ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব, ছবি : ইন্টারনেট
ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব, ছবি : ইন্টারনেট

ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব : পশ্চিমা মদদে শতবছরের মুসলিম নিধন

আর. রহমান
ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব এক’শ বছরের। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। জাতিসংঘরে মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস ইসরাইলকে কড়া ভাষায় পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে বাঁধা দিয়েছে। সঙ্গে এটিও মনে করিয়ে দিয়েছে, পশ্চিম তীরের বর্ধিতাংশে বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। যদিও ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার বলছে, তারা ১ জুলাই থেকেই সম্প্রসারণের কাজ শুরু করবে। এছাড়াও জর্দান উপত্যকায় ইসরাইলের বসতি স্থাপনের ইচ্ছে রয়েছে। তবে ফিলিস্তিন বরাবরের মতই বিষয়টি প্রত্যাখান করেছে। ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব আজকের নয়। প্রায় একশ বছর ধরে পশ্চিমা মদদে ইহুদী রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনের লাখ লাখ মুসলমানকে হত্যা ও বাড়িঘর থেকে বিতারিত করছে

 

ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব শুরু যেভাবে

 

উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে ইহুদী বিদ্বেষ বাড়তে থাকে। তখন ইহুদীদের মধ্যে একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্খা তৈরি হয়। সেসময় ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে ইহুদীদের উপনিবেশ গড়ে তুলতে সক্রিয় সাহায্য করে। সেই থেকেই শুরু হয় ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব। যার রেশ পরবর্তী একশ বছরেও কাটেনি।সেসময় ফিলিস্তিন ছিল তুরস্কের অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ। তখন ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশই ছিল মুসলীম ও খ্রিস্টান। ইহুদি ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ১৯০৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েক হাজার। পরবর্তী ত্রিরিশ বছর ব্রিটিশদের সহযোগীতায় ৬ লক্ষ ইউরোপিও ইহুদী ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে।

 

বেলফোর ঘোসনা ও ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের পতনের পর ফিলিস্তিনসহ বেশিরভাগ আরব এলাকা চলে যায় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দখলে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস বেলফোর ফিলিস্তিন ভূখন্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দেন। ইতিহাসে এটি বেলফোর ঘোসনা হিসাবে পরিচিত। বেলফোর ঘোষনার পর বিপুল সংখ্যক ইহুদী ইউরোপ থেকে এসে ফিলিস্তিন এলাকয় বসতী স্থাপন করে।

ইসরাইলী সেনাদের অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও, ছবি : ইন্টারনেট

ইসরাইলী সেনাদের অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও, ছবি : ইন্টারনেট

 

‘হাগানা’ বাহিনী গঠন ও মুসলিম নিধন

 

১৯১৮ সালে ব্রিটেনের সহযোগিতায় ‘হাগানা’ নামে ইহুদীদের একটি গোপন বাহিনী গঠিত হয়। প্রথমদিকে এর কাজ ইহুদের সাহায্য করা হলেও পরবর্তীকালে তারা সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও খেত খামার দখল করে তাদের বিতারিত করাই ছিল এই বাহিনীর প্রধান কাজ। বর্তমান ইসরাইলি সেনাবাহনী সেই হাগানার পরিবর্তীত রুপ। এর মধ্যদিয়ে হাজার হাজার মুসলীমকে তারা হত্যা ও নির্যাতন করে।
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখন্ডকে দ্বিখ-ি করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদীরা পায় ভূমির ৫৭ শতাংশ। আর ফিলিস্তিনিরা নিজেদের মাতৃভূমির মাত্র ৪৩ শতাংশ ভূমি পায়। জাতিসংঘে গৃহিত এই প্রস্তাবের মধ্যদিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ চুড়ান্ত রুপ নেয়।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর পশ্চিম সীমানা অনির্ধারিত রাখে জাতিসংঘ। যাতে ভবিষ্যতে ইহুদীরা সীমানা আরও বাড়াতে পারে। এভাবেই জাতিসংঘের অবৈধ ও অযৌক্তির প্রস্তাবের মাধ্যমে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা চুড়ান্ত হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এ প্রস্তাবের পর ফিলিস্তিনে ইহুদের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ইহুদি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দলগুলো জোর জবরদস্তি করে মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধন সম্পত্তি দখল করে নেয়। জাতিসংঘে এই প্রস্তাব গ্রহণের মাত্র একশ দিনের মধ্যে ১৭হাজার ফিলিস্তিনি মুসলমানকে হত্যা করা হয়।

আরও পড়তে পারেন:  ভারতের পক্ষে কী চীনের পণ্য বয়কট করা সম্ভব?

 

ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের নেপথ্যে আমেরিকাও আছে

 

১৯৪৮ সালের ১২ই মে রাত ১২টা এক মিনিটে ইহুদীদের নেতা ডেভিড ভেন গুড়িয়র ইসরাইলের স্বাধীনতা ঘোসনা করে। এরমাত্র দশ মিনিট পড়েই আমেরিকা ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তারপরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদান করে।

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে শুরু হয় আরব ইসরাইল যুদ্ধ। যুদ্ধে ফিলিস্তিনের ৫০০টি গ্রামের মধ্যে ৪০০টিকেই জনশুণ্য করে ফেলে ইসরাইলি সন্ত্রাসীরা। ফিলিস্তিনের যে অংশটুকু তারা দখল করতে পারেনি সে অংশ মিশর ও জর্ডান ভাগাভাগি করে নেয়। গাজা উপত্যাকাটি মিশরের অধিনে আসে। জর্ডান পায় পশ্চিম তীর।

 

ফিলিস্তিনিদের ‘ইন্তিফাদা’

 

আরব ইসরাইলের মধ্যে ১৯৫৬, ৬৭ ও ৭৩ সালে আরও তিনটি যুদ্ধ হয়। এসব যুদ্ধেও ফিলিস্তিনের ভাগ্যে দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছু জুটেনি। ইসরাইলী আগ্রসন সহ্য করতে না পেরে ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনিরা শুরু করে ‘প্রথম ইন্তিফাদা’। যার অর্থ ‘জেগে উঠা’। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্যালেস্টান লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর নেতা ইয়াসির আরাফত প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা ঘোসনা করেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত কোন ভূখন্ড তাদের দখলে ছিল না। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রথম ইন্তিফাদা কার্যকর ছিল।

এরপর ২০০০ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় ইন্তিফাদা। এটিও ২০০৮ সালে শেষ হয়। ২০০৬ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনিরা দুটি প্রধান দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এদের একটি হলো ফাদা, অপরটি হামাস। এরমধ্যে ফাতাহ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত হলেও হামাস কে অনেক দেশ একটি সন্ত্রাসী সংঘঠন মনে করে।

ইসরাইলী আগ্রসন রুখতে ফিলিস্তিনিরা একশ বছর ধরে লড়ছে, ছবি: ইন্টারনেট

ইসরাইলী আগ্রসন রুখতে ফিলিস্তিনিরা একশ বছর ধরে লড়ছে, ছবি: ইন্টারনেট

 

ইসরাইল ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব কবে শেষ হবে?

 

ফিলিস্তিন ভুখণ্ডে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধিন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে। অন্যদিকে পশ্চিমা মিত্রদের সহযোগিতায় দিনদিন আরও অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনিদের লাশের মিছিল কতটা দীর্ঘ হলে তারা এই যুদ্ধ থামাবে, সেটা এখনো অজানা।

সূত্র : বিবিসি, সিএনএ, প্রথম আলো, এএফপিতে