গাজী সাইফুলের গল্প ‘যদিও সে মানবী’

রেডিও ৮৯.৬ এফ এম-এ বেশ কিছুক্ষণ হল একটা হিন্দি গান ছেড়ে দিয়েছে- মেরে পিয়া ঘার আয়ে-গা ও রামজি! বেশ বেফাসের মত। নিশুথির বড্ড অপছন্দ এ গান। সন্ধ্যের সময়টায় মাঝেমধ্যে রবীন্দ্র সংগীত সরব হয়ে উঠে রেডিওতে। সে এ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমের বারান্দায়। এখান থেকে গলির ভেতরের সরু রাস্তাটা স্পষ্ট দেখা যায়। দুপুর থেকে ইলেকট্রিসিটি নেই। মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ার এ এলাকাটা কিছুটা কিম্ভূতকিমাকার। একটা অন্ধকার জমতে শুরু করেছে এরইমধ্যে। নিশুথি কাউজে খুঁজছে, বাড়ির গেইটে সামান্য শব্দ হলেই বারবার গলা উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করছে কেউ আসছে কিনা। মুহিন এখনও এলো না। এরমধ্যে ল্যান্ডফোনে বারবার কে যেন ফোন দিচ্ছে; রিসিভ করার পর কেউ কথা বলছে না। এখন পৌষের প্রথম দিক, তিরতিরে একটা ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে এরিমধ্যে। সন্ধ্যের পর হালকা হালকা কুয়াশা পড়ছে।

-আফনের চা; খাইয়া লন। জুড়াইয়া যাইব। কাজের মেয়ে সুরমা চা নিয়ে এসেছে। নিশুথি পেছনে একবার ঘুরে তাকাল।
-রেখে যা; জে আচ্ছা। বলেই সে ভেতরের ঘরের দিকে যাচ্ছিল; সু্রমা…… এরপর কি একটা ভেবে দাঁড়িয়ে পরল।

-আফা হারিকেন দিমু?
-হ্যাঁ, দাও। এরপর সুরমা ঘরের কোণে পেরেকের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হারিকেনটা নামায়। চিমনিটা আলতো উঠিয়ে একটা ম্যাচের কাঠি খরচ করেই বেশ দক্ষতার সাথে হারিকেনটা ধরায়। একটু পরেই হারিকেন হাতে ফিরে এল সে;
-আফা ধরেন; মুখে দু-নম্বরি একটা থমথমে হাসি। বারান্দার কোণে রাখা টি-টেবিলে রাখল হ্যারিকেনটা।
-কিছু বলবে?
-জে আফা; মুহিন ভাইজানে কহন আইব; টেবিলো খাওনদাওন দিয়া দিছি।
-হু। এরপর আর কোন উত্তর দেয়নি সে। বারান্দার অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে রইল। সুরমা কোন উত্তর না পেয়ে ফিরে গেল। এরপর এভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
-আজ এত দেরি করছে কেন? চারপাশে ভিড় জমাতেশুরু করেছে উপশিরা বেয়ে আসা অস্থিরতাগুলো। চিকন একটা ঘামের সরু স্রোত এরই মধ্যে কপাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে। নিঃশ্বাসটা কেমন আটকে আসছে। শরীরের চাদরটাকে খুলে পাশের চেয়ারে রাখে নিশুথি।
-এরপর পেছন থেকে ফিসফিরে একটা শব্দ; কি করছো পরী! পেছন থেকে ফিসফিসে একটা শব্দ। আচমকা বুকটা কেমন ধপ করে উঠল। পাশ ফিরেই দেখে মুহিন। নিশুথি বুকে কিঞ্চিৎ থুথু ছিটিয়ে দেয়। পেছন দিক হয়ে ভড়কে দেয়ার ভয়টা বুকে গেঁথে গিয়েছে। কণ্ঠটা কেমন কাঁপা কাঁপা।

