ইয়াসির রাফার গল্প ‘এভন হাউস’


আমি সবুজের টঙ থেকে বেনসন এন্ড হেজেস জ্বালিয়ে রাস্তা পার হলাম। ওপাশে ‘এভন হাউস’। বাড়ির মালিক মীর মোশারোফ হোসেন সাহেব এর সাথে আমার প্রতিদিন দেখা হয়। কিন্তু কথা হয়না। কারণ তিনি আমাকে চেনেন না, আমিও তাকে চিনি না।তবে তার কাছ থেকে একটা তথ্য জানার প্রয়োজন ছিল। তার মসৃণ চকচকে টাক মাথায় এদানিং চুল দেখতি পাচ্ছি। প্রথমে নকল চুল ভাবলেও এখন আর তা ভাবা যাচ্ছে না। গত পরশু সেলুনে শেভ করতে গিয়ে দেখি মোশারোফ সাহেব চুল ছাটছেন।চুল একদম অর্জিনাল! আমার বংশে আবার অল্প বয়সে চুল ওঠে যাওয়ার একটা ধাত আছে।তার কাছ থেকে জেনে নিলে হয়তো ভবিষ্যৎতে কাজে আসত।কিন্ত জানার সুযোগ হয়ে উঠছে না।

এভন হাউসের সামনের অংশে একটা বিশাল নালা।তার ওপর সিমেন্ট দিয়ে তৈরী দুপাশ বাধানো কালভার্ট রাস্তায় গিয়ে মিশেছে।
এই বাধানো অংশের ওপর বসেই প্রতিদিন নিয়ম করে বিকেলটা কাটিয়ে দিচ্ছি।

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে নালার দিকে ছুড়ে দিলাম।প্রতিবার সিগারেট ফেলে দেয়ার সময় এক ধরনের কষ্ট হয়।মনে হয় কোন এক ষোড়শীর ঠোটছাপ প্রত্যাখ্যান করছি। নালার মধ্যে দিয়ে প্রায় বিড়াল সাইজের দুটি ইঁদুর দৌড়ে গেল।একটির পেছনে আরেকটি। ইদুর দৌড় বোধহয় একেই বলে। দুজনের ছোট্ট সংসার । সংসারের ফাঁকে সময় পেলে নালার ধারে বেড়াতে আসে।

এভন হউসের ঠিক পাশের বাড়িটায় মৃন্ময়ী নামের যে মেয়েটা থাকে তার সাথে এভাবে একদিন হাটবো কোন এক মৃতপ্রায় নদীর ধারে।সেদিন থাকবে শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথী। মৃন্ময়ী নামটা আমার দেয়া নাম।কারন মেয়েটির নাম আমি জানি না।জানার চেষ্টাও করিনি কখনো। ফোন নাম্বার জোগাড় করেছি বাড়ির কাজের বুয়াকে বিপুল অর্থ ঘুষ দিয়ে।কিন্ত কেনো যেন ফোন করতে ইচ্ছে করে না। প্রতিদিন সন্ধ্যার কিছু আগে মেয়েটাকে ব্যালকনিতে দেখা যায়। আমিও বসে থাকি। মৃন্ময়ী নাম দেয়া মেয়েটাকে দেখি।

