কাজী নজরুল ইসলাম
কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম: রুটির দোকান থেকে মানুষের অন্তরে

গণমানুষের কবি, সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর (১৮৯৯-১৯৭৬) জীবন হাজার রকম বৈচিত্র্যে ভরা। প্রথম জীবনে আসানসোলে রুটির দোকানের কর্মচারী, পরে সেনাবাহিনীর হাবিলদারের জীবন এবং তারপর সৃষ্টিশীল লেখক জীবন। নানা বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্য জীবন তার। তার জীবনের নানা অংশজুড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর গণমানুষের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

কাজী নজরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি ও সংগীতজ্ঞ। তার জন্ম ১৮৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে। তিনি স্থানীয় মক্তবে কোরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে নজরুলের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে তাকে নামতে হয় জীবিকা অর্জনে। স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজও করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ১৯১০ সালে কাজী নজরুল ইসলাম লেটোদল ছেড়ে ছাত্রজীবনে ফিরে আসেন।

কিছুদিন আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ করেন। বেশ কষ্টের মধ্যেই তার বাল্যজীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এই দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনিই নজরুলকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৫ সালে তিনি আবার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। এ বছরের শেষ দিকে মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়ে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। প্রায় আড়াই বছর ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক করপোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার হয়েছিলেন। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষ হলে তিনি সৈনিকজীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল।

১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচিত হন। তার সঙ্গেই তিনি প্রথম কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সঙ্গে। যার সঙ্গে তার পরিণয় হয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে আবার কুমিল্লায় ফিরে যান। ২১ নভেম্বর ছিল সমগ্র ভারতব্যাপী হরতাল। এ উপলক্ষে নজরুল আবার পথে নেমে আসেন; অসহযোগ মিছিলের সঙ্গে শহর প্রদক্ষিণ করেন আর গান করেন—‘ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী’। তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে খ্যাতি লাভ করে। ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট তিনি ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রায় চার হাজার গান, বহু কবিতা রচনা করেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকায় আসেন। এ সময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। দীর্ঘকাল অসুস্থ থাকার পর ১৯৭৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি প্রায় চার হাজার গান, বহু কবিতা রচনা করেন

তিনি প্রায় চার হাজার গান, বহু কবিতা রচনা করেন

কাজী নজরুল ইসলামের যৌবনের কিছুটা সময় কেটেছে কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরে। মোট পাঁচবারে সেখানে প্রায় ১১ মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন কবি। তরুণ কবি নজরুল ১৯২১ সালের এপ্রিলে কুমিল্লার দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন। সেখানে বাড়ির পাশের কামরাঙা গাছতলায় বাঁশিতে সুর তুলে, আর পুকুরঘাটে বসে কবিতা লিখে লিখে সময় কেটেছে তার। নজরুলের প্রথম প্রেম সৈয়দা খানম (নজরুল তাকে নাম দেন নার্গিস, ফার্সি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম)। তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকালে নার্গিসের মামা ক্যাপ্টেন আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নজরুলের। ১৯১৯ সালে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। নজরুল তখন মুসলিম সাহিত্য সমিতির (কলকাতা) অফিসে আফজাল-উল হকের সঙ্গে থাকতেন। ওই সময় আলী আকবর খানের সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। আকবর খান নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে কুমিল্লায় তার গ্রামের বাড়িতে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। আলী আকবর খানের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে কলকাতা থেকে ১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেইলে নজরুল কুমিল্লা এসে পৌঁছেন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ছাড়ার পর এটিই ছিল নজরুলের প্রথম পূর্ববঙ্গ যাত্রা। যাওয়ার পথে তিনি ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ কবিতাটি লিখেন। ট্রেনে কুমিল্লা পৌঁছে নজরুলকে নিয়ে আলী আকবর খান তার স্কুলের বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় ওঠেন। চার-পাঁচ দিন সেখানে কাটিয়ে কবি রওনা দেন দৌলতপুরের খাঁ বাড়ির উদ্দেশে। তবে সেই চার-পাঁচ দিনেই সেনবাড়ির সবাই বিশেষ করে বিরজাদেবীর সঙ্গে নজরুলের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। নজরুল তাকে ‘মা’ সম্বোধন করতেন। দৌলতপুরে নজরুলের জন্য আলী আকবর খানের নির্দেশে উষ্ণ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ির জ্যেষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে খুব অল্প সময়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে নজরুলের। কবিতা শুনিয়ে, গান গেয়ে তাদের তো বটেই দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন ছুটে আসত কবির নৈকট্য লাভের আশায়। আলী আকবর খানের বোন আসমাতুন্নেসার বিয়ে হয়েছিল খাঁ বাড়ির পাশেই। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় আসমাতুন্নেসা তার ভাইয়ের বাড়িতে তেমন সমাদর পেতেন না। আসমাতুন্নেসার স্বামী মুনশি আবদুল খালেক একটি মেয়ে রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। আর সেই মেয়েটিই কবি নজরুলের প্রথম প্রেম নার্গিস। নার্গিসের সঙ্গে কবির আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছিল কবির বাঁশি বাজানো নিয়ে। এক রাতে কবি খাঁ বাড়ির দিঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হন নার্গিস। খাঁ বাড়ির মুরব্বিরা নার্গিসের বর হিসেবে নজরুলকে তেমন পছন্দ করতেন না। নজরুলকে তারা ছিন্নমূল বাউণ্ডুলে হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু গ্রাজুয়েট আলী আকবর খানের চাপে তারা প্রতিবাদ করতেন না। এক পর্যায়ে খোদ নজরুলই বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। ফলে ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ আষাঢ় বিয়ের দিন ধার্য হয়। এরপর শুরু হয় নাটকীয়তা। আলী আকবর খান তার গ্রাম্য ভগিনীকে বিখ্যাত কবি নজরুলের জন্য গড়তে নেমে পড়লেন।