-আজ এত দেরি করলে? কখন থেকে………
-হুমম; একা একা দাঁড়িয়ে আছ? বলতে বলতে খাকি রঙের চাদরটাকে ওর শরীরের সাথে আরো ভালো করে জড়িয়ে দেয় শরীরের সাথে। বাহিরে ঠান্ডা পড়ছে, চল ভেতরে যাই।
-না। এখন না। আরো কিছুক্ষণ দাঁড়াই। চারদিকের অন্ধকারটা ভালই লাগছে। মুহিন আরো কিছুটা পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায় নিশুথির। শরীর হতে ব্ল-স্কাই পারফিউমের একটা উষ্ণ গন্ধ ভেসে আসছে।
-এই যা। উদ্দেশ্য কি? মুখে লাজুক একটা হাসি লেগে আছে। তড়িৎ গতিতে এক পা পিছিয়ে যায় সে, যেন মুহিনের উদ্দেশ্যটা স্পষ্টই বুঝতে পেরেছিল না। ওদের বিয়ে হয়েছে মাস-ছয়েক। পরষ্পরের প্রতি ভালোবাসাটা এখন ভবিতব্য মেয়ে পরীকে ঘিরে!
-ডিনার করে নাও।
-না, আজ করব না। ইটিভির গলিতে উৎপলের জন্মদিনের পোগ্রাম ছিল; খেয়ে এসেছি।
-ও আচ্ছা। কফি খাবে? কফি দেব এক কাপ?
-দিতে পার। কিছুটা হাসার চেষ্টা করল মুহিন। মুখে কিছুটা হতাশার ছোপ তুলে নিশুথি। মুহিন বেশ তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও অকারণে হাসে। হাসি রোগ আছে খুব সম্ভবত। যখন-তখন হাসাটা পুরুষ মানুষের জন্য বেশ অপ্রীতিকর ব্যাপার। সোজা রান্না ঘরের দিকে চলে যায় সে।

এরপর গুটিগুটি পায়ে আবছা অন্ধকারের মধ্যেই কফি নিয়ে আসে সে। মুহিন মধ্যখানের সময়টি বারান্দার অন্ধকারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল। হাওয়ার ঝাপটায় মৃদু কাঁপছে হারিকেনের আলোটা। হারিকেনের একটা স্পষ্ট ছায়া পড়েছে দেয়ালে। আলো-ছায়ার একটা খেলা। নিশুথি হারিকেনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দেয়। চিমনির ফাঁক দিয়ে কেরোসিনে পোড়া সরু একটা কালো ধোঁয়া উঠছে। তারপর দুজনের মুখে বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা নেই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল একদম পাশাপাশি। নিশুথি মাঝে মাঝে বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলছে। গরম নিঃশ্বাসের আঁচটা গালে এসে পড়ছে মুহিনের।

এরমধ্যে বারকয়ের ল্যান্ড ফোনটি বাজছে; গলার স্বর কিছুটা নিচু করে মুহিন, কি হল? গিয়ে ফোনটা রিসিভ করো।
-ইচ্ছে করছে না। তুমি যাও।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ড্রইং রুমে থাকা ফোনটা রিসিভ করে নিশুথি। পক্ষণেই ফিরে এল।
-কে ফোন করেছিল? কিছুটা কৌতূহল নিয়ে জানতে চায় মুহিন।
-বুঝতে পারছি না!
-মানে?
-এর আগেও রিসিভ করেছি, কেউ কথা বলছে না।
-ও আচ্ছা। কফির কাপটি পাশের টেবিলে রাখে। খুট করে একটা শব্দ হয়। অন্ধকারটা এরই মধ্যে গাঢ় হতে শুরু করেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো এরই মধ্যে জ্বলতে শুরু করেছে। চারদিকে কুয়াশা আছে কিছুটা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ নিয়নের আলোটা অস্পষ্ট হয়ে আসছে। সন্ধ্যের পর পর নিশুথি আগে কিছুটা সময় হাঁটতে বের হত একা একা। এখন আর খুব একটা বের হওয়া হচ্ছে না আজকাল। ঢাকা শহর সন্ধ্যের পর নিরাপদ না। কখন কোথায় কি হয় বলা মুশকিল। পরীর এখনও সাত মাস চলছে; একা একা কোথাও না যাওয়াটাই বোধ হয় না। পশ্চিমের দিকে ছোট্ট একটা মান্দাল গাছ। বেশ দীর্ঘ একটা ছায়া পরেছে। এ ঢাকা শহরে মান্দাল গাছ পাওয়া খুব কঠিন। তবে এ বাড়িতে আছে। এ বাড়ির মালিক রহিস উদ্দিন উনি বৃক্ষ প্রেমিক। বাড়ির ছাদেও হাবিজাবি অনেক গাছ লাগিয়েছেন। উনি খুব হাশিখুশি মানুষ; সে মাঝেমধ্যে ছাদে যায়। রহিস উদ্দিন সাহেবের বাগান দেখতে। ওর ভাল লাগে, উনি খুব বেশি কথা বলেন। কথা বলার সময় মুখ দিয়ে থু থু ছিটান। এটা নিশুথি পছন্দ না। তবুও ভদ্রলোককে ভাল লাগে ওর। নিজের মেয়ের মত দেখেন।

