চীনাদের নির্যাতনের শিকার উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়
চীনাদের নির্যাতনের শিকার উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়, ছবি : ইন্টারনেট

উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় : পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি

আর. রহমান : উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় বাস করে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। অতীতে জিনজিয়াং প্রদেশটি উইঘুরস্থান নামের স্বাধীন একটি রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক চীনের শাষকরা এই শান্তিপ্রিয় মুসলিমদের কাছ থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। এমনকি ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছে তাদের। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও রোজা পালনে রয়েছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। উইঘুর মুসলিম পুরুষরা দাড়ি রাখতে ও নারীরা হিজাব পড়তে পারে না। কেউ এই নিয়ম ভাঙতে গেলে তার উপর নেমে আসে চীনা শাষকদের অত্যাচারের খড়গ। আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যমের মতে, উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত একটি জাতি।

জিনজিয়াং অঞ্চলটি চীনের সর্ববৃহত অঞ্চলও বটে। উরুমকি এর রাজধানী। ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪শ বর্গকিলোমিটারের জিনজিয়াং অঞ্চলটি চীনের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন এখানকার কৃষি পণ্যের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এছাড়াও প্রকৃতিক গ্যাস, তেল ও নানা খনিজ সম্পদে ভরপুর হওয়ায় চীন সরকার কিছুতেই অঞ্চলটি হাতছাড়া করতে চায় না। এখানকার ৫৮ শতাংশ মানুষ মুসলিম। প্রায় হাজার বছর ধরে মুসলিমরা এখানে বসবাস করে আসছে। এখানে মুসলিমদের আগমন মূলত তুর্কীদের হাতে তাং সাম্রাজ্যের পতনের পরপরই। এরপরই এই অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ ইসলাম ও আরব সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু চীনের হাতে স্বাধীনতা হারানোর পর দিনদিন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সম্প্রদায়টি।

চীনা নির্যাতনের শিকার উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়

বর্তমান চীন সরকার যেকোন মূল্যে উইঘুর মুসলিমদের উচ্ছ্বেদ করতে চায়। এজন্য তারা বেছে নিয়েছে বিভিন্ন অপকৌশল। তাদের নৈতিক ভাবে দুর্বল করার জন্য চীনা সরকার প্রথমেই উইঘুরদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। বেঁধে দিয়েছে অবৈধ ও অন্যায় নিয়ম। উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ আঠারো বছরের নিচে মসজিদে যেতে পারে না। পঞ্চাশ বছরের কম বয়সী কেউ প্রকাশ্যে নামাজ পড়তে পারে না। এমনকি সেখানে রোজা রাখাও সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ রোজা রাখলে তাকে রোজা না রাখতে বাধ্য করা হয়। সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া এখনো সব ক্ষেত্রে কোরআন শরীফ পড়া সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। কোরআন শরিফ শেখা বা শিখানো সুযোগও বন্ধ করে দিয়ে চীনা সরকার। এখানকার নারীরা হিজাব পড়তে পারে না।  হিজাব পড়া নারীকে টেক্সিতে উঠালে চালককে মোটা অংকের জরিমানা করা হয়। হিজাব পড়া নারীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রেও ডাক্তারদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে

উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচার-প্রচারণা

উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচার-প্রচারণা, ছবি : ইন্টারনেট

উইঘুর কোন মুসলিম সরকারি কর্মকতা ও কর্মচারী হলে তাদের টুপি পড়া নিষেধ। এমনকি পোশাকে থাকতে পারবে না কোন মুসলিম ঐতিহ্যের চিহ্ন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, চীনারা ফ্যাশনের জন্য দাড়ি রাখলে সমস্যা নেই, তবে উইঘুর মুসলিমরা দাড়ি রাখলে তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এই অঞ্চলে একসময় দুই হাজার মসজিদ থাকলেও এখন সংখ্যাটা  কমে গিয়েছে। কারণ চীন সরকার মসজিদ ভেঙ্গে পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র বানাচ্ছে। আর পুরো চীনে উইঘুর মুসলীমদের ধর্মীয় উগ্রপন্থি গোষ্ঠি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

আরও পড়ুন – ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব : পশ্চিমা মদদে শতবছরের মুসলিম নিধন

 