অশিক্ষিত নার্গিসকে খুব কম সময়ে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিনি শরত্চন্দ্র ও অন্যান্য সাহিত্যিকের উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো থেকে নার্গিসকে জ্ঞান দিতে থাকলেন। নজরুলের এসব ভণিতা একেবারেই পছন্দ ছিল না, তিনি আলী আকবর খানকে তা জানালেও তিনি নজরুলকে পাত্তা দেন না।

সেই সঙ্গে খুব দ্রুত বিয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন, নিমন্ত্রণপত্রও অতিথিদের মাঝে বিলিয়ে ফেলেন। এসব ব্যাপার নজরুলকে পীড়া দেয়, আস্তে আস্তে তার মোহ ভাঙতে থাকে। এর ফাঁকে আলী আকবর খান সবার অগোচরে আরও একটি কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি নজরুলের জন্য কলকাতা থেকে আসা বন্ধুদের সব চিঠিই সরিয়ে ফেলতেন, সেই সঙ্গে নজরুলের পাঠানো চিঠিও পোস্ট না করে নিজের কাছে রেখে দিতেন।

এদিকে কাজী নজরুল ইসলাম বিয়েতে তার পক্ষের অতিথি হিসেবে বিরজাসুন্দরী দেবী ও তার পরিবারকে মনোনীত করেন। বিয়ের আগের দিন সবাই দৌলতপুরে এসে উপস্থিত হন। কলকাতায় নজরুলের বন্ধুদের এমন সময় দাওয়াত দেওয়া হয় যেন কেউ আসতে না পারে। কবির অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু কমরেড মোজাফ্ফর আহমেদ নিমন্ত্রণপত্র পান বিয়ের পরে। এরপর এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত ৩ আষাঢ়। যতদূর জানা যায়, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় এবং আকদও সম্পন্ন হয়। কিন্তু কাবিনের শর্ত উল্লেখ করার সময়ই ঝামেলা বাধে। আলী আকবর খান শর্ত জুড়ে দেন, নজরুলকে ঘরজামাই থাকতে হবে। বাঁধনহারা নজরুল এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন।

আকদ হয়ে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন কাজী নজরুল ইসলাম অন্তর্দ্বন্দ্ব্বে বিক্ষুব্ধ। তিনি ছুটে যান বিরজাসুন্দরী দেবীর কাছে। তাকে বলেন, ‘মা, আমি এখনই চলে যাচ্ছি।’

বিরজাসুন্দরী দেবী বুঝতে পারেন এই অবস্থায় নজরুলকে ফেরানো সম্ভব নয়। তিনি তার ছেলে বীরেন্দ্রকুমারকে নজরুলের সঙ্গে দিয়ে দেন। সেই রাতে দৌলতপুর থেকে কর্দমাক্ত রাস্তা পায়ে হেঁটে নজরুল ও বীরেন্দ্রকুমার কুমিল্লা পৌঁছেন।

