চীন ভারত বাণিজ্য যুদ্ধ
চীন ভারত বাণিজ্য যুদ্ধ, ছবি : ইন্টারনেট

ভারতের পক্ষে কী চীনের পণ্য বয়কট করা সম্ভব?

জাহিদ হাসান মিঠু

লাদাখে চীনের সৈন্যরা ২৩ ভারতীয় সেনাকে হত্যা করার পর ভারত জুড়ে এখন ‘বয়কট চায়না’ রব উঠেছে। অনেক ভারতীয় গুগলে চীনা পণ্যের তালিকা খুঁজছেন। কিন্তু বাস্তবে কী ভারতীয়রা চীনের পণ্য বয়কট করতে পারবেন? উত্তর হচ্ছে না। ভারতের পক্ষে চীনের পণ্য পুরোপুরি বয়কট করা সম্ভব না৷ কারণ চীনের পণ্য শুধু ভারত নয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আপাতত ভারতের নাগরিকরা কিভাবে চীনের পণ্যের উপর নির্ভরশীল তা জেনে নেওয়া যাক।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভারতের মোট আমদানিকৃত পণ্যের ১৬.৪ শতাংশ ছিল চীনের। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ১৩.৭ শতাংশে। কিন্তু ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে চীন থেকে ভারতে পণ্য আমদানির হার আবার বেড়ে গেছে। এবং তা প্রায় ১৪.১ শতাংশ। এ তো গেল পণ্যের হিসাব। এবার একটু অর্থের হিসাব দেখা যাক।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে চীন থেকে ভারত মোট ৭৬.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করে। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৭০.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের (ভারতের অর্থবছর) প্রথম ১১ মাসে চীন থেকে ৬২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারত যে সকল পণ্য চীন থেকে আমদানি করেছে তার ৯৭ ভাগই উৎপাদিত পণ্য। এবং এর মধ্যে ১৯.৫ শতাংশ রাসায়নিক, ৩০.৯ শতাংশ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ৩১.৯ শতাংশ ইলেকট্রনিক্স পণ্য।

সত্যিকার অর্থে চীনের পণ্য ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি অংশ দখল করেছে। ভারত যে ঔষধ উৎপাদন করে তার কাঁচামাল আসে চীন থেকে। এছাড়া বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামও চীন থেকে আসে। বিদ্যুৎ ছাড়া বর্তমানে একটি দিনও কল্পনা করা কঠিন। ভারত যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার যন্ত্রপাতি চীনে তৈরি। ২০১৯ সালে চীনে থেকে মোট ১৩.৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর আমদানি করেছে ভারত।

আবার কম্পিউটারের কথা ধরুন। ভারতে যেসব কম্পিউটার তার অধিকাংশই চীনে অ্যাসেম্বেল করা। আবার যদি খাবারের কথা বলেন সেদিকেও ভারত চীনের উপর নির্ভরশীল। শি জিনপিংয়ের দেশ থেকে রাসায়নিক সার কিনতে হয় ভারতকে। এছাড়া আরো বেশ কিছু রাসায়নিক সার উৎপাদনের কাঁচামালও আসে সেখান থেকে। এখানে শেষ না। ভারতীয়রা যে প্যাকেটজাত দুধ খেয়ে থাকে সেখানে চীনের প্রভাব। যেসব কোম্পানি প্যাকেটজাত দুধ উৎপাদন করে তাদের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি আসে চীন থেকে। বর্তমানে চীন থেকে ভারতে মোবাইল ফোন আমদানি কমেছে। তবে বেড়েছে মোবাইলের পার্টস আমদানি।

ভারতের বর্তমান সরকার জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক হিসেবে প্রচার করে থাকে। তারা সবসময় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে উৎসাহ দিয়ে থাকে। কিন্তু চীন শুধু ভারতে পণ্য রপ্তানি করেই বসে নেই। তারা ভারতের ব্যবসার বড় একটি অংশও দখলে নিয়েছে।

গেটওয়ে হাউস নামে একটি প্রতিষ্ঠান মার্চে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অন গ্লোবাল রিলেশন্স’ বিষয়ের উপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। যেখান থেকে জানা যাচ্ছে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি কোম্পানিতে চীন বিনিয়োগ করেছে।

অপরদিকে ভারতের কোম্পানিগুলোতে চীনের মোট বিনিয়োগ প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে ভারতের স্টার্টআপ কোম্পানিগুলো যখন শুরুর দিকে লোকসান গুণছিল তখন তাদের দেশের ভেতর থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফ্লিপকার্ট ও পেটিএমের মতো কোম্পানিগুলো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তখন সেখানে চীন ও পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ করা হয়। এবং এই কোম্পানিগুলো পরে ঘুরে দাঁড়ায়।

লিখতে গেলে আরো অনেক বিষয় তুলে ধরা সম্ভব। তবে যতটুকু তথ্য উল্লেখ করেছি এ থেকেই বোঝা যায় যে ভারতের পক্ষে চীনকে বয়কট করা সম্ভব না। খুব চেষ্টা করলে কিছু পণ্য আমদানি কমে যাবে। কিন্তু চীনের পণ্য পুরোপুরি বয়কট করা সম্ভব হবে না। এবং এটা বিশ্বের সব দেশের জন্যই ধ্রুব সত্য।