উইঘুর যেভাবে স্বাধীনতা হারায়

অতীতে জিনজিয়াং চীনের অধিকারে ছিল না। এটি ছিল মুসলিমদের একটি স্বাধীন দেশ। মুসলিম শাষন আমলে এই স্থানের নাম ছিল উইঘুরস্থান বা পশ্চিম তুর্কিস্থান। ১৬৬৪ সালে চীনের মাংচ শাষকরা কিং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পর অন্যান্য এলাকার সঙ্গে মুসলমানদের স্বাধীন এই এলাকাটিও দখল করে নেয়। এরপর দুইশ বছর উইঘুর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করলেও চীনাদের কাছে সেটা পুনরায় হারায়। চীনা সমাজতন্ত্রের ছোবলে আক্রন্ত হয়ে দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা হারায় উইঘুরস্থান। উইঘুর সাম্রাজ্য দখল করে চীনারা এর নাম দেয়  নাম দেয় জিনজিয়াং। জিনজিয়াং অর্থ নতুন ভখন্ড। সেই থেকেই পরাধিনতার শিকলে আবদ্ধ হয় উইঘুর মুসলিমরা।

দ্বিতীয়বার উইঘুর দখল করার পড় চীনারা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেয়। আর্থসামাজিক ভাবেও চরম বৈষম্যের শিকার হতে থাকে উইঘুরবাসী। এমনকি সরকারি চাকরিতে তাদের উপস্থিতি অতি নগন্য। আর যারা সরকারি চাকরিতে আছেন তারাও বেতনের ক্ষেত্রে সহকর্মী হাংদের তুলনায় অনেক কম বেতন পান।

 

তুর্কি ও আরবি দ্বারা প্রভাতি উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়

সাংস্কৃতিক দিক থেকে উইঘুরবাসী তুর্কি ও আরবি দ্বারা প্রভাবিত। উইঘুরদের ভাষা যুগে যুগে পরিবর্তীত হয়েছে। সেখানকার মানুষেরা সাকা, উচারিয়ান এবং গান্ধারী সহ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলত। বর্তমানে তাদের ভাষার নাম ‘কোনা ইয়েজিক’। নবম শতকে তুর্কি আগমনের ফলে তুর্কি ভাষা ঢুকে পড়ে। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্মের সাথে সাথে আরবি বর্ণমালা উইঘুরদের ভাষায় স্থান পায়।

উইঘুদের নিজস্ব সংগীতের ধরনকে ‘মুকাম’ বলা হয়। ১২টি মোকামকে উইঘুরা তাদের জাতীয় কাব্য গ্রন্থে রূপ দিয়েছে। উইঘুরদের মধ্যে স্থান ভেদে মোকাবের ভিন্নতা রয়েছে। উইঘুর এই মোকামকে ইউনেসকো মানব সভ্যতার অন্যতম অধরা ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উইঘুরদের সংস্কৃতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাচ। ডাব নামের একটি ঠোলে বাজনার সাথে সানাম নামের লোক নৃত্য উইঘুরদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

চীনাদের নির্যাতনের প্রতিকি কাটূন আগে মধ্যপ্রাচ্যের একটি পত্রিকা

চীনাদের নির্যাতনের প্রতিকি কাটূন আগে মধ্যপ্রাচ্যের একটি পত্রিকা, ছবি : ইন্টারনেট

মুখ বন্ধ রেখেছে পশ্চিমা বিশ্ব

উইঘুর মুসলিম সমাজ দীর্ঘদিন ধরে চীনা সরকারের কাছ থেকে মৌলিক অধিকার পাওয়ার আশা করেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার লাভের সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়ার পর তারা বুঝতে পারে স্বাধিনতা ছাড়া তার ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তখন তারা পরিকল্পনা করে জিনজিয়াং প্রদেশে আবারও ইউঘুরস্থান নামের এক স্বাধীন ভুখন্ড প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের প্রবক্তা কোন পশ্চিমা দেশ কিংবা বর্তমান পৃথবীতে থাকা অর্ধশতাধিক মুসলীম রাষ্ট্র উইঘুরদের সাহাযার্থে এগিয়ে আসেনি। চীন সরকার উইঘুর মুসলমিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এবং ধর্মীয় উগ্রোতার ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে ধর্মীয় নিপীড়ন ও নৃতাত্বিক বৈষম্যের শিকার উইঘুর তরুণরা নিরূপায় হয়ে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।