ইরান তুরস্ক সম্পর্ক ভিন্নমাত্রা দিয়েছে
ইরান তুরস্ক সম্পর্ক ভিন্নমাত্রা দিয়েছে

ইরান তুরস্ক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতির হিসাব নিকাশ

রংপেনসিল ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান তুরস্ক সম্পর্ক ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তবে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে তুরস্কের ভূরাজনীতির পট পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের ওপর ভর করে জ্বালানি চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে দেশটি আমদানি নির্ভরতার ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। কারণ দেশটির জ্বালানির প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। দেশটির জ্বালানির ৯০ শতাংশের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসকেন্দ্রিক, যার অধিকাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে তুরস্ক। আর জ্বালানি, বিশেষত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশটির অন্যতম উৎস আরেক মুসলিম দেশ ইরান। তবে দেশটির সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিনের যে জ্বালানি বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সেটির স্থায়িত্ব বা আরো ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্রে আবিষ্কারে মনোনিবেশ করছে তুরস্ক। একই সঙ্গে ইরানের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য দেশ থেকেও আমদানির পরিমাণ বাড়াচ্ছে দেশটি। এ অবস্থায় জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইরান তুরস্ক সম্পর্ক’র ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান অন্যতম খেলোয়াড়। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে এরদোগান সরকারও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুটি দেশই পশ্চিমাদের রোষানলের মুখে থাকার কারণে তাদের মধ্যে বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মিত্র সম্পর্ক রয়েছে। এজন্য তুরস্কের জ্বালানি চাহিদার একটা বড় অংশই ইরাননির্ভর। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য দেশ দুটোর মধ্যে ২৫ বছরের চুক্তিও রয়েছে। একই অবস্থা রাশিয়ার সঙ্গেও। তুরস্কের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই আসে দেশটি থেকে। যদিও চলতি বছরের এখন পর্যন্ত দেশ দুটো থেকে তুরস্কের প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। এর পরিবর্তে আজারবাইজাইন, কাতার, আলজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো থেকে আমদানি বাড়িয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উত্তোলন বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে তুরস্ক।

কয়েক দশক ধরে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দ্রুত উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। যে কারণে দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৮৭ সালে দেশটিতে গ্যাসের চাহিদা ছিল ৫০ কোটি ঘনমিটার, যা ২০১৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৫০ কোটি ঘনমিটারে। আর প্রাকৃতিক গ্যাসের এ চাহিদার অধিকাংশই পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তুরস্ক নিজেদের অভ্যন্তরীণ উত্তোলন বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে বেশ জোরেশোরে কাজ করছে। সম্প্রতি কৃষ্ণসাগরে দেশটির কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার সেই চেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ।

গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। তিনি সে সময় জানান, এতে প্রায় ৩২ হাজার কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ আছে। ২০২৩ সাল নাগাদ এখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হবে। এরই মধ্যে দুদিন আগে কৃষ্ণসাগরে নতুন করে আরো সাড়ে আট হাজার কোটি ঘনমিটার গ্যাস আবিষ্কার করা হয়েছে বলে জানান এরদোগান।

ইরান তুরস্ক সম্পর্ক’র ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে

ইরান তুরস্ক সম্পর্ক’র ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে

জ্বালানি চাহিদায় বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে আনার বিষয়টি যে বেশ গুরুত্বে সঙ্গে নিয়েছেন তিনি, সেটি তার কথায় বারবার উঠে এসেছে। এদিন তিনি নিজেই কৃষ্ণসাগরে প্রাকৃতিক গ্যাসের খোঁজে কার্যক্রম চালানো জাহাজ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, কৃষ্ণসাগরে এ-যাবত্কালের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি হাইড্রোকার্বনযুক্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে কেবল সাকারিয়া গ্যাসফিল্ডের টুনা-১ কূপে ৪০ হাজার ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। আমরা আশাবাদী যে নতুন এসব গ্যাসক্ষেত্র আমাদের বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে আনবে।

আরও পড়ুন-বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুতা : ক্রীতদাস সংগ্রহই ছিল যার প্রধান উদ্দেশ্য

দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এত বড় গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কারই বলে দেয় জ্বালানির বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তুরস্ক। এখন প্রশ্ন হলো, কয়েক বছরের মধ্যে ইরান, রাশিয়ার মতো দীর্ঘদিনের মিত্রদের পাশ কাটিয়ে কেন জ্বালানিতে আত্মনির্ভরশীল হতে উঠেপড়ে লেগেছে আঙ্কারা। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্ক মনে করে অদূরভবিষ্যতে ইরান আর জ্বালানিক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করবে না। এ কারণেই দেশটি এমনভাবে নিজেদের প্রস্তুত করছে যেন সামনে আর ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন না হয় তাদের।

রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষক ও ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি স্টাডিজের (আইআইইএস) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মাদ সাদেক জোকার সম্প্রতি তেহরান টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে ইরান তুরস্ক সম্পর্ক ’র ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, জ্বালানি নিয়ে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের তিনটি বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে। এক. তুরস্ক নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের দিকে জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প খাতে কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে; দুই. দেশটির রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন; নতুন জোট গঠনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বন্ধনও তৈরি হচ্ছে এবং তিন. কৃষ্ণসাগরে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার।

এর মধ্যে সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন। এরই মধ্যে সৌদি আরবের আগ্রাসন ঠেকাতে কাতার ও তুরস্কের মধ্যে শক্ত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সৌদি হুমকি ঠেকাতে প্রক্সি সিকিউরিটি হিসেবে কাজ করছে তুরস্ক। এর বিনিময়ে নামমাত্র দামে দেশটিকে এলএনজি সরবরাহ করছে কাতার।

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান অন্যতম খেলোয়াড়

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান অন্যতম খেলোয়াড়

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তুরস্কের বাজারে এলএনজির সরবরাহ বাড়াতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে ওয়াশিংটনকে কাছে পেতে আঙ্কারাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজির আমদানি বাড়াচ্ছে। আর প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নিজেদের প্রয়োজনেই তুরস্ককে কাছে রাখতে হচ্ছে রাশিয়ার। কারণ ইউরোপের বাজারে দেশটির গ্যাসের যে সরবরাহ লাইন, নর্ড স্ট্রিম-২, সেটি তুরস্কের মধ্যে দিয়েই গেছে। ফলে তুরস্ককে সামরিক সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি বড় ছাড়ে গ্যাস সরবরাহ করছে রাশিয়া। আবার সংস্কৃতি ও মতাদর্শগত কারণে আজারবাইজাইন থেকে গ্যাস আমদানি বাড়াচ্ছে তুরস্ক। এ কারণে চলতি বছর রাশিয়া ও ইরানকে হটিয়ে তুরস্কের বাজারে শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানিকারক হতে যাচ্ছে আজারবাইজাইন।

সব মিলিয়ে তুরস্ক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে অভ্যন্তরীণ উত্তোলন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য মিত্র দেশ থেকে আমদানি বাড়াচ্ছে। বিপরীতে ভূরাজনৈতিক উত্তোজনা থেকে নিজেদের এড়াতে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা গুটিয়ে আনছে আঙ্কারা। এ অবস্থায় ইরানের জন্য করণীয় কী হতে পারে সেটির উত্তর দিয়েছেন আইআইইএস জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মাদ সাদেক জোকার। তিনি মনে করেন, ইরান তুরস্ক’র মধ্যে এখন যে চুক্তি রয়েছে, তাতে বছরে এক হাজার কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানি করবে আঙ্কারা। তবে এ চুক্তি ২০২৬ সালে শেষ হবে। এরই মধ্যে ইরানকে বড় উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ তুরস্ক মেশিনারিজ, মোটর ভেহিকল, লোহা, ইস্পাত, তামাকজাত ও ইলেকট্রিকের মতো গুটি কয়েক পণ্য ইরানে রফতানি করে। অন্যদিকে ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের রফতানির সিংহভাগেরই গন্তব্য তুরস্ক। ফলে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে তেলনির্ভর অর্থনীতির স্বার্থে বড় ছাড়টাই এখন দিতে হবে তেহরানকে। ইরান তুরস্ক সম্পর্ক’র উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ জ্বালানি সম্পর্কের । এছাড়াও আরও বেশ কিছু রাজণৈতিক অজুহাত রয়েছে ইরান তুরস্ক সম্পর্ক প্রশ্নবিদ্ধ করতে। তবে শক্তিশালী দুই মুসলিমরাষ্ট্রের বন্ধন অটুট থাকুক, সেটাই সবার চাওয়া।

সূত্র: তেহরান টাইমস, আল জাজিরা, আইএএনএস, আনাদোলু এজেন্সি