মুহিন সারাদিন থাকে অফিসে। ঢাকা শহরের ফ্ল্যাট বাড়ি, এখানে কারো সাথে কারো যোগাযোগ নেই। কর্পোরেট জীবন। কাউকে দেখার মত কেউ নেই। সারাদিন থাকে একা একা বাসায়; পরীর দিকেও খেয়াল রাখতে হয় এখন।

পরী বিছানায় খেলছে, মুহিন পাশের টেবিলে কিছু একটা লিখালিখি করছে। একটু পর নিশুথি এল; ছাদে গিয়েছিল। মা কে দেখতে পেয়েছি পরীর হাসিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ওর এখন দু মাস। দাঁত এখনও উঠেনি; পরী দেখতে একদম ওর বাবার মত হয়েছে। মেয়েকে এসেই কোলে নেয় সে। সামনে বৈশাখ; এটা পরীর প্রথম। মেয়ের জন্য নিজের হাতেই জমা কাপড় সেলাই করেছে নিশুথি। কত কত হৈচৈ। এবারের আনন্দটা বোধ হয় ভিন্ন। পরীকে মা বলতে বললে পরী আ আ বলে ডাকে; তখন নিশুথির মুখের উচ্ছল হাসিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মুহিন।

এইতো মাসতিনেক আগেও নিশুথি একবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। মুহিন অফিসে ছিল। রহিস সাহেব পাশের ফার্মেসি থেকে ডাক্তার ধরে নিয়ে এলেন। পরে মুহিন যখন অফিস থেকে ফিরে এত ওর সেকি কান্না।
-কাঁদছ যে? তোমার কি ভয় লাগছে? ভয় নেই আমি আছি তোমার পাশে। দেখো কিছুই হবে না। অকারণে ভয় পাচ্ছ। বলেই তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল মুহিন।

সে কাঁদছে। বোধ হয় মা হবার আনন্দে। পৃথিবীর প্রতিটি মেয়ের কাছেই মা হবার যে আনন্দ এখানে অন্য সব আনন্দ ফিকে হতে হারিয়ে যায়। এ অশ্রু আনন্দের। সে কেমন যেন বড় বড় করে দুটো নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসল। মুহিন তাকে ধরে খুব সাবধানে বসিয়ে দিল। তারপর বুক ঠেলে উঠা কান্নাটা কেমন আস্তে আস্তে করে থামিয়ে শান্ত স্বরে;

-আচ্ছা এ সন্তান দেখতে ঠিক কার মত হবে? বলতে গিয়ে কেমন যেন লজ্জা পেয়ে গেল সে। কে কেমন প্রশ্ন! এ প্রশ্ন করাটা বোধ হয় উচিৎ হয়নি। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কেমন করে যেন। জানতে খুব ইচ্ছে করতে তাই হয়ত।

-তোমার মত। বলেই হিহি করে হেসে উঠল মুহিন। মুহিনের হাসিতে তার লজ্জাটা আরো কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়। নিশুথির কান দুটো কেমন লাল হয়ে উঠে। লজ্জা কেমন যেন প্রবাহিত হয়।
-আচ্ছা নাম কি রাখবে?
-জানিনা। বলেই এক ঝটকায় মুহিনের হাত থেকে নিজের হাতটি ছুটিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিল সে। মুহিন লক্ষ্য করল সে কেমন কেন অস্বাভাবিক রকম একটা লজ্জা পাচ্ছে । তবুও মুহিনের ইচ্ছে করছে মেয়েটিকে সে আরো অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করুক। মেয়েটা আরো লজ্জা পাক। লজ্জায় আরো লাল হয়ে উঠুক। লজ্জায় কাঁথা চেপে মুখ লুকোক। লজ্জা কেমন প্রবাহিত হয়।
-আচ্ছা যদি ছেলে হয় তাহলে নাম রাখব রক্তিম।
-আর যদি মেয়ে হয় তাহলে?
-তাহলে কি? জানতে চায় নিশুথি।
-মেয়ের নাম রাখতে তুমি; হা হা হা……………… মুহিনের হাসিটা আজ কেমন বিচ্ছিরি মনে হল ওর কাছে! ভেতর ঘর থেকে পরী ডাকছে। তেবিলে খাবাড় দেয়া হয়েছে; এখন আর কাজের মেয়েটি নেই। পরীই হেল্প করে নিশুথিকে টুকিটাকি।
-আসছি; এরপর আর অপেক্ষা করেনি নিশুথি;