু পরাজিত হন। ১৭৯৯ সালের ৪ মে টিপু নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের মানুষজনকে ভেলোরের দুর্গে বন্দী করে রাখে ব্রিটিশ শাসকরা। এরপর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তনমে লুটতরাজের এক মহোৎসব শুরু হয়। উইলিয়াম উইল্কি কলিন্সের বিখ্যাত লেখা ‘দ্য মুনস্টোন’ উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটি শুরু হয় এই লুটতরাজের বর্ণনা দিয়ে। টিপু সুলতান যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তিনি শাহাদাতবরণ করলে শুধু হিন্দুস্থানই নয়, গোটা মুসলিম বিশ্ব যেন স্বাধীনতার এক অতন্দ্র প্রহরী হারিয়ে অভিভাবকহারা অবস্থায় পড়ে যায়। ভগবান এস গিদোয়ানীর তার ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘মহীশুরের বাঘ’ টিপু সুলতানের মৃত্যু সংবাদ শুনতে পেয়ে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিচালক ব্যক্তি রিচার্ড ওয়েলেসলি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন।  টিপুর মৃত্যু ছিল তাদের কাছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো। টিপুর মৃত্যুর পর ব্রিটেনেও আনন্দ উল্লাস করা হয়। টিপু সুলতানের শেষ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় নামকরা চিত্রকরদের কাজগুলো দেখলে তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।টিপু সুলতান নিহত হলে তার প্রাসাদটি ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেন মহারাজা কৃষ্ণরাজা ওয়াদেয়ার তৃতীয়। টিপু সুলতানের আমলে এই প্রাসাদে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু টিপু সুলতান নিহত হওয়ার ৯ বছর পর প্রাসাদটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১৮৩১ সালে এই প্রাসাদটি ব্রিটিশ শাসককের প্রশাসনিক সদর দফতরে পরিণত হয়। সুলতানের প্রতি পুরনো আক্রোশের বশে এই প্রাসাদের একটা অংশ নিলামে বিক্রি করে দেয় ব্রিটিশ শাসকরা। টিপু সুলতানের সিংহাসনটি পর্যন্ত স্থানান্তর করা হয় এখান থেকে। টিপু সুলতানের ব্যবহৃত একটি তরবারি এবং কিছু চিত্রকর্ম এখন এই প্রাসাদের সাক্ষী। মহীশুরে তার শাসনামলের একটা খ-চিত্রও পাওয়া যায় এখানে। প্রাসাদের সামনে লম্বা লন, ঠিক নবাবি আমলের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এখনো।

টিপুর মৃত্যুর পর তাকে ‘বীর’ এবং ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দেয়া হলেও অনেকেই তাকে স্রেফ ‘বর্বর’ এবং ‘খুনী’ হিসেবে অবহিত করেছেন। ‘টিপু সুলতানঃ দ্য টায়রান্ট অব মহীশুর’ নামের ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা সন্দীপ বালাকৃষ্ণা টিপুভক্তিকে ‘ইতিহাসের একটি খোলাখুলি বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সন্দীপ এবং অন্যান্য টিপু-সমালোচকদের দাবি, টিপু গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছেন, হিন্দুদের মন্দির, খ্রিস্টানদের চার্চ ধ্বংস করেছেন, অন্তত দশ হাজার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছেন। বলা হয়ে থাকে, কর্ণাটকের কোদাভা সম্প্রদায়ের হিন্দুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে টিপু বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দীকে চাপের মুখে ইসলামে দীক্ষিত করেন। এছাড়া মালাবার ও কালিকূট আক্রমণেও এমন ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটে বলে টিপু-বিরোধীরা দাবি করে থাকে। যদিও ইতিহাসের এই বরপুত্রকে নিয়ে নেতিবাচক কোন মন্তব্য বা ব্যাখ্যাই যুক্তি দিয়ে প্রমাণিত হয়নি। তাই টিপুর দেশপ্রেম ও শাসন ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের কাছে এখনো বিস্ময়কর।

টিপু সুলতান মূলত বেঙ্গালুরের শ্রীরঙ্গপত্তনম অঞ্চলের একটি দূর্গ থেকে রাজ্য শাসন করতেন৷ তার একপাশে বয়ে গেছে কাবেরী নদী। বর্তমানে সেটি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মান্ডিয়া জেলায় অবস্থিত। যেখানে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তার গড়ে তোলা রাজপ্রাসাদ। এখান থেকেই বিভিন্ন জায়গায় তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তার ভয়ে ওই সময় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে পানি খেত। যেখানে অন্যায় সেখানে টিপুর তলোয়ার গিয়ে ব্র্যঘ্রের মতো হাজির হতো।  টিপু সুলতানের একটি প্রবাদ বিখ্যাত হয়ে আছে- তিনি বলতেন, ‘ভেড়া বা শিয়ালের মতো দু’শ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু’দিন বেঁচে থাকাও ভালো’।