করোনায় ফিরেছে বান্দরবানের পুরনো রূপ

উসিথোয়াই মারমা:

হঠাৎ যেন পাল্টে গেছে ছোট্ট শহরের চিরচেনা দৃশ্যপট। সড়কে যানবাহন নেই। সন্ধ্যা হলে নেমে আসে সুনসান নীরবতা। এমন দিন আবার ফিরে আসবে, কল্পনা করেনি কেউ।সড়কে যানবাহন নেই। বন্ধ সমস্ত দোকানপাটও। এলাকার সব মানুষ ঘরবন্দি। আর সন্ধ্যা হলে নেমে আসে সুনসান নীরবতা।হঠাৎ যেন পাল্টে গেছে ছোট্ট শহরের চিরচেনা দৃশ্যপট। এমন দিন আবার ফিরে আসবে, কল্পনা করেনি কেউ। কিন্তু করোনার দিনে বান্দরবানে প্রতিদিনের চিত্র এখন এমনই।

এক সময় জনবসতি কম থাকায় শহরের চিত্র এমন শান্ত ও নিস্তব্ধ এক পাহাড়ি এলাকা ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এবার শহরের পুরনো সেই রূপ দেখতে পাচ্ছেন তারা। তাদের অনেকে ঘরবন্দি জীবন ছেড়ে বাইরে কারও দেখা পাওয়ার সুযোগ পেলে পুরনো বান্দরবানের এই দৃশ্য নিয়েই আলাপ করছেন।সারাদিন ঘরবন্দি থেকে এক সন্ধ্যায় বের হয়েছিলেন শহরের মধ্যম পাড়ার বাসিন্দা বাওয়াই মাস্টার। তিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে রয়েছেন শিক্ষকতায়। বর্তমানে শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

তিনি বলেন, বান্দরবান শহর হিসেবে বেশি দিনের নয়। এত দালানকোঠা, দোকানপাট, ভিড়, সড়কে এত যানবাহন কিছুই ছিল না। বাড়িগুলো ছিল বাঁশ ও গাছের তৈরি মাচাং ঘর। এর চারপাশে ছিল মনকাড়া ফুলের বাগান।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের যে জায়গা, সেটাও ছিল ফসলের জমি। সেখানে টাকি, মাগুর, পুটি মাছ, চিংড়ি ও শামুক পাওয়া যেত। বাওয়াই মাস্টার বলেন, শহরে উজানি পাড়া ও মধ্যম পাড়ায় ছিল কয়েকটি মুদি ও চায়ের দোকান। সাপ্তাহিক বাজার বসত বর্তমান ট্রাফিক মোড়ের পাশে। রোববার একদিন করে। পাহাড়ে এমন কোনো জিনিস ছিল না- যা ওই বাজারে পাওয়া যেত না। টাটকা শাকসবজি আর বিভিন্ন ফলমূল তো ছিলই।

সেই সময় শহর এলাকাজুড়ে বড় গাছ ও ঝোপঝাড় ছিল বলে জানান জেলা উদীচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সংস্কৃতিকর্মী ক্যসামং মারমা।

তিনি বলেন, শহরে জাদিপাড়া পাহাড় এলাকাটা বেশ ঘন জঙ্গল। সন্ধ্যা একটু নেমে এলে শুনতে পাওয়া যেত শেয়ালের ডাক। সেই সঙ্গে শঙ্খ নদের আরেক পাড় থেকে ভেসে আসত হরিণের ডাকও। এছাড়া গাছে গাছে প্রচুর পাখি ও দিন-দুপুরে ছিল বানরে দল।

আরেক সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিক্ষক শৈটিংপ্রু জানান, সন্ধ্যায় ট্রাফিক মোড় থেকে উজানি পাড়ায় কোনো রিক্সাওয়ালা আসতে চাইতো না ভয়ে। সবাই তখন যার যার ঘরে। চারপাশে অন্ধকার। নীরব ও নিস্তব্ধ। ঠিক যেন এখন করোনা ভাইরাসের দিনগুলোর মতো।

তবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হবে মনে করছেন লেখক ও কবি মংক্যশোয়েনু নেভী। তিনি বলেন, ‘কোনো কিছুই আগের মতো থাকবে না। তবু করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি পুরনো বান্দরবানকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আগের সময়ের দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে। এখন শহরটাও পরিচ্ছন্ন হয়েছে।’স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে খেটে খাওয়া মানুষ ভোগান্তি ও কষ্ট পাচ্ছে ঠিকই, তবে দুর্যোগের দিনে সবাই একে অপরকে যেন সহযোগিতা করে।

অন্যদিকে জেলার লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় চলছে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘লকডাউন’।

লামার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর-এ জান্নাত রুমি জানান, পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার জেলায় করোনা ভাইরাস আক্রান্ত এক রোগী পাওয়া গিয়েছিল। লামা উপজেলার সঙ্গে সংযোগ প্রবেশ পথে কক্সবাজার জেলার রামু, চকরিয়া উপজেলাসহ সীমান্তবর্তী কিছু সড়কপথ অরক্ষিত রয়েছে।

তিনি বলেন, এ সকল অরক্ষিত পথ লাগোয়া থাকায় জন যাতায়াত অবারিত হওয়ার কারণে করোনা ভাইরাস দ্রুত সংক্রমণের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ২৪ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘লকডাউন’ থাকবে বলে জানান তিনি।