নজরুল লেটোদল ছেড়ে ছাত্রজীবনে ফিরে আসেন

নজরুল লেটোদল ছেড়ে ছাত্রজীবনে ফিরে আসেন

পরিশ্রম ও মানসিক চাপে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। নজরুলের জীবনে নার্গিস অধ্যায় সেখানেই শেষ হয়। শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সংগীতচর্চা এবং একটা সুসম্পর্ক ছিল কবির। সেই সূত্রে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে ১৯২১ থেকে ১৯২৩ সালের বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করেন কবি। সেখানেই ইন্দ্রকুমারের ভাইয়ের মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলা দেবীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যা পরে পরিণয়ে রূপ নেয়।

কাজী নজরুল ইসলাম -এর সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় তার বাহিনীর ইরাক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় তিনি আর যাননি।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে কাজী নজরুল ইসলাম সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক করপোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবির কাছে তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন।

এ ছাড়া সহসৈনিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে একই সঙ্গে। করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন তার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প : হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা : সমাধি ইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এ সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফার্সি কবি হাফিজের কিছু বই ছিল।

এ সূত্রে বলা যায়, নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

কাজী নজরুলের লেখা ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয় শিখা’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’সহ মোট পাঁচটি বই ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। বলা বাহুল্য, বাংলা সাহিত্যে সমকালীন অন্য কোনো কবি বা সাহিত্যিকের এত গ্রন্থ একত্রে কখনো বাজেয়াপ্ত হয়নি। নজরুলের প্রতিবাদ আর তার লেখনীর অন্যতম দিক হলো নজরুলই ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন। নানা সৃষ্টিতে বৈচিত্র্যমণ্ডিত নজরুলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় পত্রিকা সম্পাদনাও। ১৯২২ সালে নজরুল ‘ধূমকেতু’ নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। পত্রিকাটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশ পেত। ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ধূমকেতুর দ্বাদশ সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমন’ নামক একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতাটি ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ফলে এই কবিতায় নজরুলের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রাজদ্রোহের মামলা হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত নজরুলের বিচার হয়েছিল কলকাতার আলিপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। পরবর্তীতে এই মামলার রায়ে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। রায় ঘোষণার পর দিন তাকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আগে থেকেই নজরুলের কাব্য চেতনা আর সৃষ্টিশীল দ্রোহের সঙ্গে পরিচিত ছিল সাধারণ মানুষ। এবার কারাবরণ করে নজরুল সমগ্র দেশবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তার ‘বসন্ত’ নাটকটি কবির নামে উৎসর্গ করেন। তাকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল হুগলি জেলে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন। শরীরের ওজন প্রায় ১৩ কেজি কমে যায়। এভাবে নজরুল একটানা অনশন করে যান ৩৯ দিন।

ওই সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং নজরুলকে চিঠি লিখে অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে এ বিষয়ে তাকে টেলিগ্রাম পাঠান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘Give up hunger strike. Our Literature claims you.’ কিন্তু টেলিগ্রামটি নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি। জেল কর্তৃপক্ষ ‘Address is not found’ লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠায়। জেল কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ঠিকানা জানলেও ইচ্ছা করেই টেলিগ্রামটি নজরুলের কাছে না পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ফেরত পাঠায়। রবীন্দ্রনাথ এ ঘটনায় দারুণ মর্মাহত হন। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নজরুলের অনশনে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ৩৯ দিন পর কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবীর অনুরোধে তারই হাতে লেবুর রস পান করে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন

রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন

পাক-ভারত যুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। প্রথমে মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশ পায়। বঙ্গীয় মুসলিম সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আফজালুল হক প্রমুখের সঙ্গে পরিচয় হয়। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। মোতাহার হোসেনের সঙ্গে নজরুলের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই নবযুগ নামের সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে প্রকাশিত পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এর মাধ্যমেই নজরুল সাংবাদিকতা শুরু করেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। ১৯২১ সালের এপ্রিল-জুনের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচিত হন। তার সঙ্গেই তিনি কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সঙ্গে।