ইমাম আবু হানিফা (রঃ) : হানাফি মাযহাব ও ফিকাহ শাস্ত্র

তানজীম হাসান নিবির

আলোকবর্তিকা নিয়ে যে সকল মনীষীরা পৃথিবীতে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (র) অন্যতম। পৃথিবীর লোভ-লালসা, ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো সত্যের পথ থেকে পিছু হটাতে পারেনি। ইসলামের মহান এই শিক্ষকের জীবনীর কিছু অংশ ধারাবাহিক ভাবে জানবো। সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকার কারণে যারা জালেম সরকার কর্তৃক অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, এমনকি কারাগারে নির্মমভাবে প্রহরিত হয়েছেন, ইমাম আবু হানিফা (রঃ) তাঁদের অন্যতম।

 

যে সময় জন্মেছিলেন       

উমাইয়া খলিফাগণের দুঃশাসন, কুশাসন ও স্বৈরাচারী কার্যকলাপে সমগ্র মুসলিম জাহান আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাদের নিষ্ঠুর কার্যকলাপ কেবলমাত্র নাগরিকদের ধন-সম্পদ ও জীবনের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়নি, নারী জাতির মান-সম্মান ও সতীত্বও ধূলায় ধূসরীত হয়ে গিয়েছিল। মহানবির (সা.) আদর্শ ও খলিফায়ে রাশেদীনের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে শুধু মাত্র ভূলুণ্ঠিতই করা হয়নি; চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর নামে রীতিমতো জুমার নামাজে প্রকাশ্য মিম্বরে দাঁড়িয়ে অভিশাপ বর্ষণ করা হতো।

খিলাফতের স্থান দখল করেছিল রাজতন্ত্র। অত্যাচারের মূর্ত প্রতীক, যুগের অভিশাপ ও কলঙ্ক ইয়াযিদ ইবনে যিয়াদ ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিষ্ঠুর তরবারির আঘাতে সামান্য কথার জন্যে হাজার হাজার মুসলমানের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। লৌহ দণ্ডের প্রতাপে উমাইয়া বংশীয় খলিফাগণ এমন সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল যেখানে কোনও প্রতিবাদ তো দুরের কথা, কোনও প্রকার সংশোধনের কথা মুখে উচ্চারণ করাই ছিল রীতিমতো মৃত্যুকে ডেকে আনা। তরবারির ভয় দেখিয়ে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

এক কথায় উমাইয়া বংশীয় শাসকগণ ও তাদের বর্বর গভর্নরগণ মুসলিম জাহানে নিষ্ঠুরতার এমন এক নজির স্থাপন করেছিল যা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও বিরল। ঠিক এমনি এক যুগসন্ধিক্ষণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইসলামের বিবেকী কণ্ঠ ও অন্যায়ের প্রতিবাদী ইমাম আবু হানিফা (রঃ)।

ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ৮০ হিজরি মোতাবেক ৭০২ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর আসল নাম নুমান, উপনাম আবু হানিফা। তাঁর উপাধি হল ইমাম আযম (বড় ইমাম)। পিতার নাম ছাবিত । পিতামহের নাম জওতা।

ইমাম আবু হানিফার পূর্বপুরুষরা ইরানের অধিবাসী ছিলেন। পিতামহ জওতা জন্মভূমি পরিত্যাগ করে তৎকালীন আরবের সমৃদ্ধশালী নগর কুফাতে এসে বাসস্থান নিরমান করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আর এই কুফাতেই জন্মগ্রহণ করেন হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (রঃ)।

                                 

 ইমাম আবু হানিফা (র) শিক্ষাজীবন

 

ইমাম আবু হানিফা কৈশরে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করার কোনো সুযোগ পাননি। তখন ছিল কুফায় এসে মারওয়ানী খিলাফতের যুগ। আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ছিলেন খিলাফতের প্রধান। যুগের অভিশাপ, নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ছিলেন ইরাকের শাসনকর্তা। দেশের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তখন প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ইমাম আবু হানিফা ১৪ কি ১৫ বছর বয়সে একদিন বাজারে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তৎকালীন বিখ্যাত ইমাম হযরত শা’বী (র) তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ’হে বালক, তুমি কি কোথাও লেখাপড়া শিখতে যাচ্ছো?’ উত্তরে তিনি অতি দু:খিত স্বরে বললেন, ’আমি কোথাও লেখাপড়া শিখি না।’ তা শুনে ইমাম শা’বী (র) বলেন, ’আমি যেন তোমার মধ্যে প্রতিভার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। ভালো আলেমের নিকট তোমার লেখাপড়া শেখা উচিত।’

ইমাম শা’বী (র) এর উপদেশ ও অনুপ্রেরণায় ইমাম আবু হানিফা ইমাম হাম্মাদ, ইমাম ইবনে রবিয়া, ইমাম জাফর সাদিকের মতো তৎকালীন বিখ্যাত আলেমদের নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ১৭ বছর বয়স থেকে জ্ঞান সাধনা শুরু করলেও তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কুরআন, হাদিস, ফিকাহ, ইলমে কালাম, আদব প্রভৃতি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। জ্ঞান লাভের জন্য তিনি মক্কা, মদিনা, বসরা এবং কুফার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত আলেমগণের নিকট ন্যায় ছুটে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন স্থান হতে হাদিসের অমূল্য রত্ন সংগ্রহ করে স্বীয় জ্ঞান-ভাণ্ডার পূর্ণ করেন। উল্লেখ্য যে তিনি প্রায় ৪০০০ এর অধিক আলেমের নিকট শিক্ষা লাভ করেন।