এই মেয়েটা প্রজাপতির মতোন,কেমন যেন ছটফট করে শুধু। সোজাসুজি আমার দিকে তাকায় না। তাকায় চোখ ঘুরিয়ে।
-মামা চা দিমু?
আমি মুখ ফেরালাম। আমার সামনে সাত আট বছরের একটা ছেলে। হাতে চায়ের ফ্লাস্ক।
‘হুম দাও চা, আর একটা বেনসন দাও।’
আমি চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালাম।
মাথায় একটা কবিতার কিছু লাইন ঘুরছিল অনেকক্ষণ, কার কবিতা তা মনে করতে পারছি না। এদের বের করা উচিৎ।বের না করা গেলে যন্ত্রনা করবে। আমি চায়াওয়ালা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম; ‘নাম কি?’
-’আকবর খান’।
‘আকবর খান?এ তো দেখি উচ্চবংশীয় নাম। হা হা হা। আকবর কবিতা শুনবি? ‘
-হ শুনুম।
আমি ভেবেছিলাম ছেলেটা অবাক হবে কিন্ত তার চোখ আনন্দিত আর কৌতূহলী ।
আমি আবৃতি শুরু করলাম;
“ I Loved a Love Once,
Fairest Among Women,
Closed Her Doors on me,
I Must Not See Her….!”

-কি আকবর কবিতা কেমন?
আকবর আমার কথার উত্তর দিল না,বললো; ‘টেকা দেন দেড়ি হইতাছে’
বোধহয় কবিতা পছন্দ হয়নি।
টাকা দিয়ে আবার মৃন্ময়ী’র ব্যালকনিতে তাকালাম। মেয়েটা ভেতরে চলে গিয়েছে।মেয়েটা আসলে একটা প্রজাপতি। কখন আসে আর কখন যায় বোঝা যায় না।
আমিও মেসের দিকে পা বারালাম।


আমার বন্ধু ইয়াদের ছাতা মাথার ওপর ধরে হেটে যাচ্ছি। আমার গন্তব্য এভন হাউস নামক বাড়িটার কালভার্ট। খুব বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে।বড় বড় সাহিত্যিকগণ আমাদের বৃষ্টি বিলাস করতে শিখিয়েছেন। বৃষ্টি নাকি আয়োজন করে দেখতে হয় ! যে দেশের মানুষ এখনো রাস্তায় ঘুমায়,বৃষ্টি এলে যাদের ঘুম হারাম হয়ে যায় তারা কিভাবে বৃষ্টি নিয়ে বিলাসিতা করবে আমার মাথায় আসে না।

বৃষ্টি হলে আমার শুধু গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।সেই জলবন্দী গ্রামটাকে বড্ড ভালবাসি। শহর আসলে মানুষকে ভালবাসতে শেখায় না।যা শেখায় তাকে কি বলে আমার জানা নেই। জানার ইচ্ছেটাও হয়না কেনো যেন। সে যাকগে, অনেকক্ষণ বসে আছি কিন্তু আজ মৃন্ময়ী ব্যালকনিতে আসছে না।ব্যালকনিতে আসে নি এমনটা কখনো হয়নি।আমি মেসের দিকে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম ।ঠিক তখন মৃন্ময়ীদের বাড়ির সামনে একটা কালো মার্সিডিজ থামল। দাড়োয়ান দৌড়িয়ে একটা হুইল চেয়ার আনলো আর সে হুইল চেয়ারে করে মৃন্ময়ী কে ভেতরে নেয়া হলো!
মেয়েটা কি অসুস্থ?

আমি কিছুক্ষন ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত দাড়োয়ান কে জিজ্ঞেস করলাম। দাড়োয়ান আমাকে জানালো; ‘বছর পাঁচেক আগে এক এক্সিডেন্ট এ পা হারায় মৃন্ময়ী। কিন্তু মাঝে মাঝে এখনো খুব ব্যাথা হয় পায়ে।তাই ডাক্তার এর কাছে গিয়েছিল।’


ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে, আমি ছাতা বন্ধ করে হাটতে শুরু করলাম। মেডিকেল রোডটাকে আজ কেমন মায়াময় লাগছে। সোডিয়ামের আলো গুলো সোনালি। আমি স্বৃতি হাতরে পেছনে যাচ্ছি।শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথীতে মৃন্ময়ীর সাথে হাটার চেয়ে বসে বসে গল্প করাই বোধহয় বেশি ভাল হবে। হাটার কি দরকার শুধু শুধু? বসে থাকাই ভাল।