ইমাম মালেক (র) এর নিকটও তিনি হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম মালেক যদিও তাঁর থেকে ১৩ বছরের ছোট ছিলেন। তাও ইমাম আবু হানিফা তাকে অশেষ সম্মান করতেন। ইমাম মালেকও আবু হানিফাকে শিক্ষকের ন্যায় সম্মান দেখাতেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের আদব-কায়দা এমনই হয়ে থাকে।

শিক্ষকগণের প্রতি ইমাম আবু হানিফার অনেক বেশি ভক্তি শ্রদ্ধা ছিল। তিনি নিজেই তার্ বিবরণ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন- ‘‘আমার শিক্ষক ইমাম হাম্মাদ (র) যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন আমি তাঁর বাড়ির দিকে পা মেলে বসিনি। তার কারণ আমার ভয় হতো শিক্ষকের প্রতি আমার বেয়াদবি হয়ে যায় কিনা।’’

ইমাম আবু হানিফা (র) তার শিক্ষক ইমাম হাম্মাদ (র) এর নিকট একাধারে দশ বছর ফিকাহ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। এতে বোঝা যায় জ্ঞানার্জনের নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। কঠিন সাধনা থাকলে যে কোনো সময়ে জ্ঞানার্জন করা সম্ভব। কারো কারো মতে ইমাম আবু হানিফা (র) তাবেয়ী ছিলেন। সাহাবাহগণের যুগ তখন প্রায় শেষ হলেও কয়েকজন সাহাবি তখনও জীবিত ছিলেন।

১০২ হিজরিতে তিনি যখন মদিনা গমন করেন তখন মদিনার দুজন সাহাবি হযরত সোলাইমান (রা) ও হযরত সালেম ইবনে সুলাইমান (রা) জীবিত ছিলেন এবং ইমাম আবু হানিফা (র) তাদের দর্শন লাভ করেন। কিন্তু অনেকের মতে তিনি কোনো সাহাবির দর্শন পাননি। তবে তাবে’ তাবেয়ী হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই।

ইমাম আবু হানিয়া (র) এর শিক্ষকগণ প্রায় সবাই ছিলেন তাবেয়ী। ফলে হাদিস সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁদের এতটি মাত্র মধ্যস্থতা অবলম্বন করতে হতো। তাই তাঁর সংগৃহীত হাদিসসমূহ সহিহ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

 

ফিকাহশাস্ত্রে অবদান

তাফসীর ও হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ অভিজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও ফিকাহ শাস্ত্রেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেছেন।

তিনি ফিকাহশাস্ত্রের উদ্ভাবক ছিলেন। ফিকাহশাস্ত্রে তাঁর অক্লাস্ত পরিশ্রম ও অবদানের জন্যই মুসলিম জাতি সত্যের সন্ধান অনায়াসে লাভ করতে পেরেছে। তিসি তাঁর ৪০ জন ছাত্রের সমন্বয়ে ফিকাহ সম্পাদনা বোর্ড গঠন করেন। ইমাম আবু হানিফা (র) ছিলেন বোর্ডের প্রধান। বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে ইমাম জাফর সাদিক, হাব্বান, ইমাম মুহাম্মদ, ইউসুফ, ইয়াহ ইয়া ইবনে আবি জায়েদা এর নাম উল্লেখযোগ্য।

ফিকাহশাস্ত্র প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে এই বোর্ডের অবদান সবচেয়ে বেশি। ইসলামের বিভিন্ন আইন নিয়ে বোর্ডে স্বাধীনভাবে আলোচনা হতো। কোসো মাসআলা (সমস্যা) এলেই বোর্ডে তা নিয়ে গবেষণা হতো। প্রত্যেকে কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করতেন। সকলের সম্মতিক্রমে সঠিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো অর্থাৎ ফতোয়া (সমাধান) দেওয়া হতো। এভাবে কুতুবে হানাফিয়্যাতে (হানাফি মাযহাবের কিতাবসমূহে) প্রায় ৮৩০০০ মাসআলা ও ফতোয়া লিপিবদ্ধ করা হয়। তিনি হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কঠিন বস্তুও যে সহজ হয়ে যায় ইমাম আবু হানিফার ফিকাহ সম্পাদনা বোর্ড তার প্রমাণ।

সুদীর্ঘ ৩০ বছর কাল ইমাম আবু হাণিফা (র) ও অন্যান্যদের আপ্রাণ চেষ্টা ও সাধনার ফলে ফিকাহশাস্ত্রের উন্নতি সাধিত হয়। তিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনে হাজার হাজার মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ তৈরি করে গিয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে যারা ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে ইমাম মুহাম্মদ (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ইমাম যুফার (র) অন্যতম।

 

 

চলবে…

 

 

সূত্র: বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী

মূল : মাইকেল এইচ হার্ট, অনুবাদ : জেনারেল আকবর হোসেন খান